Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ শেষ লড়াই দক্ষিণবঙ্গে: তৃণমূলের দুর্গ কি আজও অভেদ্য?

শেষ লড়াই দক্ষিণবঙ্গে: তৃণমূলের দুর্গ কি আজও অভেদ্য?

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: আগামীকাল ২৯ এপ্রিল। পশ্চিমবঙ্গের ভোটযুদ্ধের চূড়ান্ত তথা অন্তিম অধ্যায়। দ্বিতীয় তথা চূড়ান্ত দফায় কাল রাজ্যের ১৪২টি আসনে ভাগ্যনির্ধারণ করবেন প্রায় ৩ কোটি ২১ লক্ষ ভোটার। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং পূর্ব বর্ধমান— মানচিত্রের এই সাত জেলা দীর্ঘকাল ধরেই ঘাসফুল শিবিরের ‘এপিসেন্টার’। কিন্তু এই চেনা মাটিতেই আজ প্রধান প্রশ্ন: পনেরো বছরের শাসনের বোঝা বইতে বইতে তৃণমূল কি আজও তার পুরনো দাপট অটুট রাখতে পেরেছে?

পরিসংখ্যান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই ১৪২টি আসনের সমীকরণ ছিল চমকপ্রদ। তৃণমূল কংগ্রেস ১২৩টিতে জয়ী হয়েছিল— যার হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। বিজেপির ঝুড়িতে গিয়েছিল মাত্র ১৮টি আসন। কলকাতা, হাওড়া এবং পূর্ব বর্ধমানে বিরোধীদের কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল ঘাসফুল শিবির। কেবল নদীয়া ছিল ব্যতিক্রম, যেখানে ১৭টি আসনের মধ্যে ৯টি পেয়ে তৃণমূলকে পিছনে ফেলেছিল বিজেপি। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন।

বদলে যাওয়া সমীকরণ: ভোটার তালিকা ও নাগরিকত্ব

এবারের নির্বাচনে অন্যতম বিস্ফোরক ইস্যু হলো ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’। এই প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। অভিযোগ উঠেছে, বাদ পড়াদের বড় অংশই মুসলিম ভোটার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাদ পড়া ভোটারদের ক্ষোভ এবং তালিকায় থাকা মুসলিম ভোটারদের নিরাপত্তাহীনতাবোধ— উভয়ই সংখ্যালঘু ভোটকে তৃণমূলের পক্ষে আরও বেশি সংহত (Consolidate) করতে পারে। নাগরিকত্ব আইন বা এনআরসি-র আশঙ্কা এক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করছে।

প্রথম দফার রেশ ও সরকার গড়ার অঙ্ক

গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ১৫২টি আসনে ৯১-৯২ শতাংশ ভোটদান রাজ্যের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অমিত শাহ দাবি করেছেন, এর মধ্যে ১১০টিরও বেশি আসন বিজেপি পাচ্ছে। যদিও ৪ মে-র আগে এই দাবির সত্যতা যাচাই অসম্ভব। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসাব বলছে, বিজেপি যদি উত্তরবঙ্গে প্রথম দফায় ৭৫টি আসনও পায়, তাহলেও সরকার গড়তে দক্ষিণবঙ্গের ১৪২টি আসনের মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বা ৪৫টি আসন তাদের জিততেই হবে। কাগজে-কলমে তা সম্ভব হলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে, সেটাই দেখার।

দুর্গের ফাটল কোথায়?

নদীয়া এই দফায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র। মতুয়া সম্প্রদায়ের আধিক্য, ছিটমহল স্মৃতি এবং নাগরিকত্ব ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিজেপি এখানে হিন্দু সংহতির রাজনীতিতে শান দিয়েছে। হুগলিতেও গতবার কয়েকটি আসনে শাসকদলকে কড়া টক্কর দিয়েছিল গেরুয়া শিবির। বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতা ও হাওড়া তৃণমূলের নিরাপদ গড় হলেও শহুরে আসনগুলিতে বিজেপি যদি গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে না পারে, তবে দক্ষিণবঙ্গে তাদের লড়াই কঠিন হয়ে পড়বে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি ও শাসনের প্রশ্ন। নিয়োগ দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তকে হাতিয়ার করেছে বিরোধীরা। বিশেষত, ২০২৩ সাল থেকে ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষা স্থগিত থাকা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব নিয়ে শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের মধ্যে পুঞ্জীভূত অসন্তোষ কলকাতার মধ্যবিত্ত পাড়া থেকে হুগলির শিল্পতালুক— সর্বত্রই নিঃশব্দে জমে আছে।

তৃণমূলের পালটা শক্তি

তবে তৃণমূলকে কেবল রক্ষণাত্মক ভাবলে ভুল হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘স্বাস্থ্যসাথী’ ও ‘কন্যাশ্রী’র মতো জনমুখী প্রকল্পগুলো দক্ষিণবঙ্গের গ্রামীণ মহিলাদের মধ্যে আজও গভীর প্রভাব ফেলে। তৃণমূল নিজেকে ‘বাংলার অস্মিতা’ ও ‘স্বায়ত্তশাসনের রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিকে ‘বহিরাগত হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে সফল। এর সাথে যোগ হয়েছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো আঞ্চলিক মুখদের সমর্থন। উত্তর ২৪ পরগনায় মোদী-শাহর পালটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাজারে ঘুরে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলার সেই পরিচিত ভাবমূর্তি আজও তাঁর প্রধান রাজনৈতিক পুঁজি।

উপসংহার: দুই শিবিরের উদ্বেগ

শেষ মুহূর্তের প্রচারে একদিকে যখন মোদী-শাহর হেভিওয়েট সভা, অন্যদিকে তখন কলকাতার রাস্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে হেঁটে জনসংযোগ। এই লড়াই আসলে পনেরো বছরের শাসনের বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের বিরোধিতার এক চূড়ান্ত মূল্যায়ন। জনগণের এই রায় বন্দি হবে ইভিএমে।

ফল জানা যাবে আগামী ৪ঠা মে। বাংলার হৃদয়ে শেষ পর্যন্ত কে রাজত্ব করবে, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ।


Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles