বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের সংবিধানে রাজ্যপালের পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক বলে বিবেচিত হলেও বাস্তব রাজনীতিতে বহুবার দেখা গেছে—এই পদটি রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন-পূর্ব বা নির্বাচন-পরবর্তী মুহূর্তে কিছু রাজ্যপাল এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা সরাসরি রাজ্যের সরকার গঠন, সরকার ভাঙা বা সাংবিধানিক সংকটের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আছে যেখানে রাজ্যপাল কার্যত ক্ষমতার খেলায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন।
১৯৮৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি এই বিতর্কের প্রথম বড় উদাহরণগুলির একটি। তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জনপ্রিয় নেতা এন.টি.রামা রাও। তিনি অসুস্থ অবস্থায় বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেলে রাজ্যপাল ঠাকুর রাম লালl আচমকা তাঁকে অপসারণ করে তাঁরই দলের নেতা নাদেন্দলা ভাস্কর রাওকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ করান। এই পদক্ষেপকে ব্যাপকভাবে “রাজভবনের অভ্যুত্থান” বলা হয়েছিল। জনরোষ এতটাই তীব্র হয় যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কেন্দ্র সরকার সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয় এবং এন. টি. রামা রাও আবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসেন। এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, রাজ্যপালের সাংবিধানিক ক্ষমতা রাজনৈতিকভাবে কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ২০০৫ সালের বিহার। তখন রাজ্যের রাজ্যপাল ছিলেন বুট্টা সিং। বিধানসভা নির্বাচনের পরে ফলাফল আসে এবং সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতিকে রিপোর্ট দেন যে ঘোড়া কেনাবেচা হতে পারে, এবং তাঁর সুপারিশে বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট এই সিদ্ধান্তকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে এবং বলে যে এটি সাংবিধানিক নীতির পরিপন্থী ছিল। এই ঘটনা রাজ্যপাল পদকে কেন্দ্রের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগকে আরও জোরালো করে।
২০১৮ সালে কর্ণাটকে আবার একবার রাজ্যপাল পদকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। তখন রাজ্যের রাজ্যপাল ভাজুভাই ভালা। বিধানসভা নির্বাচনের পরে একক বৃহত্তম দল হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান, যদিও বিরোধী দলগুলি সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি করেছিল। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। আদালতের নির্দেশে দ্রুত ফ্লোর টেস্ট হয় এবং সরকার বদলে যায়। এই ঘটনাও দেখায় যে রাজ্যপালের একটি আমন্ত্রণই রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে কত দ্রুত বদলে দিতে পারে।
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্রে যা ঘটেছিল তা আধুনিক ভারতের সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক পর্বগুলির একটি। রাজ্যপাল ভগত সিং কোশিয়ারি ভোরবেলায় আচমকা রাষ্ট্রপতি শাসন তুলে দিয়ে দেবেন্দ্র ফাডনবিশকে মুখ্যমন্ত্রী এবং অজিত পাওয়ারকে উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ করান। কয়েক দিনের মধ্যেই এই সরকার ভেঙে পড়ে এবং অন্য জোট ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এই ঘটনার মাধ্যমে আবার স্পষ্ট হয়—রাজ্যপালের সাংবিধানিক ক্ষমতা কখনও কখনও নাটকীয় রাজনৈতিক চালের কেন্দ্রে চলে আসে।
জম্মু ও কাশ্মীরেও রাজ্যপালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ২০১৮ সালে রাজ্যপাল সত্য পাল মালিক বিধানসভা ভেঙে দেন যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকার গঠনের দাবি জানাচ্ছিল। এর কিছুদিন পরেই কেন্দ্র সরকার রাজ্যের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে। সেই সময় রাজ্যপালই কার্যত প্রশাসনের প্রধান ছিলেন, কারণ নির্বাচিত সরকার ছিল না।
এই সব উদাহরণ দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—রাজ্যপাল পদটি কেবল আনুষ্ঠানিক নয়। বিশেষ করে যখন রাজ্যে ঝুলন্ত ফলাফল, রাজনৈতিক সংঘাত বা সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়, তখন রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
এই কারণেই নির্বাচন-পূর্ব সময়ে নতুন রাজ্যপাল নিয়োগকে অনেক রাজ্য সরকার সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের আশঙ্কা থাকে যে রাজভবন ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংকটের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ফলে এই পদটি যতই সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ হোক না কেন, ভারতের বাস্তব রাজনীতিতে এটি প্রায়ই ক্ষমতার সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী কেন্দ্র হয়ে ওঠে।