Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: কোচবিহার জেলার দিনহাটা ব্লকের একটি গ্রামে, ভোটের সকালে, পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন মহিলা তাঁর বাড়ির উঠোনে বসে চা খাচ্ছিলেন। তাঁর হাতের মুঠোয় ছিল একটি ভোটার কার্ড। প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে দেবে?” তিনি একটু থামলেন, তারপর বললেন, “যে টাকা দেয়, তাকেই।” উত্তরটা অনেক বিশ্লেষকের মতে এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের সবচেয়ে সৎ রাজনৈতিক বিবৃতি।
পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক মহিলা, সংখ্যার হিসেবে প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এঁদের ভোট কোন দিকে যাবে, সেই প্রশ্নটি এবারের নির্বাচনে অন্য যেকোনো প্রশ্নের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। কারণ ২০১১ সালের পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন এই মহিলা ভোটাররা। আর এবার বিজেপি সেই স্তম্ভে সরাসরি কুঠারাঘাত করার চেষ্টা করেছে। ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এই লড়াইটা নিছক দুটো দলের প্রতিযোগিতা নয়, এটা এক গভীরতর প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিচ্ছে আমাদের। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং নারীর রাজনৈতিক সত্তা — এই দুটো কি একসাথে থাকতে পারে, নাকি একটি অপরটিকে গ্রাস করে?
লক্ষ্মীর ভান্ডার চালু হয়েছিল ২০২১ সালে। প্রতি মাসে সাধারণ পরিবারের মহিলারা পান ১৫০০ টাকা, তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলারা পান ১৭০০ টাকা। সংখ্যাটা হয়তো বড় শহরের কারো কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু মুর্শিদাবাদের একটি গ্রামে, বা পুরুলিয়ার কোনো প্রত্যন্ত পাড়ায়, যেখানে একজন মহিলার হাতে নিজের বলে কিছু থাকে না যেখানে সংসারের সব খরচ স্বামীর হাত দিয়ে আসে, শাশুড়ির অনুমোদন দিয়ে যায় — সেখানে প্রতি মাসে নিজের নামে আসা ১৫০০ টাকা নিছক আর্থিক সাহায্য নয়। এটা একটা স্বীকৃতি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজনীতির ভাষাটা বুঝেছেন গভীরভাবে। কল্যাণী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজ সাথী — এই প্রকল্পগুলো শুধু ভোটের হিসেব নয়, এগুলো একটা সম্পর্ক তৈরির প্রকল্প। দিদি বনাম রাষ্ট্র নয় — দিদিই রাষ্ট্র, দিদিই আপনজন। এই আখ্যানটি গ্রামীণ বাংলার মহিলাদের মনে যতটা গভীরে গেছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের গণ্ডি পেরিয়ে একটা সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের ভোটে তার প্রমাণ মিলেছে — বিজেপির তীব্র প্রচারণা এবং কেন্দ্রের যাবতীয় সুবিধা সত্ত্বেও তৃণমূল ফিরে এসেছিল দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন নিয়ে, এবং সেই জয়ের পেছনে মহিলা ভোটারদের ভূমিকা ছিল নির্ধারক।

বিজেপির পাল্টা কৌশল
এবার বিজেপি সেই হিসেবটাই বদলে দিতে চেয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে — ক্ষমতায় এলে মহিলাদের মাসিক সাহায্য দ্বিগুণ হবে, সঙ্গে আরও নানা সুবিধা। ওড়িশায় “সুভদ্রা যোজনা”, মধ্যপ্রদেশে “লাডলি বহনা” — এই প্রকল্পগুলো সেই রাজ্যে বিজেপিকে মহিলা ভোট এনে দিয়েছে। বাংলায় কি একই সমীকরণ কাজ করবে? দলের রণকৌশলবিদরা বিশ্বাস করেছিলেন, হ্যাঁ। এবং সেই বিশ্বাসেই তারা প্রচারের একটা বড় অংশ মহিলাদের দিকে ঘুরিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু বাংলার মাটিতে এই হিসেবে একটা মৌলিক ত্রুটি আছে। ওড়িশায় বা মধ্যপ্রদেশে বিজেপি যখন মহিলা-কেন্দ্রিক প্রকল্প ঘোষণা করেছিল, তখন সেই রাজ্যে তৃণমূলের মতো কোনো প্রতিযোগী আখ্যান ছিল না। বাংলায় আছে। এবং সেই আখ্যানের কেন্দ্রে আছে একটি সহজ কিন্তু অপ্রতিরোধ্য যুক্তি — টাকাটা এখন আসছে। প্রতিশ্রুতি নয়, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢোকা বাস্তব টাকা। বিজেপির দ্বিগুণ টাকার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে তৃণমূলের হাতে আছে মাসের পর মাস ধরে চলে আসা একটা অভিজ্ঞতা, একটা বিশ্বাস। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় বললে — “বার্ড ইন হ্যান্ড” যুক্তিটা এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী।
আরজি কর: যে ক্ষোভ মিলিয়ে যায়নি
তবু, শুধু টাকার হিসেবে এই নির্বাচন মেলে না। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনাটার কথা মনে করতে হবে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সেখানে একজন চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর কলকাতার রাস্তায় যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ হয়েছিল, তাতে সামনের সারিতে ছিলেন মহিলারাই। “রাত দখল করো” — এই স্লোগান কেবল একটি প্রতিবাদের শব্দ ছিল না, এটা ছিল একটা দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এবং সেই ক্ষোভের নিশানা ছিল তৃণমূল সরকারের দিকে। কলকাতা ও শহরতলির শিক্ষিত কর্মজীবী মহিলাদের একটা বড় অংশের মধ্যে যে অবিশ্বাসের বীজ সেদিন পোঁতা হয়েছিল, তা কি ভোটের দিন পর্যন্ত টিকে ছিল?
মহিলা ভোটার: একটি নয়, অনেক পরিচয়
এটাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন। কারণ মহিলা ভোটার একটি সমজাতীয় সত্তা নন। বাংলার মহিলা ভোটারদের মধ্যে রয়েছেন মুর্শিদাবাদের মুসলিম গৃহবধূ, যিনি এনআরসির ভয়ে কাঁপছেন। রয়েছেন উত্তরবঙ্গের রাজবংশী চা-শ্রমিক, যাঁর পরিচয়ের রাজনীতি লক্ষ্মীর ভান্ডারের চেয়ে বড়। রয়েছেন দক্ষিণ কলকাতার মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী মহিলা, যিনি আরজি করের পরে তৃণমূলের প্রতি ভীষণ বিরক্ত। রয়েছেন জঙ্গলমহলের আদিবাসী মহিলা, যাঁর কাছে সবুজ সাথীর সাইকেলটাই এখনো সরকারের সবচেয়ে বড় উপহার। এঁদের সবাইকে একটি বাক্যে ধরা যায় না।
কিন্তু সংখ্যার নিরিখে, এই বিচিত্র সমষ্টির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি হলেন গ্রামীণ বাংলার সেই মহিলারা, যাঁদের কাছে লক্ষ্মীর ভান্ডার একটা বিমূর্ত প্রকল্প নয় — এটা প্রতি মাসের একটা নির্দিষ্ট তারিখের অপেক্ষা। এঁদের ভোট সরানো সহজ নয়। বিশেষত যখন বিকল্পটি হলো একটি দলের প্রতিশ্রুতি, যে দলের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে তাঁদের অনেকের নিজস্ব ভয় ও সংশয় জড়িত।

উত্তরবঙ্গ: ভিন্ন সমীকরণ
উত্তরবঙ্গের ছবিটা অবশ্য ভিন্ন। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি — এই জেলাগুলোতে রাজবংশী ও আদিবাসী মহিলাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিমধ্যেই বিজেপির দিকে ঝুঁকে ছিলেন। এঁদের কাছে পরিচয়ের রাজনীতি কল্যাণ প্রকল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ — কামতাপুর আন্দোলন, আলাদা রাজ্যের দাবি, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি। এই এলাকায় বিজেপি যদি মহিলা ভোটে সত্যিকারের সিঁদ কেটে থাকে, তা হলে সেটা লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকার হিসেবে নয়, পরিচয়ের রাজনীতির হিসেবে।
কিন্তু এখানেও একটা সীমা আছে। পরিচয়ের রাজনীতি ও কল্যাণ রাজনীতি — এই দুটো সবসময় পরস্পরবিরোধী নয়। একজন রাজবংশী মহিলা একই সঙ্গে তাঁর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি চাইতে পারেন এবং প্রতি মাসের ১৫০০ টাকাও ছাড়তে না চাইতে পারেন। এই দুটো চাহিদার মধ্যে মিলের জায়গাটুকু বের করতে না পারলে বিজেপির কৌশল আংশিক সাফল্যেই সীমিত থাকবে।
যে প্রশ্নের উত্তর ভোটে মেলে না
একটা বড় প্রশ্ন এই গোটা আলোচনার নিচে চাপা পড়ে থাকে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র মহিলাদের ভোটদাতা হিসেবে কতটা সক্রিয় করে, আর কতটা নির্ভরশীল করে তোলে? লক্ষ্মীর ভান্ডার মহিলাদের হাতে সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে, নাকি তাঁদের একটি বিশেষ দলের রাজনৈতিক বন্দী করে রেখেছে? বিজেপির দ্বিগুণ প্রতিশ্রুতি কি সেই নির্ভরতার চক্রটাকে ভাঙতে চেয়েছে, নাকি নিজেই সেই চক্রের অংশ হয়ে যেতে চেয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ভোটের ফলাফলে পাওয়া যাবে না। ফলাফল শুধু বলবে কে কতটা আসন পেয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারের রাজনৈতিক সত্তার গল্পটা — সে গল্প আরও অনেক দিন, অনেক নির্বাচন ধরে চলতে থাকবে। কারণ সেই দিনহাটার মহিলাটির উত্তরে যে সততা ছিল — “যে টাকা দেয়, তাকেই” — তা কেবল এক ভোটারের কথা নয়। এটা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি প্রান্তিক মানুষের যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া, যে রাষ্ট্র দশকের পর দশক তাঁদের দিকে তাকায়নি, তাকিয়েছে শুধু ভোটের মরসুমে। সেই মানুষ এখন ভোট দেন, চোখ খোলা রেখে। সেটা নিজেই একটা রাজনৈতিক চেতনার চিহ্ন — ভঙ্গুর হলেও, বাস্তব।