ফ্লোরিডা থেকে বুধবার সন্ধ্যায় এক বিশাল কমলা-সাদা রঙের নাসার রকেট গর্জন তুলে আকাশে উঠল।চারজন নভোচারীকে মহাকাশের পথে নিয়ে যেতে, আর সেই সঙ্গে দর্শকদের কল্পনাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল এমন এক ভবিষ্যতের দিকে, যখন আবার আমেরিকানরা চাঁদের মাটিতে পা রাখতে পারে।
ঠিক যেমনটা হয়েছিল অ্যাপোলো কর্মসূচির স্বর্ণযুগে—যখন প্রথম মানুষ চাঁদে পা রাখে—তেমনি এবারও সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার ‘স্পেস কোস্ট’-এর সমুদ্রসৈকতে ভিড় জমাল হাজার হাজার মানুষ। সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে (ইস্টার্ন সময়) যখন পরিষ্কার গোধূলি আকাশ চিড়ে রকেটটি উড়ে গেল,প্রবল উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। রকেটটি আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে যায়,এমন এক যাত্রায়, যা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবে, কিন্তু সেখানে অবতরণ করবে না।
‘ইন্টেগ্রিটি’ নামের মহাকাশযানে চড়ে এই অভিযানে রয়েছেন রিড উইসম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং জেরেমি হ্যানসেন। তাদের এই সফর প্রায় ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে ভবিষ্যতে আরও মহাকাশ অনুসন্ধানের পথ প্রশস্ত করার জন্য, এবং শেষ পর্যন্ত নতুন করে চাঁদে অবতরণের প্রস্তুতি নিতে।
এই মিশনের নাম ‘আর্টেমিস II’। একবিংশ শতাব্দীর এই অভিযানকে অনেকেই তুলনা করছেন ‘অ্যাপোলো ৮’-এর সঙ্গে,যে অভিযানে নাসার নভোচারী ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান, জেমস লাভেল এবং উইলিয়াম অ্যান্ডার্স বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেছিলেন। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের উৎক্ষেপণ ছিল ঐতিহাসিক কারণ সেটিই ছিল প্রথমবার, যখন নভোচারীরা নাসার শক্তিশালী স্যাটার্ন ভি রকেটের মাথায় চড়ে মহাকাশে পাড়ি দেন। শুধু পৃথিবীর চারপাশে পরীক্ষামূলক উড়ান নয়, বরং সরাসরি চাঁদের কাছে গিয়ে ফিরে আসার সেই সাহসী সিদ্ধান্ত মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অন্য একটি জ্যোতিষ্ককে মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছিল।
অ্যাপোলো ৮-এর মতোই, আর্টেমিস II-এর লক্ষ্যও হল—মহাকাশযানটি নিরাপদে এই যাত্রা সম্পন্ন করতে পারে কিনা এবং প্রায় ১০ দিনের এই সফরে নভোচারীদের জীবিত ও সুস্থ রাখতে পারে কিনা, তা পরীক্ষা করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই যাত্রা শেষ হবে ১০ এপ্রিল, প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের মাধ্যমে।
তবে অ্যাপোলো যুগের থেকে এই মিশনের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। তখন সব নভোচারীই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। কিন্তু এবার তৈরি হয়েছে একাধিক ইতিহাস। নাসার ভিক্টর গ্লোভার হবেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি, যিনি গভীর মহাকাশে যাবেন। ক্রিস্টিনা কচ হবেন প্রথম মহিলা, আর কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন হবেন প্রথম, যিনি আমেরিকান না হয়েও চাঁদ অভিযানে অংশ নেবেন। এই অভিযানের কমান্ডার হলেন রিড উইসম্যান।
১৯৬০-এর দশকে নাসা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে চাঁদে পৌঁছতে চেয়েছিল। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার প্রতিযোগিতা চিনের সঙ্গে , চিনের মহাকাশ উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে নাসা মাথা নত করতে প্রস্তুত নয়।চিন ঘোষণা করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের নভোচারীদের তারা চাঁদে নামাতে চায়। তবে এবার লক্ষ্য শুধু দৌড়ে জেতা নয়, বরং চাঁদের মাটিতে স্থায়ী উপস্থিতির পথ প্রশস্ত করা যাতে আগামী দশকে সেখানে একটি ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়।
ডিসেম্বরে নাসার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ধনকুবের উদ্যোক্তা জ্যারেড আইজ্যাকম্যান আর্টেমিস কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা করেছেন। গত বছর অনিশ্চয়তা ও কর্মীসংকোচনের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীবাহিনীকে নতুন করে একত্রিত করে তিনি লক্ষ্য স্থির করেছেন। তা হোল২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের মাটিতে মানুষ আবার পা রাখবেই ।