Home খবর ট্রাম্প-বিবি ঠান্ডাযুদ্ধ

ট্রাম্প-বিবি ঠান্ডাযুদ্ধ

0 comments 3 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ২০তম দিনে এসে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মতভেদ প্রকাশ্যে এল। কারণ একটাই — ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলা। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই নেতার ভাষা ও অবস্থানের পার্থক্য এখন আর আড়ালে নেই।

নিষেধ উপেক্ষা করেই হামলা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে ওভাল অফিসে বৈঠকের সময় সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিশ্বের বৃহত্তম এই গ্যাসক্ষেত্রে হামলায় তিনি সমর্থন দেননি, অনুমোদনও দেননি।

অথচ বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি, যারা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেছেন, জানিয়েছেন, হামলার আগে ইজরায়েলের পরিকল্পনা সম্পর্কে আমেরিকাকে অবহিত করা হয়েছিল। ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যম পোস্টে আমেরিকা “কিছুই জানত না” বলার দাবির সঙ্গে এই তথ্য সরাসরি সাংঘর্ষিক।

নেতানিয়াহুর অবস্থান: একাই সিদ্ধান্ত, তবু ফাটল নেই

নেতানিয়াহু জানান, ইজরায়েল “একাই পদক্ষেপ নিয়েছে” এবং ট্রাম্পের অনুরোধে ভবিষ্যতে ওই গ্যাসক্ষেত্রে আর হামলা না চালানোর ব্যাপারে তিনি সম্মত হয়েছেন। একই সঙ্গে দুই নেতার মধ্যে দূরত্বের ধারণাকে তিনি খাটো করে দেখাতে চান।

“গত ৪০ বছর ধরে আমি বলে আসছি — ইরান ইজরায়েলের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনই বিশ্বের জন্যও। আর এটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন,” জেরুসালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন তিনি।

“আমার মনে হয় না কোনো দুই নেতা ট্রাম্প আর আমার মতো এতটা সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। তিনি নেতা। আমি তাঁর মিত্র। আমেরিকাই নেতৃত্ব দিচ্ছে,” যোগ করেন নেতানিয়াহু।

হামলার পরিণতি: জ্বালানি বাজারে ধাক্কা, মিত্রদের চাপ

সাউথ পার্সে হামলার পর ইরান পাল্টা আঘাত হানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের জ্বালানি অবকাঠামোয়। আগে থেকেই উত্তপ্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজার আরও অস্থির হয়ে পড়ে, দাম আরও বাড়ে। উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো ট্রাম্পকে আহ্বান জানায় নেতানিয়াহুকে সংযত করতে।

বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তি দেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে বোঝাপড়া রয়েছে, তবে ইরান নীতিতে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পরিচালিত হন আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে সামনে রেখে।

এক যুদ্ধ, দুই লক্ষ্য

দুই নেতার কৌশলগত উদ্দেশ্য যে এক নয়, তা এখন আর অস্পষ্ট নয়। আমেরিকার বিমান হামলা মূলত লক্ষ্য করেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, বিপর্যস্ত পারমাণবিক কর্মসূচিতে আরও আঘাত করা এবং নৌবাহিনীকে দুর্বল করা। অন্যদিকে ইজরায়েল ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে, যার লক্ষ্য ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা।

জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড বৃহস্পতিবার হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির শুনানিতে এই পার্থক্য স্বীকার করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছেন, তা ইজরায়েল সরকারের লক্ষ্য থেকে আলাদা।”

নেতানিয়াহু এই মুহূর্তকে তুলে ধরছেন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক নতুন যুগের সম্ভাবনা হিসেবে, যেখানে তেহরানে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে যা তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী এবং ইজরায়েলবিরোধী নয়। ইজরায়েলের অভ্যন্তরে এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনও আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি, যা নেতানিয়াহুকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানোর রাজনৈতিক সুযোগ দিচ্ছে।

ইরানি বিদ্রোহ নিয়ে ট্রাম্পের সংশয়

নেতানিয়াহুর তুলনায় ট্রাম্প এখন ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার সম্ভাবনা নিয়ে অনেকটাই শীতল অবস্থান নিয়েছেন। এই সংঘাতের কারণ হিসেবে তিনি সময়ে সময়ে নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তবে একটি বিষয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে অনড় — ইরান যেন “কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে”। এটাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইরানিদের বলেছিলেন, তারা শিগগিরই গত ৪৭ বছরের ধর্মীয় শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু গত সপ্তাহে ফক্স নিউজ রেডিওতে তিনি অনেক বেশি সতর্ক সুরে কথা বলেন এবং ইরানের আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন — যারা সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

“যাদের হাতে অস্ত্র নেই, তাদের জন্য এটা খুব বড় বাধা। আমি মনে করি এটা অত্যন্ত কঠিন,” বলেন ট্রাম্প।

সঞ্চালক ব্রায়ান কিলমিড জিজ্ঞাসা করলে — ইরানিদের নিজেদের দেশ পুনর্দখলের আহ্বান জানানো নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি একমত কিনা । ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, তিনি মনে করেন না ইরানিরা এখনই বিদ্রোহে প্রস্তুত। “আমি ভাবতাম বিবি-ও (নেতানিয়াহু) এটা বুঝবে,” যোগ করেন তিনি।

ট্রাম্প কার্ড তবে ট্রাম্পেরই হাতে?

ওবামা প্রশাসনের সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা জোয়েল রুবিন মনে করেন, দুই নেতার মধ্যে পার্থক্য এখনো মূলত উপরিতলেই সীমাবদ্ধ।

“নেতানিয়াহু বহু দশক ধরে চেষ্টা করে আসছেন — কীভাবে আমেরিকার সমর্থন পাওয়া যায়, যাতে ইরানের বিরুদ্ধে মস্তকচ্ছেদমূলক আঘাত চালানো যায়। ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি বলেছেন, ‘চালিয়ে যাও!'” বলেন রুবিন।

তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ তত বাড়বে এবং দুই নেতার মধ্যে ফাটলও তত স্পষ্ট হবে বলে তাঁর আশঙ্কা।

“যুদ্ধের শেষটা সম্ভবত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। ভবিষ্যতে তাদের বুঝে নিতে হবে যে কখন সামরিক অভিযান শেষ করার সময় এসেছে। আর ইজরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের প্রভাব নিয়ে আমেরিকার মতো নয় — এটাই বড় পার্থক্য,” বলেন রুবিন।

হোয়াইট হাউসে পাঁচ বছরে নেতানিয়াহু সম্ভবত ট্রাম্পের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিদেশি মিত্র ছিলেন। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীও কখনো সুযোগ হাতছাড়া করেননি এই বলে প্রশংসা করতে যে, হোয়াইট হাউসে ইহুদি রাষ্ট্রের এমন নির্ভরযোগ্য বন্ধু আগে কখনো ছিল না। তবে গত তিন সপ্তাহে ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা স্বীকার করেছেন — এই যুদ্ধে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, এই ধরনের পার্থক্য স্বাভাবিক।

“তারা তো ওখানেই আছে, আর আমরা অনেক দূরে,” বলেন ট্রাম্প।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles