Table of Contents
সোমক রায়চৌধুরী: তখনও গ্যালারিতে নিজের সিট খুঁজছেন বহু দর্শক। অনেকে ইডেন গার্ডেনের গেটের লাইনে অপেক্ষারত মাঠে ঢোকার জন্য। আম্পায়ারের “প্লে” ঘোষণার সঙ্গেই স্বকীয় স্টাইলে কোণাকুণি রান আপ শুরু করলেন ম্যালকম মার্শাল। অবিশ্বাস্য দ্রুত গতির বল সুনীল মনোহর গাভাস্কারের গ্লাভসে চুম্বন করে ক্ষানিক উড়ে জমা পড়র উইকেটকিপার জেফ্রি দুজোঁর দস্তানায়। ৯০,০০০ দর্শককে বিস্ময় হতবাক করে প্রথম বলের পরই প্যাভিলিওনের দিকে হাঁটা শুরু করলেন লিটল মাস্টার। একটা দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে গেল ইডেনের বাতাসকে। দর্শকদেরও কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল কী হয়ে গেল তা ঠিকমতো ঠাওর করতে। ১০’ডিসেম্বর, ১৯৮৩। ভারত-ওয়েস্টইন্ডিজ টেস্ট ছ’টেস্ট সিরিজের সিরিজের পঞ্চম টেস্ট; ভারত তখন সিরিজে দুই শূন্যতে পিছিয়ে।

আজ যদি হুট করে কোনও ক্রিকেটপ্রেমীকে আপনি জিজ্ঞেস করেন, ওয়েস্টইন্ডিজ টেস্ট টিমের ক্যাপ্টেন কে? তিনি হয়ত বলতেই পারবেন না। আর সেই দলের স্ট্রাইক বোলার কে প্রশ্ন করলে, তো নিশ্চিত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবেন আপনার দিকে! এত দল থাকতে এমন একটা দল নিয়ে প্রশ্ন কেন বাবা, যারা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার ছাড়পত্রই পায় না! কিন্তু আশির দশকে ক্রিকেট বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য ছিল সম্পূর্ণ অন্য। কপিলদেবের ভারত এই টেস্টের পাঁচ মাস আগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও, বিশ্বক্রিকেটে একতরফা শাসকের ত্রাস সঞ্চার করত ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ। আর সেই দলের শক্তির অন্যতম উৎস ছিল চতুর্ভুজ পেস ব্যাটারি।
যাইহোক, প্রথম বলেই রক্তের স্বাদ পেয়ে সঙ্গী মাইকেল হোল্ডিং, অ্যান্ডি রবার্টস আর উইন্স্টন ডেভিসকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মার্শাল। লোয়ার মিডল ওর্ডারে রবি শাস্ত্রী ও রজার বিনিকে নিয়ে কপিল কিছুটা রুখে দাঁড়ালেও, প্রথম দিনেই শেষ হয়ে গেল ভারতের ইনিংস, আড়াইশোর গন্ডি টপকানোর আগেই। সঙ্গী মদনলালকে নিয়ে ওয়েস্টইন্ডিজ টপ ওর্ডারকে ধাক্কা দিলেন কপিল, কিন্তু ক্রিজে দাঁড়িয়ে গেলেন অধিনায়ক লয়েড। লয়েডকে দুরন্ত শতরান করতেও সাহায্য করলেন মার্শাল, আট নম্বরে নেমে ৫৪ রানের একটা ইনিংস খেলে। বাঁ হাতি লয়েড থামলেন ১৬১তে। ১৩৬ রানে পিছিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করল ভারত। এবার আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠলেন মার্শাল। একে একে ফেরালেন অংশুমান গায়কর্ড, দিলীপ বেঙ্গসরকরদের। এই পরিস্থিতিতে সারা ইডেন যার মধ্যে পরিত্রাতা খুঁজছিল, সেই গাভস্কার আবার ব্যর্থ হলেন। ব্যক্তিগত কুড়ি রানের মাথায় এবার সানি হোল্ডিং-এর শিকার। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল ইডেনের। রেহাই পেলেন না ক্লাব হাউসে বসা তার স্ত্রী মার্শেনিল গাভাস্কারও। তার দিকেও ধেয়ে এল কাগজের মিসাইল। আসলে প্রথম টেস্ট থেকেই এই সিরিজে জমে গিয়েছিল মার্শাল বনাম গাভাস্কার দ্বৈরথ। পেস বোলিং-এর বিরুদ্ধে বড় ভরসা মোহিন্দর অমরনাথ চূড়ান্ত অফ-ফর্মে, তাই মার্শালদের গতির বিরুদ্ধে গাভাস্কার রুখে দাঁড়াতে পারলে ভারত ম্যাচ ড্র করে, আর ব্যর্থ হলে হার নিশ্চিত। যেমন দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায় গাভাস্কার দুরন্ত সেঞ্চুরি করে স্পর্শ করেছিলেন স্যর ডন ব্র্যাডম্যানের ২৯টি শতরানের রেকর্ড। ভারত সম্মানজনক ভাবে ড্র করে দ্বিতীয় টেস্ট। এর আগে কানপুরের গ্রীন পার্কের প্রথম ইনিংস থেকেই আগুন ঝরাচ্ছিলেন মার্শাল। থরহরিকম্প ভারতীয় ব্যাটিং। ওই ইনিংসে মার্শালের বোলিং বিশ্লেষণ–আট ওভারে মাত্র ন’রান দিয়ে চার উইকেট, পাঁচটি মেডেন সহ! এর মধ্যে রয়েছে ফাস্ট বোলিং-এর বিপক্ষে সেরা দুই ব্যাটসম্যান–শুন্য রানে গাভস্কার আর অমরনাথের উইকেট। টেস্ট ইতিহাসে এটাই অন্যতম সেরা ওপেনিং স্পেল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা! তাই হয়ত ইডেনের দর্শকরা আশা করেছিলেন, দুরন্ত ছন্দে থাকা ম্যাকোকে(এই নামেই ক্রিকেটমাঠে পরিচিত ছিলেন মার্শাল) কিঞ্চিত শিক্ষা দিয়ে ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড ভেঙে তিরিশতম সেঞ্চুরিটি করবেন সানি। কিন্তু ওই সিরিজে ম্যাকোকে থামায় কে? তাই বাইশ গজে ঘটল সম্পূর্ণ উলটোটা–ভারতের প্রতিরোধহীন আত্মসমর্পণ। চতুর্থ দিনের সকালেই মাত্র ৯০ রানে ভারতকে শেষ করে দিলেন মার্শাল-হোল্ডিংরা, সঙ্গে ৩-০ এগিয়ে গিয়ে শেষ করে দিলেন সিরিজও। এবার মার্শালের ঝুলিতে ছ’উইকেট, প্রথম ইনিংসে তিন উইকেটের পর। কানপুরের পর আরও একটি ইনিংস পরাজয়! প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে গাভাস্কার একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নিলেন। টিম ম্যানেজমেন্টকে অনুরোধ করলেন, মাদ্রাজের শেষ টেস্টে তিনি আর ওপেন করবেন না। যাবেন চার নম্বরে। কিন্তু ক্রিকেট এমনই খেলা, আর মার্শালরা এমনই জাতের বোলার যে চিদম্বমে রান তাড়া করতে নেমে শুন্য রানেই পড়ে গেল ভারতের দু’উইকেট। বাইশ গজে এলেন সানি। ভিভ রিচার্ডস এসে বললেন, “যতই চার নম্বরে নামো হে, স্কোরবোর্ডে দেখ, রান শুন্য”! কিন্তু তিনিও তো সুনীল মনোহর গাভাস্কার; প্রবল সমালোচনা আর চাপের মুখে উপহার দিলেন ঐতিহাসিক ২৩৬ নটআউটের ইনিংস। যা তার কেরিয়েরের সর্বোচ্চ ও ২০০১ পর্যন্ত ছিল কোনও ভারতীর ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের মাইলফলক হয়ে।

৮৩: কানপুরের গ্রীন পার্কে গাভাস্কারের উইকেট নিচ্ছেন মার্শাল
যদিও তাতে এই দীর্ঘ সিরিজে মার্শালের দ্যুতি একটুও ম্লান হয় না। উপমহাদেশের নিষ্প্রাণ উইকেটে পঁচিশ বছর বয়সী বার্বাডোজের ফাস্ট বোলারের সিরিজে মোট শিকার ৩৩ টি! যা এক অনন্য নজির। এছাড়া ব্যাট হাতেও তার অবদান তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান, যার মধ্যে রয়েছে তার জীবনের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গ্রীনপার্কে করা ৮২। লর্ডসে বিশ্বকাপ ফাইনালে চ্যাম্পিয়নশিপের হ্যাট্রিক হাতছাড়া হওয়ার বদলা ভারতের মাটি থেকেই সুদে-আসলে তুলে নিয়ে গেল ক্লাইভ লয়েডের টিম। টেস্ট সিরিজে তিন শুন্য জয়ের সঙ্গে একদিনের সিরিজেও ভারতকে দুরমুশ করে ৫-০ জয়। মার্শাল কি এই ভারত সফরকে তার সেরা সিরিজ বলেছিলেন? তা জানার আর উপায় নেই।
সত্তর দশকের অন্তিম ভাগ। বিশ্বসেরা ক্যারিবিয়ান বোলিং-এ তখন চার তারকা–“প্রফেসর” অ্যান্ডি রবার্টস , “হুইস্পারিং ডেথ” মাইকেল হোল্ডিং, “বিগ জো” জোয়েল গার্নার ও কলিন ক্রফ্ট। তরুণ মার্শাল তখন থাকতেন সাইডলাইনে। তার উচ্চতা গার্নার-ক্রফ্ট দের থেকে অনেকটা কম, পাঁচ ফুট ন’ইঞ্চি, বোলিং অ্যাকশন ছিল ওপেন-চেস্টেড। তাই টেস্ট ক্রিকেটে তার সাফল্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন তার দেশেরই বহু বিশেষজ্ঞ। মার্শাল কিন্তু তাতে দমলেন না। উচ্চতার অভাবে তিনি উইকেট থেকে বাউন্স আদায় করতে পারবেন না, এই চিন্তাকে খন্ডন করলেন স্বকীয় স্টাইলে। উচ্চতার অভাবকে তিনি দারুণ কাজে লাগালেন বলকে স্কিড করানোয়। তার স্কিডিং ইনকাটার সমসাময়িক সেরা ব্যাটসম্যানদের বিপদে ফেলে দিল। বলকে দুদিকে সুইং করানোর সহজাত দক্ষতা ছিল তার। আর ছিল বিস্ফোরক গতি–তার ডেলিভারি আর্ম ছিল অবিশ্বাস্য দ্রুত। আশির দশকের শুরুতে টেস্ট দলে আসার দু’বছরের মধ্যেই ক্লাইভ লয়েডের অপ্রতিরোধ্য টিমের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন তিনি। নিজের আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খন্ড “রানস অ্যান্ড রুইন্স”এ ৮৩’র সিরিজ ও মার্শালের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন গাভাস্কার। “ওর বলের গতি এতটাই ছিল যে ওর বিরুদ্ধে খেলার সময় আমার মনে হত একটা লাল চাকতি ধেয়ে আসছে, কখনোই পুরো বলটা দেখতে পেতাম না। সেই অনুযায়ী মানিনসই টেকনিক বের করতে হত। আর সবথেকে বিপজ্জনক ছিল ওই স্কিড করে আসা ইনকাটার”–সানির বিশ্লেষণ।
এক হাতেই জেতানো যায় টেস্ট
১৯৮৩’র ওই ভারত সফরের কয়েক মাস পর ইংলিশ সামার বা ইংল্যান্ডের গ্রীষ্ম। পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলতে ডেভিড গাওয়ারের দেশে ক্যারিবিয়ান দল। প্রথম দুই টেস্টে জয়ের পর হেডিংলিতে তৃতীয় টেস্ট। গালিতে ফিল্ডিং করছেন ম্যাকো। ক্রিস ব্রডের একটা শট আটকাতে গিয়ে বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল ভেঙে গেল। ডাক্তার জানিয়ে দিলেন, আগামী দশদিন কোনমতেই ক্রিকেট সম্ভব নয়। তৃতীয়দিন ওয়েস্টইন্ডিজ ব্যাট করছে, ৯৬ রানে অপরাজিত ল্যারি গোমস; এমন সময় পড়ল।ইনিংসের নবম উইকেট। ইংল্যান্ড দল অবাক হয়ে দেখল বাঁ হাতে প্লাস্টার নিয়ে ব্যাট করতে নামছেন মার্শাল। ইয়ান বোথামদের খেললেন শুধু ডান হাতে ব্যাট ধরে। তাই দিয়েই হাসতে হাসতে যে মেজাজে একটি বাউন্ডারি মারলেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে রয়ে গিয়েছে। আউট হলেন ল্যারি গোমস সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর। এবার আবার চমক। ইংল্যান্ড ড্রেসিংরুম তখন ধরেই নিয়েছে, যে দ্বিতীয় ইনিংসে তাদের মোকাবিলা করতে হবে তিনজন পেসারকে। সেই ড্রেসিংরুমের ঠিক সামনে গিয়ে ওয়ার্মআপ শুরু করল ওয়েস্টইন্ডিজ দল। আবার অবাক হওয়ার পালা; হাতে প্লাস্টার নিয়ে রয়েছেন মার্শালও! ডেলিভারি অ্যাকশন একটু মানিয়ে নিয়ে স্বমহিমায় শুরু করলেন ম্যাকো, শর্ট বলে ফেরালেন ব্রডকে। কিন্তু ইংল্যান্ড ব্যাটসম্যানরা আপত্তি জানাতে শুরু করলেন এই বলে, যে বোলারের হাতের প্লাস্টার তাদের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করছে। কুছ পরোয়া নেহি–মার্শাল ছাড়লেন না। সাজঘরে প্লাস্টার খুলে ফিরে এলেন হাতে ইলাস্টোপ্লাস্ট বেঁধে। সেই পড়ন্ত বেলাতেই তুলে নিলেন তিনটি উইকেট। পরদিন ছিল রেস্ট ডে। চতুর্থ দিন আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে হয়ে উঠলেন আরও ভয়ঙ্কর। ওই অবস্থায় বল করলেন মোট ছাব্বিশ ওভার। ৫৩ রানে সাত উইকেট দখল করে গাওয়ারদের শেষ করে দিলেন ১৫৯ রানে। প্রয়োজনীয় রান সংগ্রহ করে ম্যাচ ও সিরিজ জিতল ওয়েস্টইন্ডিজ। প্রসঙ্গত এক হাতে ব্যাট করার নজির টেস্ট ক্রিকেটে আরও দুজনের রয়েছে। যেমন পাক তারকা সেলিম মালিক(১৯৮৬), আর বহু পূর্বে ইংল্যান্ডের লায়নল লর্ড টেনিসন(১৯২১)। কিন্তু ভাঙ্গা হাত নিয়ে ব্যাটিং ও ম্যাচ জেতানো বোলিং স্পেল–হেডিংলিতে ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মার্শাল। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ তখন মধ্যগগনে। ব্যাট হাতে যেমন শাসন করছেন রিচার্ডস, বল হাতে একই ভূমিকায় ছিলেন মার্শাল। ব্যাটিং ও বোলিং– দু বিভাগেই কপিবুক ইংলিশ ক্রিকেটকে ধ্বংস করে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সুপারস্টাররা সৃষ্টি করেছেন এক বিকল্প ধারার ক্রিকেট শিল্প। এই রাজসিক দাপটের জন্যই দীর্ঘ পনেরো বছর কোনও টেস্ট সিরিজ হারে নি ওয়েস্টইন্ডিজ। অবশেষে ৯৫’তে ঘরের মাঠেই তাদের অপরাজিত দৌড় শেষ হয় মার্ক টেলরদের কাছে হেরে। ভিভ, মার্শালরা তখন অস্তমিত। নতুন বলে তার জুটি মাইকেল হোল্ডিং-এর ব্যাখ্যা–ফিটনেস ও দক্ষতা বাড়াতে দারুণ খাটত মার্শাল। সহনশীলতা আর ক্রিকেটবোধও ছিল প্রবল”। ১৯৮৮’র ইংল্যান্ড সফর করছে ভিভ রিচার্ডসের টিম। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে মন্থর স্পিন সহায়ক পিচ বানালো ইংল্যান্ড, মার্শালদের নিষ্ক্রিয় করতে। চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ খরলছন ম্যাকো। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র বাইশ রানে সাত উইকেট নিয়ে গ্রাহাম গুচ-গ্যাটিংদের গুঁড়িয়ে দিলেন ৯৩ রানে। ইনিংসে হারল ইংল্যান্ড। শাসানির সুরে ভিভ ব্রিটিশ মিডিয়াকে শুনিয়ে দিলেন, “আমাদের সঙ্গে ভুলেও কখনও আর এই কৌশল নিতে যেও না!” অ্যাডিলেড ও সিডনিতেও এরকম নিষ্প্রাণ পিচেও পাঁচ উইকেট নিয়ে টেস্ট জিতিয়েছেন মার্শাল। টেস্ট কেরিয়রে বাইশবার নিয়েছেন পাঁচ উইকেট, ম্যাচে দশ উইকেট চারবার। কেরিয়রে বেশিরভাগ সময় ম্যাচ পিছু তার শিকারের গড় পাঁচ। অস্ট্রেলিয় তারকা ডেনিস লিলি কোনওদিন টেস্ট খেলেন নি ভারতের মাটিতে। পাকিস্তানে তার উইকেট মাত্র তিনটি। এখানেই মার্শাল অনন্য। মন্থর নিষ্প্রাণ উইকেটেও তিনি একইরকম বিধ্বংসী। গতির সঙ্গে তার ছিল ক্ষুরধার ক্রিকেটমস্তিষ্ক। নিয়ন্ত্রিত সুইং, কাটার, ইয়র্কার — নিজের বৈচিত্র্যপূর্ণ বোলিং স্টাইলের প্রয়োগ করে বারবার জয় করেছেন পিচের প্রতিবন্ধকতা। ৮১ টা টেস্টে তার সংগ্রহ ৩৭৬ টি শিকার, গড় মাত্র কুড়ির সামান্য বেশি!
১৯৮৭’তে লর্ডসে এমসিসি দ্বিশতবার্ষিকী টেস্টেও ইডেনের মতোই প্রথম বলে গাভাস্কারকে এলবিডব্লিউ করেছিলেন ম্যাকো। কিন্তু প্রদর্শনী ম্যাচ বলে আম্পায়ার আউট দিলেন না; কৃতজ্ঞ চিত্তে গাভাস্কার ১৮৮ করে থামলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে আর আম্পায়ারকে সুযোগই দিলেন না মার্শাল। শুন্য রানে ছিটকে দিলেন সানির স্টাম্প। তবে, সানি নয়, ভারতের বিরুদ্ধে মার্শাল তার সেরা বলটি তুলে রাখতেন দিলীপ বেঙ্গসরকরের জন্য। ৮৩’র সিরিজে তার বাম্পারে চোয়াল ভাঙ্গে বেঙ্গসরকরের। কেন দিলীপের ওপর এই মেঠো আক্রোশ? ৭৮’ ভারত সফরে বেঙ্গসরকর নাকি একটা ক্যাচ দাবি করেছিলেন, যা মার্শালের মতে ছিল সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অখেলোয়ারচিত।

ক্রিকেট আকাশে নক্ষত্রপতন
৮৮’র পর ওয়েস্টইন্ডিজের ইংল্যান্ড সফর ৯১’এ। এই সিরিজে ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজ, জেফ দুঁজোর সঙ্গে মার্শালের টেস্ট জীবনও দাড়ি পড়ে গেল। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে তখন এক পরিবর্তনের বাঁকে দাঁড়িয়ে। মধ্যগগনে কোর্টনি ওয়ালশ, কার্টলি অ্যামব্রোজ, ইয়ান বিশপরা। মার্শাল শুরুর দিকে ছিলেন অ্যামব্রোজ-বিশপদের পথপ্রদর্শক। ওয়ান ডে-তে অবশ্য ১৯৯২ বিশ্বকাপেও দেখা গেল তাকে; গতি তখন অনেক মন্থর, মাথার পেছন দিকে উঁকি দিচ্ছে টাক। ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে হ্যামশায়ারের হয়ে খেললেন ৯৩ অবধি। দক্ষিণ আফ্রিকায় নাটালের হয়ে ৯৪’তে খেলে সর্বস্তরের ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন; বয়স তখন ৩৬। মার্শালের মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে জানান, ক্রিকেটের জন্য দেশে প্রায় থাকতেই পারতেন না মার্শাল। তাই পরের দিকে সফরের সঙ্গী হতেন স্ত্রী। “ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলার সময় সুন্দর সময় কাটিয়েছি আমরা। সপ্তাহান্তে আমাদের বাড়িতে আসত গর্ডন(গ্রিনিজ) আর ডেসমন্ড(হেনস)। চুটিয়ে বসত আড্ডার আসর”।
১৯৯৯ ইংল্যান্ডে বসেছে বিশ্বকাপের আসর। হঠাৎ খবর এল কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত মার্শাল। এর পাঁচ মাস বাদে নভেম্বরেই মাত্র ৪১ বছর বয়সে ক্রিকেটের মহাকাশ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
মার্শাল দ্রুততম ছিলেন কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। হয়ত কোনও স্পেলে ছিলেন, হয়ত ছিলেন না। তার থেকে হয়ত গতিতে অ্যালেন ডোনাল্ড, বা হালের ডেল স্টেনও এগিয়ে থাকবেন। কিন্তু কপিবুক ক্রিকেটকে অগ্রাহ্য করে কোণাকুণি রান আপ, স্বকীয় স্টাইল নিয়ে সিম বোলিং শিল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ করে গিয়েছেন মার্শাল, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে গাঁথা রয়েছে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর দৃশ্যের রিল হয়ে। বার্বাডোজ ঢোকার মুখে বিমানবন্দরের কাছে বার্থলোমিও চার্চ সংলগ্ন জমিতে তাকে সমাধিস্থ করার মুহূর্তেই কি শেষ হয়ে গিয়েছিল ক্যারিবিয়ান পেস বোলিং-এর গরিমা পর্ব? রূপকার্থে ভেবে দেখলে তাই। এরপর একা কুম্ভ হয়ে ব্রায়ান লারা যতই অবিশ্বাস্য নজির গড়ুন, বাইশ গজের লড়াই দেশকে শ্রেষ্ঠত্বের ধারেকাছে নিয়ে যেতে পারেন নি, কারণ তার দলে ছিল না কোনও ম্যালকম মার্শাল। আজও মন্থর ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে তারকা ফাস্ট বোলাররা যখন বেধরক মার খান, তখন বিশেষজ্ঞ ও অধিনায়করা আকাশের দিকে তাকিয়ে এক ধ্রুবতারাকে খোঁজেন।
এমনই ছিল গতি ও সুইং-এর শিল্পী মার্শালের দ্যুতি।