বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের একটি গলি। তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ অফিসার এমন ভাষায় সতর্ক করলেন, যা বাংলার ভোটের ইতিহাসে আগে কখনও শোনা যায়নি।

বলে দাও জাহাঙ্গিরকে — যদি মানুষকে ভয় দেখায়, তাহলে কায়দামতো ইলাজ হবে।

কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছিল না, চোখে কোনো শঙ্কা নেই। লোকটির নাম অজয়পাল শর্মা। উত্তরপ্রদেশের ‘সিংহম’। ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত পুলিশ পর্যবেক্ষক। সেই ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। বিজেপি উল্লসিত, তৃণমূল ক্ষুব্ধ, আর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অবাক।

একজন ডাক্তার থেকে ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’

অজয়পাল শর্মা পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় জন্ম, দাঁতের ডাক্তার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি বেছে নেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ। ২০১১ সালের আইপিএস ব্যাচের এই অফিসার উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারে যোগ দেন। সাহারানপুরে প্রশিক্ষণ শেষে প্রথম পোস্টিং হয় মথুরায়। তারপর একের পর এক জেলা — গাজিয়াবাদ, হাথরাস, শামলি, নয়ডা, রামপুর।

সাত বছরের কর্মজীবনে ত্রিশটিরও বেশি এনকাউন্টারে অংশ নেওয়ার রেকর্ড তাঁকে ‘এনকাউন্টার ম্যান’ উপাধি এনে দেয়। শামলিতে পোস্টিংয়ের সময় তিনি পশ্চিম ইউপির কুখ্যাত মুকিম কালা গ্যাং ভেঙে দেন। হাথরাসে গ্রেফতার করেন বেটিং মাফিয়া চতুর্ভুজ গুপ্ত ওরফে ‘চতুরা’কে। রামপুরে এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকারীকে নিজে গুলি করেন। এই ‘অ্যাকশন’-এর ছবিগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ডে পরিণত হয়, আর উত্তরপ্রদেশের একটি বড় অংশ তাঁকে নায়কের মর্যাদা দেয়।

২০১৭ সালে যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় আসার পর উত্তরপ্রদেশে এনকাউন্টারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ে। সেই রাজনৈতিক পরিবেশে অজয়পাল শর্মার উত্থান নিছক ঘটনাক্রম নয়, এটি একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় দর্শনের ফসল, যেখানে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে ‘তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার’ দেওয়াকে বীরত্ব বলে উপস্থাপন করা হয়।

পুরস্কার এবং প্রশ্ন — একসাথেই

অজয়পাল শর্মার ক্যারিয়ারের দুটি স্বতন্ত্র মুখ আছে। একদিকে পুরস্কার, পদোন্নতি, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি। অন্যদিকে গভীর অভিযোগের ছায়া।

মানবাধিকার আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও হর্ষ মান্দার তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। শামলিতে তাঁর কার্যকালে একাধিক এনকাউন্টারকে সাজানো বলে অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হল আকবর নামে একজনের হত্যা। আকবরের পরিবার দাবি করে, তাঁকে ব্যাঙ্গালুরু থেকে তুলে এনে শামলিতে এনকাউন্টার করা হয়েছে। আকবর ২০১৫ সাল থেকে জামিনে ছিলেন এবং ব্যাঙ্গালুরুতে কাপড়ের ফেরিওয়ালা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

এরপর আসে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে রামপুর থেকে উন্নাওয়ের পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বদলি করা হয়। কারণ, তৎকালীন গৌতম বুদ্ধ নগরের এসএসপি বৈভব কৃষ্ণের একটি তদন্ত রিপোর্টে অজয়পাল শর্মাসহ পাঁচজন আইপিএস অফিসারকে পোস্টিং কেনাবেচার কেলেঙ্কারিতে জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়। ওই কেলেঙ্কারির তদন্তে যোগী সরকার একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করতে বাধ্য হয়। সেই এসআইটি তাঁর বিরুদ্ধে আরও তদন্তের সুপারিশ করে।

এর বাইরে ক্রিমিনাল ব্রিচ অব ট্রাস্ট, প্রমাণ লোপাট এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। একজন ৩০ বছর বয়সী মহিলাও এফআইআর দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, শর্মা তাঁকে বিয়ে করে অন্য একজন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গোপন রাখেন এবং পরে তিনি ডিজিপি-সহ বরিষ্ঠ কর্তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে শর্মা তাঁকেই ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

এই সমস্ত অভিযোগ সত্ত্বেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি প্রয়াগরাজ কমিশনারেটে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পদে কর্মরত।

বাংলার মাটিতে এক অচেনা মুখ

নির্বাচন কমিশন সাধারণত পর্যবেক্ষক হিসেবে নিরপেক্ষ এবং পরিচিতিহীন অফিসারদের নিযুক্ত করে যাঁদের নাম প্রচারমাধ্যমে নেই, যাঁদের কোনো দলগত রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অজয়পাল শর্মা ঠিক এর উল্টো। তাঁর নাম শুনলেই একটি দল উল্লসিত হয়, অন্য দল প্রতিবাদে মুখর হয়।

ফলতায় পৌঁছে তিনি সরাসরি চলে যান তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের বাড়িতে। সেখানে জাহাঙ্গির উপস্থিত ছিলেন না। স্থানীয় বাসিন্দারা, এমনকি স্থানীয় পুলিশও তাঁর বাড়ির সঠিক ঠিকানা দিতে অস্বীকার করে। পরে তল্লাশির মাধ্যমে বাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়।

বাড়িতে পৌঁছে শর্মা দেখেন, জাহাঙ্গির খান ওয়াই ক্যাটেগরির নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, যেখানে সর্বোচ্চ ১০ জন পুলিশ মোতায়েনের বিধান। কিন্তু সেখানে মোতায়েন ছিলেন ১৪ জন পুলিশ। এই প্রোটোকল লঙ্ঘনের জন্য তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জেলার এসপি-র কাছে ব্যাখ্যা তলব করেন। পরিবারের সামনে দাঁড়িয়েই তিনি ঘোষণা করেন — ভোটারদের ভয় দেখানো হলে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, অনুতাপের সুযোগ দেওয়া হবে না।

এই দৃশ্য মুহূর্তে ভাইরাল হয়। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখা উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এটিকে গত পঞ্চাশ বছরের সবচেয়ে মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সংকেত বলে দাবি করে। বিজেপি নেতা অমিত মালভিয়া ঘটনাটিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় উদযাপন করেন।

তৃণমূলের পাল্টা আক্রমণ

তৃণমূল কংগ্রেস অবিলম্বে তাঁর অতীতের অভিযোগগুলি সামনে তুলে আনে এবং দাবি করে যে এই রেকর্ডের কারণেই তাঁকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করা সমীচীন নয়। দলের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত সিংহম এবং যোগী আদিত্যনাথের প্রিয় এনকাউন্টার স্পেশালিস্টকে নির্বাচন কমিশন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসেবে মনোনীত করেছে। দলটি আরও অভিযোগ করে, শর্মার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল ব্রিচ অব ট্রাস্ট এবং প্রমাণ লোপাটের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও সরব হন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, বিজেপি বাংলায় রামপুর ও সম্ভলে পরীক্ষিত তাদের এজেন্ট পাঠিয়েছে। তাঁর দাবি, এই কর্মকাণ্ডের গভীর তদন্ত হওয়া উচিত।

প্রশ্নটি আসলে প্রাতিষ্ঠানিক

অজয়পাল শর্মাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে একটি গভীরতর প্রশ্ন: নির্বাচন পর্যবেক্ষকের ভূমিকা আসলে কী?

সংবিধান অনুযায়ী, পর্যবেক্ষক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক — তিনি হস্তক্ষেপকারী নন, বিচারক নন, কর্তৃপক্ষও নন। কিন্তু ফলতার ঘটনায় অজয়পাল শর্মা যা করেছেন, সেটি পর্যবেক্ষণ নয়, সেটি সরাসরি অ্যাকশন। তাঁর নিযুক্তি এবং তাঁর আচরণ — দুটোই একটি বিশেষ রাজনৈতিক সংকেত বহন করে।

বাংলায় নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত, ভোটের আগে সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে একজন ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’-কে পাঠানো নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত — এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন।

২৯ এপ্রিলের দ্বিতীয় দফার ভোটে ১৪২টি কেন্দ্রে মোট ২,৩২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। মোট ১৪২ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ৯৫ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং ১০০ জন ব্যয় পর্যবেক্ষক রয়েছেন। এই বিশাল বাহিনীর মাঝে অজয়পাল শর্মা একটিমাত্র মুখ। কিন্তু সেই একটি মুখই পুরো নির্বাচনী পরিবেশের আলোচনাকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন।

বাংলার রাজনীতি বরাবরই তীব্র এবং সংঘর্ষমুখর। তার মধ্যে উত্তরপ্রদেশের এই ‘সিংহম’-এর আগমন — তাঁর সমর্থকদের কাছে নায়কোচিত, বিরোধীদের কাছে উস্কানিমূলক। আসল প্রশ্ন হল, ভোটের পর যখন বাংলার মানুষ রায় দেবেন, তখন কি মনে থাকবে ফলতার সেই গলির দৃশ্য? যেখানে একজন পুলিশ অফিসার  যাঁর নিজের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বিচারাধীন — দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “অনুতাপের সুযোগ দেওয়া হবে না।”

পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল।