বাংলাস্ফিয়ার: ইরান যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিত্য নতুন কথা বলছেন কেন? কেন তাঁর বক্তব্যে ধারাবাহিকতা থাকছেনা? রয়টার্স জানাচ্ছে এর আসল কারণ হোয়াইট হাউসের অন্দরে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের মধ্যে ক্রমাগত টানাপোড়েন। বিতর্কের কেন্দ্রে এখন একটাই প্রশ্ন: কখন এবং কীভাবে যুদ্ধে “বিজয়” ঘোষণা করা হবে। এই প্রশ্নটি এমন এক সময়ে জটিল আকার নিচ্ছে, যখন সংঘাত ধীরে ধীরে সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো স্পষ্ট রেখা দেখা যাচ্ছে না।
হোয়াইট হাউসের ভেতরের আলোচনা সম্পর্কে অবহিত এক ট্রাম্প উপদেষ্টা এবং আরও কয়েকজন সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, উপদেষ্টারা দুটি পরস্পরবিরোধী অবস্থানে বিভক্ত। একটি গোষ্ঠী ট্রাম্পকে সতর্ক করছে যে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার ফলে পেট্রোলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে তার রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হতে পারে। অন্য গোষ্ঠী পরামর্শ দিচ্ছে, পরিণতি যাই হোক, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
এই বিবরণ হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার এক বিরল আভাস দেয়। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর আমেরিকা যখন সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তখন হোয়াইট হাউসের ভেতরে নানা মুনির নানা মত একটি চূড়ান্ত বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে চলেছে। যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে সেই কৌশল বদলে যাচ্ছে অহরহ।
পর্দার আড়ালের এই টানাপোড়েন স্পষ্ট করে দিচ্ছে ট্রাম্প কতটা বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। গত বছর ক্ষমতায় ফিরে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমেরিকাকে আর অর্থহীন বিদেশি যুদ্ধে জড়াবেন না। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সেই সংঘাত বিশ্ব আর্থিক বাজারকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্টের কানে নিজেদের মত পৌঁছে দেওয়ার এই প্রতিযোগিতা ট্রাম্পের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার এর ফলাফল সরাসরি যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প অনেকটাই সরে এসেছেন। তিনি এখন সংঘাতটিকে সীমিত এক সামরিক অভিযান হিসেবে তুলে ধরছেন এবং বলছেন, প্রধান সামরিক লক্ষ্যগুলোর অধিকাংশ ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে। তবু বার্তাটি স্পষ্ট নয়, বিশেষত জ্বালানি বাজারের কাছে। ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বাজার কখনো দ্রুত উপরে উঠছে, কখনো নিচে নামছে।
বুধবার কেন্টাকির এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, “আমরা যুদ্ধ জিতেছি।” কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার বলেন, “আমরা কি খুব তাড়াতাড়ি চলে আসতে চাই? কাজটা শেষ না করেই?”
অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও কর্মকর্তারা যাদের মধ্যে ট্রেজারি বিভাগ ও ন্যাশনাল ইকনমিক কাউন্সিলের সদস্যরাও রয়েছেন, ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে তেলের দামের ধাক্কা এবং পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধি দ্রুতই যুদ্ধের বিপক্ষে জনমত তৈরি করে দিতে পারে। বিশেষত যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত এই যুদ্ধের পক্ষে নয়।
রাজনৈতিক উপদেষ্টারাও একই সুরে কথা বলছেন। ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলিস এবং তাঁর ডেপুটি জেমস ব্লেয়ার প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিচ্ছেন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে এবং জনতাকে বারবার সেই আশ্বাস দিয়ে যেতে।
অন্যদিকে কঠোর অবস্থানের পক্ষেও জোরালো চাপ রয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ও টম কটন এবং রক্ষণশীল মিডিয়া বিশ্লেষক মার্ক লেভিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখতে উৎসাহিত করছেন। তাদের যুক্তি, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না এবং মার্কিন সেনা ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার জোরালো জবাব দিতে হবে।
তৃতীয় একটি মতও রয়েছে, যার উৎস হোয়াইট হাউসের বাইরে ট্রাম্পের ভক্তকুল। স্টিভ ব্যানন এবং দক্ষিণপন্থী টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করেছেন, যেন তিনি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়েন।
ট্রাম্পের এক উপদেষ্টার ভাষায়, প্রেসিডেন্ট এখন এক বহুমুখী সমীকরণ সামলাচ্ছেন। যুদ্ধবাজদের বোঝাচ্ছেন সামরিক অভিযান চলছে, বাজারকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে, আর নিজের জনভিত্তিকে আশ্বস্ত করছেন যে সংঘাত সীমিত থাকবে। সংক্ষেপে, যে যা শুনলে সন্তুষ্ট হবেন— তাঁকে সেই কথাই বলা হচ্ছে।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্তব্য চাইলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, “এই খবরটি বেনামি সূত্রের গসিপ ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যারা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হওয়া কোনো আলোচনায় উপস্থিতই ছিলেন না।” তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেন।
যাদের নাম এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের অনেকেই রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেননি।