বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে এক প্রাইমটাইম ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করলেন যে ইরানে এক মাস ধরে চলা যুদ্ধ এখন “সমাপ্তির কাছাকাছি”।যদিও বাস্তবে সংঘাত ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে, ট্রান্স-আটলান্টিক সমঝোতা ভাঙছে এবং তাঁর নিজের জনপ্রিয়তাও লাগাতার নিম্নমুখী।
হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে আমেরিকার এই “ছোট্ট অভিযান” প্রায় “সমস্ত সামরিক লক্ষ্য” পূরণ করে ফেলেছে। তবে আগামী “দুই থেকে তিন সপ্তাহে” কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ করবেন, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেননি।
হোয়াইট হাউসের ক্রস হল থেকে দেওয়া ১৯ মিনিটের ভাষণে তিনি বলেন, “আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি যেখানে আমেরিকা ও বিশ্বের বিরুদ্ধে ইরানের অশুভ হুমকির অবসান ঘটতে চলেছে। সব তাস আমাদের হাতে। তাদের কাছে কিছুই নেই।”
যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপের কথা স্বীকার করলেও, ট্রাম্প গ্যাসের দামের “স্বল্পমেয়াদি” বৃদ্ধির জন্য ইরানকেই দায়ী করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভর।
তাঁর এই বক্তব্যের পরও তেলের দাম আরও বেড়ে যায়। কারণ, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাজারকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথটি নিরাপদ রাখতে অন্যান্য দেশগুলিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, “এটাকে আঁকড়ে ধরুন, এর মূল্য বুঝুন।”
বাস্তবে, ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম এই সপ্তাহে গড়ে প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে যা ২০২২ সালের পর এই প্রথম।
নিজের বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, দেশটি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং “আর কোনও বিপদ ঘটানোর জায়গাতেই নেই।” তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ ইরানের ওপর আমেরিকা “অত্যন্ত কঠোর” হামলা চালিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, “আমরা ওদের পাথরের যুগে ফিরিয়ে দেব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।” যদিও একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, আলোচনাও চলছে।
কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি মিলিয়ে বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছেন। বুধবার সকালে তেহরানে আবারও বোমাবর্ষণ হয়। ইজরায়েল জানায়, তারা তেহরানে দু’দফা হামলা চালিয়েছে এবং বৈরুতে হেজবোল্লার এক শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করেছে।
ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মধ্য ইজরায়েল ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। যার মধ্যে একটি বড় আক্রমণ ইহুদি উৎসব ‘ পাস ওভার’শুরুর ঠিক আগে চালানো হয়।
আন্তর্জাতিক রেড-ক্রসের হিসেব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে অন্তত ১,৯০০ জন নিহত এবং ২০,০০০ জন আহত হয়েছেন যদিও সঠিক সংখ্যা যাচাই করা কঠিন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ১,৩০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এদের অধিকাংশই সাধারণ নাগরিক, যদিও হেজবোল্লাহ জানিয়েছে, প্রায় ৪০০ জন তাদের যোদ্ধা।
ইজরায়েলে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত এবং ৫১৫ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও শতাধিক সেনা আহত।
আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসেব অনুসারে “অপারেশন এপিক ফিউরি” শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে ১২,৩০০-র বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কখনও তারা বলছে ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে, আবার কখনও ভিন্ন সুর। বুধবার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, ইরানের “নতুন প্রেসিডেন্ট” নাকি যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানিয়েছেন যা তেহরান “ভিত্তিহীন ও মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দেয়।
এছাড়া ট্রাম্প আসলে কার সঙ্গে কথা বলেছেন, সেটিও স্পষ্ট নয়। ইরানে এখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনিই। মার্কিন বিমান হামলার প্রথম দিনেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেন।
ট্রাম্পের ভাষণের আগে পেজেশকিয়ান সরাসরি আমেরিকার জনগণের উদ্দেশে বার্তা দেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এই যুদ্ধে ঠিক কোন আমেরিকান স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে? আদৌ কি এমন কোনও বিপদ ছিল, যা এই আচরণকে ন্যায্যতা দেয়?”
তিনি ইঙ্গিত দেন, ইজরায়েলের চাপে হোয়াইট হাউস যুদ্ধে জড়িয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলাকে তিনি জানান
“বৈধ আত্মরক্ষার পরিমিত প্রতিক্রিয়া” বলে দাবি করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, “‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কি সত্যিই এখন মার্কিন সরকারের অগ্রাধিকার?”
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছেন ট্রাম্প নিজেই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন কারণ তারা যুদ্ধে যোগ দেয়নি এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে উদ্যোগ নেয়নি। ভাষণে ন্যাটোর কথা না বললেও, এর আগে তিনি রয়টার্সকে বলেন, তিনি “নিশ্চিতভাবেই ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র টেলিগ্রাফকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি কখনও এই ৭৭ বছরের পুরনো সামরিক জোটকে গুরুত্ব দেননি এবং “সবসময়ই এটাকে কাগুজে বাঘ” মনে করেছেন।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধবিরতি নির্ভর করবে ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেয় কি না তার ওপর। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মার্কিন সেনা খুব দ্রুত ইরান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তবে প্রয়োজন হলে “টার্গেটেড হামলা” চালানো হবে।
নিজের ভাষণে তিনি এই যুদ্ধকে আমেরিকার অতীতের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলোর থেকে আলাদা হিসেবে তুলে ধরেন। ৩২ দিনের এই সামরিক অভিযানকে তিনি বলেন “অত্যন্ত শক্তিশালী, অত্যন্ত সফল।”
কিন্তু যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে দাঁড়িয়ে এখনও আমেরিকার মূল লক্ষ্য কী তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে উদ্বেগকে খাটো করে দেখিয়েছেন, বলেছেন এটি এত গভীরে মাটির নিচে যে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ এর আগে তিনি বলেছিলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত করাই ছিল যুদ্ধের প্রধান কারণ। বিশ্লেষকরা তাঁর এই দাবির বিরোধিতা করেছেন এবং বলেছেন, ইরান খুব শিগগিরই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে পারবে এমন প্রমাণ নেই।
এদিকে, হাজার হাজার মার্কিন সেনা এখনও ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিমান হামলার পরও বৃহত্তর স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।