Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইরানের হামলায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ এক-পঞ্চমাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানির দাম; ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ৫৪ শতাংশ বেড়ে এখন ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ।
বাজারের প্রত্যাশা বনাম বাস্তব চিত্র
এতকিছুর পরেও জ্বালানির দাম আরও বেশি না বাড়ার কারণ একটাই—বিনিয়োগকারীরা এখনও আশা করছেন, খুব শিগগিরই সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। Société Generale-এর হিসেব অনুযায়ী, জুলাইয়ের পরের ডেলিভারির জন্য বাজারে “পুট” অপশনের সংখ্যা “কল” অপশনের তুলনায় বেশি—অর্থাৎ অনেকেই বাজি ধরছেন যে দাম কমবে। পরিবহন বিলম্বের হিসেব কষলে দাঁড়ায়, বাজারের ধারণা—মে মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কিন্তু সেই আশার বাস্তবতা যাচাই করতে গিয়ে The Economist হিসেব কষে দেখেছে—যদি আজই যুদ্ধ থেমে যায়, তাহলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এমনকি যদি ইরান ২১ মার্চ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম মেনে নিয়ে প্রণালী খুলেও দেয়—যা নিজেই এক বিরাট অনিশ্চয়তা—তবুও বিশ্ব তেল ও গ্যাস বাজার মাসের পর মাস ঘাটতিতে ভুগবে, এবং তার অভিঘাত পড়বে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে।
জ্বালানি বাজার পুনরুদ্ধারের তিনটি ধাপ
হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়ার পর জ্বালানি বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে প্রধানত তিনটি জটিল ধাপ অতিক্রম করতে হবে। প্রথমত, উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী উৎপাদন মাত্রায় ফিরে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদিত তেল ও গ্যাস জাহাজে বোঝাই করে বিশ্বজুড়ে শোধনাগারগুলোতে পৌঁছাতে হবে। তৃতীয়ত, শোধনাগারগুলোকে সেই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি অবিচ্ছিন্ন শিল্পশৃঙ্খল, যার প্রতিটি স্তরেই সময়ের প্রয়োজন।
উৎপাদন খাতের সংকট
রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং মজুতের সীমাবদ্ধতার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলি মিলিতভাবে প্রতিদিন ১ কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়েছে, যা বিশ্বের উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ এবং তাদের নিজস্ব যুদ্ধ-পূর্ব উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ। এই উৎপাদন আবার শুরু করতে হলে প্রথমে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে, পাইপলাইনের অবরোধ দূর করতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে চাপ ফিরিয়ে এনে কূপগুলো চালু করতে হবে। অতিরিক্ত চাপ দিলে রিজার্ভয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র যেখানে তেল আলাদা করা, সংকোচন ও শোধনের কাজ শুরু হয়, সেগুলিও পুনরায় সচল করতে সময় লাগবে।
যদিও ওপেকের সদস্য হিসেবে এই দেশগুলি স্বল্প সময়ে উৎপাদন বাড়ানো-কমানোর অভিজ্ঞতা রাখে, তবুও এবারের কাটছাঁট এতটাই আকস্মিক এবং এত গভীর যে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরো প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হতে অন্তত দুই থেকে চার সপ্তাহ লাগবে।
গ্যাস পরিস্থিতি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও সঙ্গীন। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি সরবরাহকারী কাতারের রাস লাফান কেন্দ্রটি ২ মার্চ ইরানি ড্রোন হামলার পর থেকে বন্ধ রয়েছে। গত সপ্তাহের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এর ১৪টি তরলীকরণ ইউনিটের মধ্যে দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীর মতে, এই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকেও বাধাগ্রস্ত করবে। অন্যান্য স্থাপনার ক্ষতি তুলনামূলক কম হলেও সেগুলো চালু করতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সময় ব্যয় হবে। বিশেষ করে যন্ত্রপাতি থেকে আর্দ্রতা অপসারনের মতো সূক্ষ্ম কাজগুলো করতে হবে, যাতে $-160$°C তাপমাত্রায় পাইপ ফেটে না যায়। তাড়াহুড়ো করলে ধাতু অসমভাবে সংকুচিত হয়ে ওয়েল্ডিং ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবোর মতে, এই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সাত সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
পরিবহন ও বিমা খাতের অচলাবস্থা
পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি হলেও উপসাগরে আটকে থাকা প্রায় ৪৮০টি জাহাজ তাৎক্ষণিকভাবে যাত্রা শুরু করবে না। ট্যাঙ্কারগুলো দুই সপ্তাহের মধ্যে বেরিয়ে যেতে পারলেও নতুন জাহাজের আগমন অনিশ্চিত। ইরান উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরে হামলা চালানোয় জ্বালানি ট্যাঙ্ক, গুদাম এবং নোঙর করা জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অবকাঠামো মেরামত এবং পথ নিরাপদ করতে মাসের পর মাস সময় লাগতে পারে। তদুপরি, যুদ্ধবিমা প্রায় বাতিল হয়ে গেছে এবং বর্তমানে যে প্রিমিয়াম নেওয়া হচ্ছে তা ১ শতাংশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে জাহাজের পরিচয় গোপন রাখা অসম্ভব হওয়ায় ইরানের শত্রুদেশের সাথে যুক্ত জাহাজগুলো সহজেই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, ফলে বিমা খরচ দ্রুত কমার সম্ভাবনা নেই।
এমনকি বিমা পাওয়া গেলেও, জাহাজমালিক ও ক্যাপ্টেনরা দ্বিধায় থাকবেন। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা গত নভেম্বর তাদের হামলা বন্ধ করলেও, এখনও ২০২৩ সালের তুলনায় অর্ধেক ট্যাঙ্কারই লোহিত সাগর দিয়ে যেতে সাহস করছে—এলএনজি ট্যাঙ্কার তো প্রায় নেই বললেই চলে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও বৈশ্বিক সংকট
এর পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে ট্যাঙ্কারগুলির অবস্থানও এখন এলোমেলো। যুদ্ধ শুরু হতেই অনেক সুপারট্যাঙ্কার আটলান্টিক মহাসাগরে চলে গেছে। হরমুজ খুললেও তারা বর্তমান যাত্রা শেষ না করে ফিরবে না—যেমন আমেরিকা থেকে তেল নিয়ে চীনে পৌঁছে তারপর উপসাগরে ফেরা। এই পুরো চক্রে প্রায় ৯০ দিন সময় লাগে।
এদিকে, কাঁচা তেল শোধনাগারে পৌঁছালেও সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সংকট দূর হবে না। চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের অনেক শোধনাগার কাঁচামালের অভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এশিয়ায় মোট প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ৮ শতাংশ কমে গেছে। এই কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে, বিশেষ করে জরুরি বন্ধ হয়ে থাকলে তা মাসের পর মাস সময় নিতে পারে। প্রতিটি পাইপ পরিষ্কার করা, বিদ্যুৎ, বাষ্প, শীতলীকরণ ও সংকুচিত বায়ুর ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা, ধীরে ধীরে তাপ বাড়ানো—সবই সময়সাপেক্ষ।
এই সমস্ত ধাপ মিলিয়ে হিসেব করলে দেখা যায়—আজই যদি যুদ্ধ শেষ হয়, তবুও বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে অন্তত চার মাস লাগবে। অন্যান্য দেশ উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। ফলে এ বছর বিশ্ব তেল উৎপাদন পরিকল্পনার তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমে যাবে। রাস লাফান যতদিন বন্ধ থাকবে, প্রতি মাসে বিশ্ব প্রায় ৭ মিলিয়ন টন এলএনজি হারাবে—যা বার্ষিক সরবরাহের প্রায় ২ শতাংশ। ফলে, কাতার আংশিক উৎপাদন শুরু করলেও মোট উৎপাদন চাহিদার তুলনায় ৪ শতাংশ কম থাকবে।
এর প্রভাব গভীর। মার্চ শেষে বিশ্ব তেলের মজুত ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক নিম্নসীমার কাছাকাছি। হরমুজ খুললেও তা আরও কিছুদিন কমতেই থাকবে। যেসব দেশের মজুত কম, তারা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা শুরু করতে পারে। ফলে দাম হঠাৎ লাফিয়ে উঠতে পারে। এলএনজি নিয়েও শুরু হতে পারে প্রতিযোগিতামূলক দরকষাকষি। হরমুজ বন্ধ হওয়ার আগে কাতার থেকে পাঠানো শেষ চালানগুলি কয়েক দিনের মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপে পৌঁছাবে। তারপর ক্রেতাদের নতুন উৎস খুঁজতে হবে—না হলে শীতের আগে মজুত ভরাট করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাস ব্যবসায়ীরা এখনও বসন্তকালের এক অলৌকিক সমাধানের আশায় রয়েছেন। গোটা বিশ্বও যেন সেই আশাতেই প্রার্থনা করছে। কিন্তু ট্রাম্প ও ইরানের নেতারা যদি কালই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, তবুও জ্বালানি সরবরাহের জটিল বাস্তবতা এত সহজে মিটবে না। উত্তর গোলার্ধের শীত পর্যন্ত এই যুদ্ধের অভিঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে তাড়িয়ে বেড়াবে।