Home সংবাদ অস্তিত্বের সংকটে গণমাধ‍্যম

অস্তিত্বের সংকটে গণমাধ‍্যম

0 comments 6 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: এক অদ্ভুত নীরবতার যুগ শুরু হয়েছে—এমন এক নীরবতা, যা স্বতঃস্ফূর্ত নয়, আরোপিত। সংবাদমাধ্যমের ওপর ক্রমশ নেমে আসছে দমনের দীর্ঘ ছায়া। গত এক দশকে পৃথিবীর নানা দেশে সাংবাদিকদের গ্রেফতার, কারাবন্দি করা কিংবা হয়রানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সরকারগুলো এখন আর শুধু তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না; তারা চায় তথ্যের প্রবাহকেই নিয়ন্ত্রণ করতে, সত্য বলার সাহসকেই শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করতে। এই প্রবণতা প্রথম দেখা গিয়েছিল খোলাখুলি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলিতে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে তথাকথিত “অধঃপতিত গণতন্ত্রে”—যেখানে নির্বাচন হয়, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা শাসকরা গণতন্ত্রের মৌলিক আত্মাকে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। আর আজ এই রোগ পৌঁছে গেছে সেই দেশগুলিতেও, যেগুলি একসময় নাগরিক স্বাধীনতার বাতিঘর বলে বিবেচিত হতো।

এই বৈশ্বিক প্রবণতার এক করুণ প্রতীক হয়ে উঠেছেন হংকংয়ের প্রবীণ গণতন্ত্রপন্থী নেতা ও সংবাদপত্র উদ্যোক্তা জিমি লাই। চীনের কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে হংকংয়ের স্বাধীনতার পক্ষে দীর্ঘদিন সরব থাকার অপরাধে তাকে সম্প্রতি ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সী লাই ইতিমধ্যেই পাঁচ বছর ধরে কারাগারের অন্ধকারে বন্দি। শারীরিকভাবে তিনি অসুস্থ, দুর্বল। এই দীর্ঘ সাজা কার্যত তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কারাগারে আটকে রাখার সমান। তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এই বিচারব্যবস্থায় সত্যের মূল্য খুব কম; এখানে শাস্তির উদ্দেশ্য অপরাধ প্রমাণ করা নয়, বরং উদাহরণ সৃষ্টি করা—যাতে অন্যরা ভয় পায়।

কিন্তু জিমি লাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নন। তিনি একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ মাত্র। সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে সারা বিশ্বে অন্তত ৩৩০ জন সাংবাদিক কারাগারে বন্দি ছিলেন। দশ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ২০০-এরও কম। অর্থাৎ মাত্র এক দশকের মধ্যে সাংবাদিকদের বন্দি হওয়ার হার বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। তাদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশেরও বেশি পাঁচ বছর বা তার বেশি মেয়াদের সাজা ভোগ করছেন। প্রায় অর্ধেক সাংবাদিক আবার কোনও আনুষ্ঠানিক দণ্ডাদেশ ছাড়াই বছরের পর বছর কারাগারে আটকে আছেন। তাদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের একজন জানিয়েছেন, কারাগারে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে—মারধর, মানসিক নিপীড়ন, এমনকি শারীরিক অত্যাচার। এর পাশাপাশি আরও ১২৯ জন সংবাদকর্মী তাদের কাজ করতে গিয়ে বা সেই কাজের কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৯২ সালে এই ধরনের হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর এই সংখ্যাই সর্বোচ্চ।

এই তালিকায় যে দেশগুলির নাম বারবার উঠে আসে, তাদের অনেকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে পরিচিত—চীন, রাশিয়া, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, তুরস্ক, মায়ানমার, সুদান। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কিছু দেশের নামও রয়েছে, যেগুলি নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে—যেমন ইজরায়েল। ফলে বিষয়টি আর কেবল স্বৈরতন্ত্র বনাম গণতন্ত্রের সরল বিভাজনে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং অনেক বেশি উদ্বেগজনক।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এই ক্রমবর্ধমান আক্রমণের পেছনে মূল কারণটি খুবই সহজ। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। তারা সেই প্রশ্নগুলো করেন, যেগুলোর উত্তর রাজনৈতিক নেতারা দিতে চান না। তারা সেই তথ্য প্রকাশ করেন, যেগুলো শাসকেরা জনতার কাছ থেকে গোপন রাখতে চান। ক্ষমতার অন্ধকার ঘরে আলো ফেলাই সাংবাদিকতার মৌলিক কাজ। আর সেই কারণেই স্বৈরশাসক বা আধা-স্বৈরশাসক সরকারগুলির কাছে সাংবাদিকরা হয়ে ওঠেন বিপজ্জনক।

ফলে তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ আনা হয়—রাষ্ট্রদ্রোহ, জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করা, বিদেশি শক্তির এজেন্ট হওয়া, কিংবা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যোগসাজশ। অভিযোগের ভাষা বদলায়, কিন্তু উদ্দেশ্য একটাই: সত্য বলাকে অপরাধে পরিণত করা।

শুধু গত ফেব্রুয়ারি মাসেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। কম্বোডিয়ায় দুই সাংবাদিক—ফিপ ফারা ও ফোন সোপহেপ—কে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের অপরাধ ছিল কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবিরোধ নিয়ে প্রতিবেদন করা। সরকার দাবি করেছে, তাদের রিপোর্ট নাকি জাতীয় নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই দেশে আরেক সাংবাদিক লুওত সোপহালকে অভিযুক্ত করা হয়েছে সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করার জন্য, কারণ তিনি সৈন্যদের পানীয় জলের সংকট নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন।

সেনেগালে সংবাদ বিশ্লেষক আবদু নগুয়েরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, কারণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের সময় এক ছাত্রের মৃত্যুর সরকারি ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আর ইথিওপিয়ায় সরকার ‘আডিস স্ট্যান্ডার্ড’ নামে একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছে—যে পত্রিকাটি তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য সুপরিচিত। শুধু তাই নয়, রয়টার্সের তিন সাংবাদিকের স্বীকৃতিও নবায়ন করতে অস্বীকার করা হয়েছে, কারণ তারা এমন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন যাতে বলা হয়েছিল ইথিওপিয়ায় নাকি গোপনে একটি প্রশিক্ষণ শিবির রয়েছে, যেখানে সুদানের এক বিতর্কিত আধাসামরিক গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তবে সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ কেবল এই দেশগুলিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তুলনামূলকভাবে মুক্ত সমাজেও গণমাধ্যম ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় প্রায় একশো প্যালেস্টিনি সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে—অনেক ক্ষেত্রেই কোনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই। একই সময়ে অন্তত দুইশোর কাছাকাছি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আধুনিক ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের মৃত্যু আগে দেখা যায়নি।

মেক্সিকোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি এমন সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে, যারা অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশ করেন। সত্য তথ্যকেও সেখানে প্রায়ই “ফেক নিউজ” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ভারতে এক আদালত সম্প্রতি সাংবাদিক রবি নায়ারকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে—কারণ তিনি সামাজিক মাধ্যমে এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এক ধনকুবের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর পরিচালিত একটি কোম্পানির সমালোচনা করা হয়েছিল।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই দেশেও রাজনৈতিক ক্ষমতা এখন সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে দ্বিধা করছে না। ট্রাম্প প্রশাসন একাধিকবার এমন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে, যারা সরকারের আনুষ্ঠানিক বয়ানকে প্রশ্ন করেছেন। পেন্টাগন কভার করা সাংবাদিকদের জন্য এমন নিয়ম জারি করা হয়েছে যাতে তারা কেবল সরকার অনুমোদিত তথ্যই প্রকাশ করতে পারেন। মিনেসোটায় অভিবাসনবিরোধী প্রতিবাদ কভার করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনকি একটি জাতীয় সংবাদপত্রের সাংবাদিকের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য গভীরভাবে বিপজ্জনক। কারণ সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ খুব দ্রুত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্র তৈরি করে। যখন কয়েকজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয় বা হয়রানি করা হয়, তখন অন্যরা স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সাহসী প্রতিবেদন কমে যায়, প্রশ্ন কমে যায়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আর তখনই ক্ষমতাসীনরা কার্যত তথ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যেখানে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নেই, সেখানে সরকারও দ্রুত দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে ওঠে। জনস্বার্থের বদলে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে আত্মস্বার্থের কারখানা। রাষ্ট্র তখন নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করার বদলে শাসক শ্রেণির সম্পদ বৃদ্ধির যন্ত্রে পরিণত হয়।

এই কারণেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের অধিকার নয়; এটি নাগরিক স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি। সাংবাদিকরা যখন সত্য প্রকাশ করেন, তখন তারা কেবল একটি গল্প বলেন না—তারা নাগরিকদের চোখ খুলে দেন। আর সেই কারণেই তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ আসলে জনগণের জানার অধিকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টি ও সচেতনতা। স্বৈরাচারী শাসকেরা সাংবাদিকদের স্তব্ধ করে দিতে চান যাতে পৃথিবী তাদের কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করে। নীরবতা তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তাই এই নীরবতা ভাঙা জরুরি।

জিমি লাই, ফিপ ফারা, ফোন সোপহেপ, লুওত সোপহাল, আবদু নগুয়ের—এরা প্রত্যেকে সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের সৈনিক, যারা সত্যের জন্য নিজের স্বাধীনতাকেও বাজি রাখতে প্রস্তুত। পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষদের দায়িত্ব হল তাদের পাশে দাঁড়ানো। কারণ শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে সত্যকে রক্ষা করা—আর সত্যের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles