Home খবর বড় পতনের মুখে ভারতের শেয়ারবাজার

বড় পতনের মুখে ভারতের শেয়ারবাজার

0 comments 13 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের শেয়ারবাজারে গত কয়েক সপ্তাহে যে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (Foreign Portfolio Investors বা FPI) দ্রুত অর্থ প্রত্যাহার। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের উত্তেজনা, ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া ভারতীয় রুপি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার জেরে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (FPI) আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে ভারতীয় ইকুইটি বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে প্রায় ₹৫২,৭০৪ কোটি টাকা।

সূচকে বড় পতন

বাজারে এই ধাক্কার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে প্রধান শেয়ার সূচকগুলোতে। বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক BSE Sensex একদিনেই ১,০৪৮ পয়েন্ট হারিয়ে প্রায় ৮২,৬২৭-এ বন্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক Nifty 50 পড়েছে প্রায় ৩০০ পয়েন্ট। এই পতনে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার বাজার মূলধন কার্যত উবে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ভারতকে “উদীয়মান অর্থনীতির নিরাপদ আশ্রয়” হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভারতের বাজারও বাইরের ধাক্কার কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

কেন টাকা তুলছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

সবচেয়ে বড় কারণ পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। বিশেষত ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারত তার মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে বলে এই মূল্যবৃদ্ধি দেশটির আমদানি বিল ফুলিয়ে দিচ্ছে, যার সরাসরি চাপ পড়ছে টাকার(রুপি) ওপর এবং বাড়ছে চলতি হিসাব ঘাটতি।

টাকার(রুপি) দুর্বলতায় বাড়ছে উদ্বেগ

রুপির ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত টাকাতে সম্পদ কিনে থাকেন। ফলে ডলারের তুলনায় রুপির দাম পড়ে গেলে শেয়ার থেকে মুনাফা হলেও মুদ্রা বিনিময়ের কারণে প্রকৃত আয় কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকি কমাতে বিদেশি তহবিলগুলো ভারতীয় শেয়ার বিক্রি করে দ্রুত অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে। শুধু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেই বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা প্রায় ₹১৩,৫০০ কোটির শেয়ার বিক্রি করেছেন, যা এই বৃহত্তর বহির্গমনেরই অংশ।

সর্বাধিক ক্ষতি যেসমস্ত খাতে

বিক্রির চাপ সবচেয়ে জোরালোভাবে অনুভূত হয়েছে আর্থিক পরিষেবা এবং জ্বালানি খাতে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের শেয়ার বড় অংশ দখল করে থাকায় এই খাতেই পতন সবচেয়ে তীব্র। পাশাপাশি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন, বিমান চলাচল, রাসায়নিক এবং ভোক্তা পণ্য শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এতে এই খাতগুলোর ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে ভারতের অর্থনীতিতে একাধিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

প্রথমত, জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের খরচ কমে যায়। ফলে ভোগব্যয় কমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে তাদের মুনাফা কমে যেতে পারে, যা শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তৃতীয়ত, উচ্চ তেলের দাম মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। যদি মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে, তাহলে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক Reserve Bank of India সুদের হার কমানোর পরিবর্তে তা উচ্চ রাখার পথে হাঁটতে পারে। এতে ঋণের খরচ বাড়বে এবং বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় কমে যেতে পারে।

বিশ্বরাজনীতির ছায়া ভারতীয় বাজারে

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও একবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে ভারতের শেয়ারবাজার কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহ — এই তিনটি শক্তির সম্মিলিত প্রভাবেই নির্ধারিত হচ্ছে বাজারের গতিপথ।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই সতর্ক অবস্থান আরও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারতীয় বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন পরিস্থিতি অপরিবর্তনীয় নয়। পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা প্রশমিত হলে এবং তেলের দাম আবার স্থিতিশীল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজারে ফিরে আসতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে ভারতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এখনও অনেক উন্নত অর্থনীতির তুলনায় ইতিবাচক বলেই তাঁরা মনে করছেন।

তবে আপাতত বাস্তব চিত্র স্পষ্ট — বিশ্বরাজনীতির ঝড় যখন তীব্র হয়, তার প্রথম ঢেউটা আছড়ে পড়ে বিদেশি পুঁজির দ্রুত প্রস্থানের মধ্য দিয়ে। আর সেই ঢেউয়ের আঘাত থেকে ভারতের শেয়ারবাজারও রেহাই পাচ্ছে না।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles