বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি — ২৩ এপ্রিল ২০২৬-এর সকালটা অনেক জায়গায় প্রায় স্বাভাবিকই ছিল। মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছেন, ভোট দিয়েছেন, বাড়ি ফিরে গেছেন। চা-বাগানের শ্রমিক থেকে জঙ্গলমহলের কৃষক — উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে মোট ৩ কোটি ৬০ লাখ ভোটার তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। রাত ৯টা পর্যন্ত ভোটদানের হার দাঁড়িয়েছে ৯২.৩৫ শতাংশ, যা স্বাধীনতার পর থেকে এই রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
নির্বাচন কমিশন সেই সন্ধ্যায় এটিকে “বৃহত্তর অর্থে শান্তিপূর্ণ” বলে ঘোষণা করেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে এই বাক্যবন্ধটি কার্যত একটি প্রশংসাপত্র। কারণ এই রাজ্যে একটি নির্বাচন নিছক ভোটগ্রহণের অনুষ্ঠান নয়, এটি দশকের পর দশক ধরে রক্তের ইতিহাস বহন করা একটি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র। এবং ঠিক সেই কারণেই, যখন কোচবিহারের একজন সাধারণ ভোটার কাউকে ধাক্কা না দিয়ে, কোনো বোমার শব্দ না শুনে ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরেন, তখন সেটাই সংবাদ হয়ে যায়।

রক্তাক্ত স্মৃতির পটভূমি

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিংসার ইতিহাস বুঝতে হলে স্বাধীনতার ঠিক পরে ফিরে যেতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, তার পরেই দেশভাগের সাম্প্রদায়িক রক্তক্ষয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের উচ্ছেদ — এই পটভূমিতে রাজ্যের রাজনৈতিক মাটি তৈরি হয়েছিল। সেই মাটিতে প্রথম বড় নির্বাচনী হিংসার বীজ বোনা হয়েছিল কংগ্রেসের শাসনকালে। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পুলিশ ও ভাড়াটে বাহিনী ব্যবহার করে, বিরোধী দলের হাজার হাজার কর্মীকে তাঁদের এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে — এবং ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে ভোটে জয়ী হয়।

এরপর ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছিল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু সিপিআই(এম)-নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তার পূর্বসূরির চেয়েও বেশি মাত্রায় রাজনৈতিক হিংসার সংস্কৃতি অব্যাহত রাখে। গ্রামীণ বাংলায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে ঘিরে যে দলীয় সর্বাধিকারবাদ গড়ে উঠেছিল, তা বাম আমলে পরিণত রূপ পেয়েছিল। পার্টির নির্দেশ ছাড়া জমি পাওয়া যেত না, চাকরি হতো না, এমনকি মৃতদের শেষকৃত্যও মাঝে মধ্যে দলীয় বিবেচনায় বাধাগ্রস্ত হতো — এই ধরনের অভিযোগ ছিল সুপরিচিত।

গবেষক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই বাস্তবতাকে ‘পার্টি-সমাজ’ নামে চিহ্নিত করেছেন যেখানে দল গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি স্তরকে কব্জা করে নিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১-তে এসেছিল বদলার রাজনীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, সেই একই কায়দায়, আরও তীব্রতায়, হিংসার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থেকেছে।

সংখ্যাগুলো চমকে দেওয়ার মতো। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সাল থেকে গড়ে প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গে ২০টি রাজনৈতিক হত্যা সংঘটিত হয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে কেবল তৃণমূল ও বিজেপির কর্মীদের সংঘাতে ৪৭টি রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পরে যে হিংসার ঢেউ উঠেছিল, তা গোটা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল — সুপ্রিম কোর্ট থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সকলেই উদ্বেগ জানিয়েছিল।

 

২৩ এপ্রিল: কী ঘটেছে, কী ঘটেনি

এবারের ভোট কি সত্যিই নির্ঝঞ্ঝাট ছিল? না, পুরোপুরি নয়। একাধিক জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।

নথিভুক্ত ঘটনাসমূহ
  • বীরভূমের লাভপুরে বিজেপি প্রার্থীর এজেন্টকে মারধরের অভিযোগ
  • মুরারইতে সংঘর্ষে দুজন কংগ্রেস কর্মী আহত
  • দুবরাজপুরে সিএপিএফ জওয়ানদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া, দুজন আহত
  • মুর্শিদাবাদের শিবনগরে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়েছে
  • শিলিগুড়িতে তৃণমূল-বিজেপি সংঘাত; সারা রাজ্যে ৪১ গ্রেফতার, ৫৭১ প্রতিরোধমূলক গ্রেফতার
  • মুর্শিদাবাদের নাওদায় তৃণমূল ও আজুপ সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে
  • শিবনগর গ্রামে পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে পড়েছিল যে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে লাঠিচার্জ করতে হয়েছে।
কিন্তু এই সংখ্যাগুলো পড়তে পড়তে যদি মনে পড়ে ২০২১ সালের কথা যেখানে ভোটের পরে দলীয় হামলায় প্রাণ হারানোর দাবি করেছিল উভয় পক্ষ, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বাড়ি, রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিল আতঙ্ক — তাহলে ২০২৬ সালের ছবিটা সত্যিই ভিন্ন মনে হয়। একটি মৃত্যুও রিপোর্ট হয়নি। কোনো গ্রাম জ্বলেনি। সেই তুলনায়, “লাভপুরে এজেন্টকে মারধর” — এটি গুরুতর, কিন্তু এটি এই রাজ্যের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক মাপকাঠিতে ভিন্ন মাত্রার ঘটনা।
ঠিক এই জায়গাতেই প্রশ্নটা উঠে আসে — একটি রাজ্যে গণতান্ত্রিক ন্যূনতম মানটা এতটা নিচে নেমে গেছে কীভাবে যে একটি স্বাভাবিক ভোট দেখেই মানুষ বিস্মিত হয়?

কেন এই বিস্ময়?

পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের স্মৃতি কোটিকোটি ছোট ছোট অভিজ্ঞতায় তৈরি। এমন মানুষ আজও আছেন যাঁরা বুথের দিকে যেতেন না কারণ জানতেন তাঁর ভোট আগেই পড়ে গেছে। এমন বাবা-মা আছেন যাঁরা ভোটের দিন ছেলেকে ঘরে বসিয়ে রেখেছেন কারণ বিরোধী দলের কর্মী হওয়ার কারণে পথে বেরোলে মার খাওয়ার সম্ভাবনা থাকত। এমন প্রার্থী আছেন যাঁরা নিজের এলাকায় প্রচার করতে পারেননি, কারণ পাড়ায় পাড়ায় ক্ষমতাসীন দলের নজরদারি ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের নির্বাচনে কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান। এবারের নির্বাচনে ১৫২টি আসনে ২,০৪৭ জন কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর (সিএপিএফ) জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের ওয়েবকাস্টিং ব্যবস্থা ছিল শতভাগ নিখুঁত — ইভিএমের উপর ক্যামেরার কোণ থেকে শুরু করে ইন্টারনেট-বিহীন এলাকায় আলাদা প্রোটোকল, সব কিছুই আগাম পরিকল্পনা করা ছিল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, নির্বাচন হতে হবে সম্পূর্ণ হিংসামুক্ত এবং ভয়হীন পরিবেশে।
কিন্তু কেবল প্রশাসনিক তৎপরতাই কি যথেষ্ট? সম্ভবত না। আসলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে আরও গভীর রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। এবার তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে প্রতিযোগিতা এতটাই কাঁটায়-কাঁটায় যে কোনো পক্ষই বেপরোয়া হিংসার রাজনৈতিক মূল্য দিতে রাজি নয়। দেশব্যাপী নজর রয়েছে এই রাজ্যের উপর। সুপ্রিম কোর্ট থেকে মিডিয়া — সকলেই সজাগ। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৯১ লাখ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভয় তৈরি হয়েছে, তা-ও মানুষকে বুথে টেনে এনেছে। মুর্শিদাবাদে রেকর্ড ৯১ শতাংশ ভোটদান তারই প্রমাণ। একটি ভয় আরেকটি ভয়কে কিছুটা হলেও দমন করেছে।

‘স্বাভাবিক’কে কেন উদযাপন করতে হয়

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এখানেই — যখন ‘স্বাভাবিক’ নিজেই একটি অর্জন হয়ে ওঠে। আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমে কোনো ছোট শহরে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, ভোট কেমন হলো, সেখানে কেউ বলবেন না “কেউ মরেনি, এবারের ভোট ভালো হয়েছে।” সেটাই তো ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেই ধরে নেওয়ার সুযোগ কখনো ছিল না।

ফলে আজ যখন কোচবিহার বা আলিপুরদুয়ারের কোনো চা-বাগান এলাকায় একজন আদিবাসী নারী কারোর ধাক্কা না খেয়ে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেটা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। প্রতিবেশীরা একে অপরকে বলেন — এবার একটু শান্তি হলো। সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ছবি, ক্যাপশন দেওয়া হয় “দেখো, এবার কী সুন্দর ভোট হয়েছে!” — যেন এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা।

এই বিস্ময়টাই আসলে সাক্ষ্য দেয় কতটা গভীরে গেছে ক্ষত। যে রাজ্যে দশকের পর দশক ধরে ভোটের দিন মানেই আতঙ্ক, সেই রাজ্যে একটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ভোটকে ‘অলৌকিক’ মনে হওয়া আসলে একটা সভ্যতার সংকটের চিহ্ন। কারণ কোনো সুস্থ গণতন্ত্রে ভোটারের নিরাপত্তা কোনো অর্জন নয়, এটা ন্যূনতম অধিকার।

পরিচয়ের রাজনীতি ও ভোটের ভয়

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে আরেকটি উপাদান এসে যোগ হয়েছে — পরিচয়ের রাজনীতি। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৯১ লাখ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলির মধ্যে যে ভয় তৈরি হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস সেই ভয়কে রাজনৈতিক অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করেছে। মুর্শিদাবাদের রেকর্ড ৯১ শতাংশ ভোটদান — যেখানে মুসলিম ভোটারের আধিক্য — সেই ভয়েরই গণতান্ত্রিক প্রকাশ।

কিন্তু এখানেই একটি বিপদও লুকিয়ে। ভয় থেকে উৎসারিত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ যখন একমাত্র অংশগ্রহণের প্রেরণা হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের মুক্তির মর্মটি কোথাও চাপা পড়ে যায়। মানুষ ভোট দিচ্ছেন কারণ তাঁরা নাগরিক হিসেবে তাঁদের মতামত জানাতে চান — এই অনুভূতির বদলে যদি ভোটটা হয়ে ওঠে টিকে থাকার হাতিয়ার, তাহলে গণতন্ত্র তার সর্বোচ্চ রূপ থেকে অনেকটাই সরে আসে।

অসম্পূর্ণ প্রশংসা

তবু, ২৩ এপ্রিলের রাতে যখন নির্বাচন কমিশনের কর্তারা সংবাদ সম্মেলনে বসলেন এবং জানালেন যে ভোটদানের হার রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে, তখন একটা তৃপ্তি ছিল, স্বস্তির একটা নিশ্বাস ছিল। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, রাজ্য সরকার পাল্টা অভিযোগ করেছে — এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চেহারা। আর সেই স্বাভাবিকতাটুকুই এই রাজ্যের মানুষের কাছে এখন দুর্লভ সম্পদের মতো।

ইতিহাসের বোঝা বহন করা একটি রাজ্যে এই একটি দিনের জন্য — যেদিন বেশিরভাগ মানুষ ভোট দিয়েছেন, বেশিরভাগ মানুষ বাড়ি ফিরেছেন, কেউ মারা যাননি — এটুকুকে ছোট করে দেখার কিছু নেই। কিন্তু এটুকুকে যখন কেউ ‘অসাধারণ’ বলেন, তখন মনে করিয়ে দেওয়া দরকার — এটা অসাধারণ নয়, এটাই হওয়ার কথা ছিল। প্রতিটি নির্বাচনে, প্রতিটি বুথে, প্রতিটি ভোটারের জন্য।

পশ্চিমবঙ্গের আসল অর্জন হবে সেদিন, যেদিন একটি শান্তিপূর্ণ ভোট আর কোনো খবর হবে না।