Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ বিশ্বাসের ভোট, বিকল্পের খোঁজ

বিশ্বাসের ভোট, বিকল্পের খোঁজ

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটার এবং আনুগত্যের এক জটিল হিসেব

0 comments 1 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকল ব্লকের একটি চায়ের দোকানে, ভোটের আগের সন্ধ্যায়, তিনজন মানুষ বসে আছেন। তিনজনই মুসলিম, তিনজনই ভোটার।

“দিদি না থাকলে আমাদের নাম কাটা যেত,” বললেন প্রথমজন।

“দিদি থাকতেও তো অনেক কিছু হলো,” পাল্টা বললেন দ্বিতীয়জন।

তৃতীয়জন চুপ করে রইলেন।

সেই নীরবতাই হয়তো এবারের মুসলিম ভোটের সবচেয়ে সৎ ভাষ্য।

সংখ্যার রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটারের প্রায় সাতাশ শতাংশ মুসলিম — সংখ্যায় প্রায় দুই কোটি সত্তর লাখ। কিন্তু এই সংখ্যাটা ভূগোলের নিরিখে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, বীরভূম, নদিয়া এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ অংশে মুসলিম ভোটার সংখ্যাগরিষ্ঠ বা নির্ণায়ক সংখ্যালঘু। প্রথম দফার ভোট হয়েছে ঠিক এই জেলাগুলোতেই।

ফলে প্রশ্নটা এড়ানোর উপায় নেই — এবার কি সেই আনুগত্য অটুট রইল, নাকি কোথাও ফাটল ধরল?

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলার মুসলিম সমাজের সম্পর্কটা বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হয়। বামফ্রন্টের আমলে মুসলিমরা ছিলেন বামেদের ভোটব্যাঙ্কের অংশ তবে সেটা ছিল মূলত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত জোট, গভীর আনুগত্য নয়।

২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন মুসলিম সমাজ তৃণমূলের দিকে সরে এল — বামেদের ব্যর্থতার কারণে এবং একটি সরল আশার কারণে। সেই আশাটা পূরণ হয়েছে আংশিকভাবে, এবং ব্যর্থ হয়েছে গভীরভাবে।

২০১৪ সালের পর থেকে সমীকরণটা আবার বদলে গেছে। বিজেপির উত্থান, সিএএ, এনআরসি এবং এসআইআর-এর মতো প্রক্রিয়াগুলো মুসলিম সমাজে এমন একটা অস্তিত্বগত ভয় তৈরি করেছে, যা আগে ছিল না। ভোটের হিসেবে এই ভয়টা তৃণমূলের পক্ষে কাজ করে — কারণ তৃণমূলকে ভোট না দেওয়া মানে বিজেপিকে সুবিধা দেওয়া, এবং বিজেপিকে সুবিধা দেওয়া মানে নিজের অস্তিত্বকে বিপদে ফেলা।

এই যুক্তিটা এতটাই শক্তিশালী যে এটা প্রায় একটা খাঁচার মতো। মুসলিম ভোটার তৃণমূলকে ভালোবেসে নয়, ভয় থেকে ভোট দেন। আর সেই ভয়টাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করেছেন — বারবার, নির্দ্বিধায়।

রেকর্ড ভোটদান, কিন্তু কোন বার্তা?

এবারের নির্বাচনের আগে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে কথিতভাবে একানব্বই লাখ নাম বাদ পড়ার ঘটনা সেই ভয়কে তীব্র করে দিয়েছে। মুর্শিদাবাদে এবার ভোটদানের হার রেকর্ড ছুঁয়েছে — একানব্বই শতাংশের কাছাকাছি।

এই সংখ্যাটা একটা বার্তা বহন করে। মানুষ ভোট দিতে এসেছেন কারণ না এলে হয়তো পরের বার তালিকায় নাম থাকবে না — এই আশঙ্কা থেকে। ভয় থেকে জন্মানো রাজনৈতিক অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে করুণ চেহারা। কিন্তু এটাই এখন বাস্তবতা।

নতুন স্তর, পুরনো খাঁচা

তবু এই বাস্তবতার ভেতরেও একটা নতুন স্তর তৈরি হচ্ছে, যা আগের নির্বাচনগুলোতে ছিল না।

ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট — আব্বাস সিদ্দিকীর দল — ২০২১ সালে প্রথমবার মঞ্চে এসেছিল। সেবার কংগ্রেস ও বামেদের সঙ্গে জোট বেঁধে তারা বেশ কয়েকটি আসনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিল, যদিও আসন মিলেছিল সামান্য। কিন্তু তাদের উপস্থিতি একটা গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিয়েছিল — মুসলিম ভোটারের একটা অংশ তৃণমূলের বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

এবারের নির্বাচনে সেই সংকেতটা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজের একটা অংশের মধ্যে একাধিক কারণে ক্ষোভ জমে উঠেছে।

অর্থনৈতিক বঞ্চনা: লক্ষ্মীর ভান্ডার বা কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্পগুলো মুসলিম পরিবারেও পৌঁছেছে। কিন্তু কর্মসংস্থান, শিক্ষার মান, স্বাস্থ্যপরিষেবা — এই মৌলিক জায়গাগুলোতে মুর্শিদাবাদ বা মালদহের চিত্র হতাশাজনক। মুর্শিদাবাদ দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা। সেই দারিদ্র্যের জন্য স্থানীয় মানুষ কাকে দায়ী করবেন — কেন্দ্রের বিজেপিকে, নাকি রাজ্যের তৃণমূলকে,এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর সহজ নয়।

ক্ষমতার অসম ভাগ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি করেন — এই অভিযোগ বিজেপির প্রধান অস্ত্র। কিন্তু বাস্তবে মুসলিম সমাজের একটা অংশ মনে করেন, তৃণমূল তাঁদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করে, সত্যিকারের ক্ষমতায়ন দেয় না। বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা, মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব, পুলিশ ও প্রশাসনে নিয়োগ — এই হিসেবগুলো মুসলিম সমাজের শিক্ষিত অংশের মধ্যে ক্রমশ আলোচিত হচ্ছে। তৃণমূল তাঁদের ভোট নেয়, কিন্তু ক্ষমতার ভাগ দেয় কি — এই প্রশ্নটা চাপা থাকে, কারণ বিজেপির বিকল্পটা সামনে থাকে। কিন্তু চাপা থাকা মানে মিলিয়ে যাওয়া নয়।

সাম্প্রতিক ক্ষত: মুর্শিদাবাদে গত বছরের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনাগুলো — যেখানে বেশ কিছু মুসলিম পরিবারকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল, যেখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল — সেগুলো তৃণমূল সরকারের সুরক্ষাদাতার ভাবমূর্তিতে আঘাত করেছে। “দিদি থাকতেও তো অনেক কিছু হলো” — সেই চায়ের দোকানের দ্বিতীয়জনের কথাটার ভেতরে এই যন্ত্রণাটাই ছিল।

রাজনীতির নিষ্ঠুর গণিত

কিন্তু এই সমস্ত ক্ষোভ এবং হতাশা সত্ত্বেও, মুসলিম ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা? এখানেই রাজনীতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর গণিতটা সামনে আসে।

ভোট ভাগ হওয়া মানে কার দিকে ভাগ হওয়া? বিজেপির দিকে? প্রায় অসম্ভব। ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির হিন্দুত্বের আখ্যান, সিএএ, মসজিদ ভাঙার ইতিহাস — এই পটভূমিতে একজন সাধারণ মুসলিম ভোটারের পক্ষে বিজেপিকে ভোট দেওয়া রাজনৈতিকভাবে প্রায় কল্পনাতীত।

তাহলে কংগ্রেস বা বাম? তাদের সাংগঠনিক শক্তি এতটাই ক্ষয়প্রাপ্ত যে তারা প্রকৃত বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। আইএসএফ বা অন্য ছোট দল? সেখানে ভোট গেলে তা তৃণমূলের ক্ষতি করবে, বিজেপিকে সুবিধা দেবে — এবং এই সহজ হিসেবটা মুসলিম ভোটাররা ভালোই বোঝেন।

এইখানেই খাঁচার রূপকটা সম্পূর্ণ হয়। মুসলিম ভোটার তৃণমূলের প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারেন, হতাশ হতে পারেন, এমনকি বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতিও থাকতে পারে কিন্তু যতদিন বিজেপি একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে সামনে থাকবে, ততদিন ভোটের দিন সেই ক্ষোভ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তৃণমূলের বাক্সেই পড়বে। কারণ পরিচয় রক্ষার প্রশ্ন যেদিন অর্থনৈতিক হতাশার চেয়ে বড় হয়ে যায়, সেদিন ভোটটা কৌশলগত হয়ে ওঠে, আর আবেগের থাকে না।

ভোটব্যাঙ্ক: একটি সুবিধাজনক মিথ

এই বিশ্লেষণে একটা ফাঁক আছে, যা উপেক্ষা করলে পুরো ছবিটা মিথ্যে হয়ে যায়। মুসলিম সমাজ একটি একক সত্তা নয়।

মুর্শিদাবাদের বিড়িশ্রমিক, মালদহের আমচাষি, কলকাতার মেটিয়াবুরুজের তাঁতি, উত্তর দিনাজপুরের ক্ষুদ্র কৃষক — এঁদের সমস্যা আলাদা, চাহিদা আলাদা, ভয়ও আলাদা। একটি সমজাতীয় “মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক” — এই ধারণাটা নিজেই একটা রাজনৈতিক নির্মাণ, যা তৃণমূল ও বিজেপি উভয়পক্ষই নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করে।

তৃণমূল এই ধারণাটা ব্যবহার করে মুসলিম ভোটকে গৃহীত বলে ধরে নিতে। বিজেপি এটা ব্যবহার করে হিন্দু ভোটকে একত্রিত করতে। এই দুটো কৌশল আসলে একে অপরকে পুষ্ট করে। বিজেপি যত বেশি মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের ভয় দেখাবে, মুসলিম সমাজ তত বেশি তৃণমূলের পেছনে একত্রিত হবে। আর মুসলিম সমাজ তত বেশি তৃণমূলের পেছনে একত্রিত হলে, বিজেপির হিন্দু একত্রীকরণের আখ্যান তত বেশি কাজ করবে।

এই বৃত্তটা ভাঙার ক্ষমতা আপাতত কারো নেই। এবং সেই বৃত্তের সবচেয়ে বড় বন্দী হলেন সেই তৃতীয় মানুষটি, যিনি চায়ের দোকানে চুপ করে বসে ছিলেন।

সবচেয়ে অনিরাপদ ভোট

তাঁর চুপ করে থাকাটা হতাশার নীরবতা। এমন একজন মানুষের নীরবতা, যিনি জানেন তাঁর ভোটের গন্তব্য প্রায় নির্ধারিত কারণ বিকল্পটা তাঁর কাছে আরও বিপজ্জনক। তিনি এমন একটি গণতন্ত্রের নাগরিক যেখানে তাঁর ভোটের মূল্য আছে, কিন্তু পছন্দের স্বাধীনতা নেই কারণ পছন্দটা আসলে কৌশলের মুখোশ পরা বাধ্যবাধকতা।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোট এবার ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত তবে শূন্য নয়। প্রান্তিকভাবে কিছু ভোট আইএসএফ বা স্থানীয় বিকল্পের দিকে যেতে পারে। কোনো কোনো আসনে সেই প্রান্তিক ভোটও ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর ছবিতে, ভয় এবং কৌশলের যে শক্তিশালী সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা মুসলিম ভোটকে তৃণমূলের দিকেই রাখবে — বিশ্বাস থেকে নয়, বাঁচার তাগিদ থেকে।

এবং সেটাই হয়তো এই নির্বাচনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য। যে ভোটটাকে সবাই “নিরাপদ” বলে ধরে নেয়, সেই ভোটটাই আসলে আসছে সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা থেকে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles