খবর

সব দলের সঙ্গে সখ্য, ক্ষমতাবানদেরও প্রশ্ন: মহারাষ্ট্রের জনজীবনে অন্য ভূমিকায় নানা পাটেকর

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পর্দায় অভিনয়ের জন্য বিপুল প্রশংসা পেয়েছেন নানা পাটেকর।
  • তবে মহারাষ্ট্রের জনজীবনে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর একটি স্বতন্ত্র জায়গা রয়েছে।
  • সিনেমার বাইরেও তিনি পরিচিত তাঁর ব্যাপক সমাজসেবামূলক কাজের জন্য।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পর্দায় অভিনয়ের জন্য বিপুল প্রশংসা পেয়েছেন নানা পাটেকর। তবে মহারাষ্ট্রের জনজীবনে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর একটি স্বতন্ত্র জায়গা রয়েছে। সিনেমার বাইরেও তিনি পরিচিত তাঁর ব্যাপক সমাজসেবামূলক কাজের জন্য। বিশেষ করে খরাপীড়িত কৃষক পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক ছিল।
কয়েক দশক ধরে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সেই সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন পাটেকর। মুম্বইয়ের বাড়িতে এবং পরে পুণের কাছে তাঁর খামারবাড়িতে গণেশ উৎসবের আয়োজনে মহারাষ্ট্রের পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের আমন্ত্রণ জানাতেন তিনি। কিন্তু নিজের মনের কথা অকপটে বলা এবং ক্ষমতাবানদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলার অভ্যাস তাঁকে বিতর্কেও জড়িয়েছে। এমনকি ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকেও সমালোচনা শুনতে হয়েছে।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা–বিজেপি জোট ক্ষমতায় ছিল। শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বালাসাহেব ঠাকরের প্রভাব তখন তুঙ্গে। সেই সময় মরাঠি সাহিত্যিকদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করায় প্রকাশ্যেই বালাসাহেবের সমালোচনা করেছিলেন পাটেকর। তিনি বলেছিলেন, “বালাসাহেব, আমাদের হৃদয়ে আপনার একটি ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। সেই ভাবমূর্তি নষ্ট করার অধিকার এমনকি আপনারও নেই।”
অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু বালাসাহেব সমালোচনাটি সহজভাবেই নিয়েছিলেন। ২০১২ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত দু’জনের বন্ধুত্ব অটুট ছিল।
বালাসাহেব ঠাকরে এবং সাংবাদিক নিখিল ওয়াগলের মধ্যে বিরোধ মেটানোরও চেষ্টা করেছিলেন পাটেকর। শিবসেনা নেতৃত্বের সমালোচনা করায় দলের কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন ওয়াগলে।
এক সাক্ষাৎকারে পাটেকর জানিয়েছিলেন, বালাসাহেবের মৃত্যুর পরে তিনি ঠাকরে পরিবারের বাসভবন ‘মাতোশ্রী’তে যাওয়া বন্ধ করে দেন। তাঁর কথায়, “বালাসাহেব ঠাকরে বেঁচে থাকতে যখনই ইচ্ছা হত, আমাকে ফোন করতেন। আমরা ফোনে কথা বলতাম। কখনও দেখা করার জন্য মাতোশ্রীতে যেতে বলতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে মাতোশ্রী থেকে ফোন আসা বন্ধ হয়ে গেল। ওই বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্কও শেষ হয়ে গেল।”
রাজনীতির বাইরেও বাবা আমটের আনন্দবন প্রকল্পের দীর্ঘদিনের সমর্থক ছিলেন পাটেকর। গড়চিরোলির আদিবাসী এলাকায় হাসপাতাল, স্কুল ও অনাথ আশ্রম পরিচালনা করেন প্রকাশ আমটে। তাঁকে নিয়ে তৈরি একটি প্রশংসিত জীবনীচিত্রে প্রকাশের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নানা।
২০১৫ সালে মরাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে মিলে ‘নাম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন পাটেকর। সংকটে জর্জরিত কৃষকদের সাহায্য করা এবং রাজ্যের ‘জলযুক্ত শিবার’ প্রকল্পের মাধ্যমে জল সংরক্ষণের কাজে সহায়তা করাই ছিল এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
২০১৭ সালে মুম্বইয়ের হকারদের পক্ষেও সরব হয়েছিলেন তিনি। রাজ ঠাকরের নেতৃত্বাধীন মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা বা এমএনএস তখন হকারদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আন্দোলন চালাচ্ছিল। সেই পরিস্থিতিতে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলার লোক খুব বেশি ছিল না।
আন্দোলন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পাটেকর বলেছিলেন, “হকাররা হয়তো রাস্তা ও ফুটপাথ দখল করেছেন। কিন্তু পুরসভা এত বছর ধরে তাঁদের তা করতে দিল কেন? ব্যবসা করার জন্য তাঁদের নির্দিষ্ট জায়গা দেওয়া হল না কেন? আমার মনে হয়, জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করার অধিকার সকলের রয়েছে।”
তাঁর এই স্পষ্ট বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হন রাজ ঠাকরে। দলের একটি অনুষ্ঠানে পাটেকরকে বিদ্রুপ করে তিনি বলেন, “বেআইনি হকারদের বিষয়ে মহাত্মা নানা পাটেকর কিছু বলেছেন। তিনি ভাল অভিনেতা, সে জন্য আমরা তাঁকে সম্মান করি। কিন্তু যে বিষয় তিনি বোঝেন না, তা নিয়ে তাঁর কথা বলা উচিত নয়। তিনি সব রাজনৈতিক নেতার প্রশংসা করেন এবং নানা বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ মরাঠি ছবি যখন প্রাইম টাইমে সিনেমা হল পাচ্ছিল না, তখন এই পাটেকর কখনও সরব হননি। দক্ষিণের অভিনেতাদের দেখুন। তাঁরা নিজেদের রাজ্য এবং আঞ্চলিক গৌরবের পক্ষে কথা বলেন।”
তবে এক অভিনেত্রী পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তোলার পরে তাঁর সমর্থনেও এগিয়ে এসেছিলেন এমএনএস প্রধান। রাজ বলেছিলেন, “নানা পাটেকর অনেক সময় উল্টোপাল্টা কথা বলেন। কিন্তু এ রকম কিছু তিনি করবেন না।”
২০২২ সালে একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে এবং উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশকে অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন পাটেকর। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন, তাঁদের সামনেই সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি।
পাটেকর বলেছিলেন, “মহারাষ্ট্রের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত ওয়াই বি চহ্বাণের মৃত্যুর সময় তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাত্র ২৫ হাজার টাকা ছিল। এখন তো একজন পুরপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হওয়ার বছরখানেকের মধ্যে কোটি কোটি টাকা আয় করেন। আমরা সকলেই এ কথা জানি। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন?”
আবার ২০২৫ সালের মে মাসে শিন্ডেকে নিষ্কলঙ্ক নেতা বলে বর্ণনা করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন পাটেকর। তিনি বলেছিলেন, “আমি তাঁকে কয়েক দশক ধরে চিনি। তাঁর গায়ে একটিও কলঙ্কের দাগ নেই।”
এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হন উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার নেতারা। ঠাকরে শিবিরের নেতারা বলেন, “যে শিন্ডে বালাসাহেব ঠাকরের শিবসেনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, ঠাকরে পরিবারের কাছ থেকে দল এবং প্রতীক কেড়ে নিয়েছেন, তাঁকে নানা পাটেকর কী করে চরিত্রের শংসাপত্র দিতে পারেন?”

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles