ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা, বিশেষ করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত — শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও এক বিপজ্জনক অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি সরু জলপথ — হরমুজ প্রণালী — যার ওপর নির্ভর করে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেলের বাণিজ্য। আর সেই নির্ভরতার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের অর্থনীতি, তার শিল্প উৎপাদন, মুদ্রাস্ফীতি, এমনকি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও।
ভারত আজ তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮ শতাংশই আমদানি করে। এই বিপুল আমদানি নির্ভরতা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি মৌলিক দুর্বলতা। বিশেষ করে যখন এই আমদানির একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে এবং তার সিংহভাগই হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে ভারতে পৌঁছায়, তখন সেই সরবরাহপথের সামান্য বিঘ্নও এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ লক্ষ ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে ভারতে আসে যা দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পূরণ করে।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা কেবল প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কাই বাড়ায়নি, বরং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও সামনে এনে দিয়েছে। ইতিহাস বলে, ইরান একাধিকবার এই প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে, এবং যদি বাস্তবে সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তা হবে এক বৈশ্বিক জ্বালানি বিপর্যয় যার অভিঘাত ভারত সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করবে।
বর্তমানে ভারতের কৌশলগত তেল মজুত প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল। এই মজুত দিয়ে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ দিন দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। প্রথম দর্শনে এটি একটি স্বস্তিদায়ক তথ্য মনে হলেও, বাস্তবে এটি খুব সীমিত সময়ের জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করে। যদি দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে এই মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে, এবং তখন ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্যে তেল কিনতে বাধ্য হতে হবে।
ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় ৮০ ডলার প্রতি ব্যারেলের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি ভারতের অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে—খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামে। অর্থাৎ, তেলের দাম বাড়া মানেই মুদ্রাস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে যে পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা উচ্চ জ্বালানি দামের কারণে ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে। একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে পারে, কারণ সরকারকে হয়তো ভর্তুকি বাড়াতে হবে অথবা কর কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা লাঘব করতে হবে।
তবে এই সংকট কেবল তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নীতিরও একটি বড় পরীক্ষা। বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে যে, ভারতের উচিত তার জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যময় করা অর্থাৎ, পশ্চিম এশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য অঞ্চল যেমন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানো। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই পরিবর্তনগুলি সময়সাপেক্ষ এবং তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় খুব বেশি সহায়ক নয়।
ভারত সরকার ইতিমধ্যেই বিকল্প সরবরাহের পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বৃদ্ধি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা, এবং অন্যান্য নতুন বাজারের সন্ধান, সবই এই কৌশলের অংশ। কিন্তু এই বিকল্পগুলিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কারণ বৈশ্বিক তেলের বাজার অত্যন্ত আন্তঃসংযুক্ত এবং যে কোনও বড় সংকটের প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বও বেড়ে যায়। ভারত ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিম এশিয়ায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে—ইরান, সৌদি আরব, এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। এই জটিল সমীকরণ বজায় রেখে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি সূক্ষ্ম কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, যা আগামী দিনে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান সংকট ভারতের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে—যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা আর কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। হরমুজ প্রণালীতে কোনও বিঘ্ন মানেই শুধু তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়া নয়, বরং একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা। তাই এই সংকট ভারতের জন্য এক সতর্কবার্তা যেখানে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন একটাই: এই অনিশ্চয়তার যুগে ভারত কি তার জ্বালানি ভবিষ্যৎকে আরও সুরক্ষিত, স্থিতিশীল এবং স্বনির্ভর করে তুলতে পারবে? নাকি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এই অনিশ্চিত ঢেউয়ের মধ্যেই তাকে বারবার দুলতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকে ভারতের অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।