বাংলায় টিকিট নয়, দিল্লিতে নীতি আয়োগ — লাহিড়ির ‘ক্ষতিপূরণ’

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান নীতি আয়োগের চেহারা এবার আমূল বদলে গেল।
- কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের সাম্প্রতিক আদেশে প্রাক্তন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অশোক কুমার লাহিড়িকে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
- একই সঙ্গে পরিবর্তন করা হয়েছে প্রায় সমস্ত পূর্ণকালীন সদস্যের।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান নীতি আয়োগের চেহারা এবার আমূল বদলে গেল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের সাম্প্রতিক আদেশে প্রাক্তন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অশোক কুমার লাহিড়িকে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবর্তন করা হয়েছে প্রায় সমস্ত পূর্ণকালীন সদস্যের।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক মাধ্যমে নবনিযুক্তদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, নীতি আয়োগ ভারতের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর এক অপরিহার্য স্তম্ভ হয়ে উঠেছে — সমবায়মূলক যুক্তরাষ্ট্রীয়তার পোষক, সংস্কারের বাহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শব্দগুলি নিছক আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয় — এর মধ্যে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে লাহিড়ি
অশোক লাহিড়ি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় ও দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্সের প্রাক্তনী। কর্মজীবনে তিনি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে কাজ করেছেন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত, অটলবিহারী বাজপেয়ী ও মনমোহন সিং, দুই প্রধানমন্ত্রীর আমলেই তিনি মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করেছেন। পরে পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পথচলা এবং শেষ অধ্যায়ে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপির বিধায়ক হিসেবে রাজনীতির মাঠে অবতরণ।
প্রথম ‘রাজনৈতিক’ উপাধ্যক্ষ
এই নিয়োগে একটি ঐতিহাসিক বিশেষত্ব রয়েছে। লাহিড়ি হলেন পরিকল্পনা কমিশন থেকে নীতি আয়োগে রূপান্তরের পর প্রথম ব্যক্তি, যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য থেকে সরাসরি উপাধ্যক্ষের পদে বসলেন। এই ঘোষণা এসেছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। সময়টি কাকতালীয় কিনা তা বলা কঠিন, তবে রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
নতুন সদস্যমণ্ডলীতে বৈচিত্র্যের প্রয়াস
নবগঠিত সদস্যতালিকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। অর্থনীতিবিদ কে ভি রাজু, এইমস দিল্লির পরিচালক এম শ্রীনিবাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব অভয় করান্দিকর এবং আণবিক বিজ্ঞানী গোবর্ধন দাস পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। গোবর্ধন দাস, যিনি আইআইএসইআর ভোপালের পরিচালক এবং ইমিউনোলজি ও সংক্রামক রোগের বিশেষজ্ঞ, তিনিও বাংলার — লাহিড়ির পর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বাঙালি মুখ। বিদায়ী সদস্যরা ছিলেন কৃষি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যনীতির বিশেষজ্ঞ। প্রাক্তন মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাজীব গৌবা একমাত্র যিনি পদে বহাল থাকলেন।
বিতর্কিত অতীত ও অসমাপ্ত যাত্রা
২০১৫ সালের পয়লা জানুয়ারি, নেহরু যুগের পরিকল্পনা কমিশন বিলুপ্ত করে নীতি আয়োগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কেন্দ্রীভূত কমান্ড-অর্থনীতির পরিবর্তে বিকেন্দ্রীভূত, রাজ্যমুখী পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি ছিল নতুন প্রতিষ্ঠানটির মূলে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক এখনও সজীব। পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও কর্ণাটকসহ একাধিক বিরোধী-শাসিত রাজ্য নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিলের বৈঠক বয়কট করেছে। সমবায় যুক্তরাষ্ট্রীয়তার আদর্শ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে এই দূরত্ব প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় সংকটকে সামনে এনে দেয়।
এই পুনর্গঠনের পটভূমিতে রয়েছে একটি বৃহৎ লক্ষ্যমাত্রাও। নীতি আয়োগের প্রাক্তন সিইও বিভিআর সুব্রামণ্যমের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছিল। সেই লক্ষ্য পূরণে আগামী পঁচিশ বছর ধরে বার্ষিক ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৭০ সালের মধ্যে নেট জিরো কার্বন নির্গমনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রসার ও পরিবেশগত সংযমের মধ্যে এই টানাপোড়েন নতুন নীতি আয়োগের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলির একটি হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
প্রশ্ন থাকছে স্বাধীনতা নিয়ে
লাহিড়ির নিয়োগ তাই নিছক প্রশাসনিক রদবদল নয়। অর্থনৈতিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক আনুগত্যের বিশেষ সমন্বয়ের দিকে কেন্দ্র ঝুঁকছে — এই বার্তাটি এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থ কমিশন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে বাংলার বিধানসভা — দীর্ঘ পথ পেরিয়ে লাহিড়ি এখন দিল্লির নীতিনির্মাণের কেন্দ্রে। কিন্তু রাজনীতির মাঠ থেকে ফিরে এসে তিনি কতটা স্বাধীন কণ্ঠে কথা বলতে পারবেন নাকি প্রতিষ্ঠানটি আরও একবার প্রমাণ করবে যে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে কণ্ঠস্বর বদলে যায় — সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



