Home সংবাদ কেন এত বড় ঝুঁকি নিলেন ট্রাম্প?

কেন এত বড় ঝুঁকি নিলেন ট্রাম্প?

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের ঝুঁকি নিলেন—এই প্রশ্নটির উত্তর একমাত্রিক নয়। এটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক হিসাব, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ভূরাজনৈতিক কৌশল, এবং ব্যক্তিত্বগত রাজনৈতিক মানসিকতার একটি জটিল সমন্বয়। ঘটনাটিকে বুঝতে হলে অন্তত পাঁচটি স্তরে বিশ্লেষণ করতে হয়।

প্রথমত, ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাসে প্রায় সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই কোনও না কোনও বড় আন্তর্জাতিক সংকট বা যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার স্থাপন করতে চেয়েছেন। ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হ্যারি ট্রুম্যান – ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা, জর্জ ডব্লিউ বুশ – “War on Terror”—এই ধরনের বৃহৎ ঐতিহাসিক ঘটনাকে ঘিরেই নিজেদের যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক, মেরুকরণ এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাত দ্বারা চিহ্নিত। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের মতো দীর্ঘদিনের এক ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি আঘাত করা তার কাছে এক ধরনের ঐতিহাসিক সুযোগ বলে মনে হয়েছে। যদি ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা বা পরিবর্তন করা সম্ভব হয়, তাহলে তিনি নিজেকে সেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন যিনি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সীমাবদ্ধতা। প্রেসিডেন্টরা যখন ঘরোয়া নীতি প্রয়োগে রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়েন, তখন অনেক সময় তারা পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হন। কংগ্রেসে অল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা, আদালতের বিভিন্ন রায়, এবং প্রশাসনিক জটিলতা—এই সবকিছুই ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্র সংকুচিত করেছে। ফলে বিদেশনীতি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে প্রেসিডেন্ট তুলনামূলকভাবে দ্রুত এবং একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান প্রেসিডেন্টকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেয়।

তৃতীয়ত, ইজরায়েল -কেন্দ্রিক নিরাপত্তা কৌশল। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ বহুদিন ধরে মনে করে যে ইরান পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন মিত্রদের—বিশেষত ইজরায়েল, সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলির—জন্য প্রধান নিরাপত্তা হুমকি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হিজবুল্লাহ-সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন, এবং পারস্য উপসাগরে তার সামরিক উপস্থিতি—এসবই বহুদিন ধরে মার্কিন কৌশলবিদদের উদ্বেগের বিষয়। ট্রাম্প প্রশাসনের বহু উপদেষ্টা বিশ্বাস করেন যে ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করলে সমগ্র অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষে ঘুরে যেতে পারে। ফলে সামরিক আঘাতকে তারা একটি “প্রতিরোধমূলক” পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

চতুর্থত, শক্তির প্রদর্শন ও প্রতিরোধের মনস্তত্ত্ব। ট্রাম্পের রাজনৈতিক শৈলীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল হঠাৎ, দুঃসাহসিক এবং নাটকীয় পদক্ষেপ নেওয়া। তিনি প্রায়ই বিশ্বাস করেন যে অপ্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী আঘাত প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটিকে কখনও কখনও “madman theory”-এর একটি রূপ বলা হয়—অর্থাৎ এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করা যে নেতা যে কোনও মুহূর্তে বড় ঝুঁকি নিতে পারেন। এই কৌশল প্রতিপক্ষকে অনিশ্চয়তায় রাখে এবং কখনও কখনও আলোচনার টেবিলে সুবিধা এনে দেয়। ইরানে আকস্মিক ও ব্যাপক বিমান হামলা সেই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলেরই অংশ হতে পারে।

পঞ্চমত, আঞ্চলিক ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করার হিসাব। যদি ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে পশ্চিম এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে। সেই শূন্যতা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলির প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই হিসাব থেকে কিছু কৌশলবিদ মনে করেন যে ইরানকে দুর্বল করা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

তবে এই সিদ্ধান্তের মধ্যে বিপুল ঝুঁকিও রয়েছে। ইরান একটি বৃহৎ রাষ্ট্র, যার জনসংখ্যা ৮ কোটির বেশি এবং যার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তৃত। সরাসরি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও দেশটি সহজে স্থিতিশীল হবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। বরং গৃহযুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার, কিংবা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা—এই সবকিছুর সম্ভাবনাও সমানভাবে বিদ্যমান।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ একটি বহুস্তরীয় রাজনৈতিক জুয়া। এতে ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মার্কিন কৌশলগত হিসাব, আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতি এবং শক্তি প্রদর্শনের মনস্তত্ত্ব। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যুদ্ধ শুরু করা সহজ, তার শেষ কোথায় হবে তা অনুমান করা অনেক কঠিন।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles