মার্বেলেই চাপ

যা জানা জরুরি
- ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে পার্থেননের মার্বেল ভাস্কর্যগুলি ফিরিয়ে আনার দাবিতে ব্রিটেনের উপর চাপ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিলেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস।
- ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে অ্যান্ডি বার্নহাম এই ভাস্কর্যগুলি ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছিলেন—সাক্ষাতের সময় তাঁকে সেই পুরনো অবস্থানের কথাই মনে করিয়ে দিতে চান…
- এথেন্সে এক সম্মেলনে মিৎসোতাকিস জানান, বার্নহামের সঙ্গে দেখা হলে পার্থেননের ভাস্কর্য ফেরানোর দাবি তিনি “অত্যন্ত জোরের সঙ্গে” তুলবেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে পার্থেননের মার্বেল ভাস্কর্যগুলি ফিরিয়ে আনার দাবিতে ব্রিটেনের উপর চাপ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিলেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে অ্যান্ডি বার্নহাম এই ভাস্কর্যগুলি ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছিলেন—সাক্ষাতের সময় তাঁকে সেই পুরনো অবস্থানের কথাই মনে করিয়ে দিতে চান মিৎসোতাকিস।
এথেন্সে এক সম্মেলনে মিৎসোতাকিস জানান, বার্নহামের সঙ্গে দেখা হলে পার্থেননের ভাস্কর্য ফেরানোর দাবি তিনি “অত্যন্ত জোরের সঙ্গে” তুলবেন। তাঁর কথায়, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের চেয়ারম্যান জর্জ অসবর্নের তত্ত্বাবধানে চলা আলোচনা থেকে এখনও কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তৈরি এই মার্বেল ভাস্কর্যগুলি গ্রিসে ফেরানোর বিনিময়ে ব্রিটেনে বিপুল সংখ্যক অন্য গ্রিক প্রত্নসম্পদ পাঠানোর একটি ‘মিশ্র’ সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে লন্ডনের সঙ্গে আলোচনা কত দূর এগিয়েছে, জানতে চাওয়া হয়েছিল মিৎসোতাকিসের কাছে। উত্তরে তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, আলোচনায় অগ্রগতি হয়নি।”
এর পরেই তাঁর বার্তা আরও কড়া হয়। গ্রিক প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে আমাদের দাবির তীব্রতা বাড়াব। শুধু ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছে নয়, ব্রিটিশ সরকারের কাছেও।”
একই সঙ্গে বার্নহামের পুরনো অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মিৎসোতাকিস বলেন, “ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার আগে দ্ব্যর্থহীন ভাবে পার্থেননের ভাস্কর্যগুলি ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন।”
পার্থেনন মন্দিরের বিশাল ভাস্কর্যপট্ট সাজানোর জন্য তৈরি হয়েছিল এই শিল্পকর্মগুলি। অটোমান সাম্রাজ্যে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত লর্ড এলগিনের নির্দেশে সেগুলি সরিয়ে নেওয়ার পর দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভাস্কর্যগুলি এথেন্স ও লন্ডনে ভাগ হয়ে রয়েছে। ১৮১৬ সাল থেকে প্রায় ১৬০ মিটার দীর্ঘ ভাস্কর্যপট্টের একটি বড় অংশ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে।
মিৎসোতাকিস এবার বিষয়টিকে শুধু গ্রিস-ব্রিটেনের দ্বিপাক্ষিক বিরোধ হিসেবে দেখতেও নারাজ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বিষয়ে বার্নহামের আগ্রহের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পার্থেননের ভাস্কর্য নিয়েও বৃহত্তর ইউরোপীয় আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
তাঁর কথায়, “ব্রিটেনকে ইউরোপীয় পরিবার ছেড়ে চলে যেতে দেখে আমাদের যাঁদের দুঃখ হয়েছিল, তাঁরা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে শুনেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “পার্থেননের ভাস্কর্যগুলিও এই আলোচনার অংশ হবে। এটি শুধু গ্রিসের বিষয় নয়। এটি ইউরোপের বিষয়।”
বার্নহামের অবস্থান বদলে এথেন্সের হতাশা প্রকাশ্যে আসার মধ্যেই মিৎসোতাকিসের এই কড়া মন্তব্য সামনে এল। গ্রিক আধিকারিকদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বার্নহাম প্রকাশ্যে আগের অবস্থান থেকে সরে গিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিককার একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পার্থেননের ভাস্কর্য নিয়ে বিরোধের মীমাংসা “ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিষয়”।
অথচ প্রায় ২৫ বছর ধরে এই ভাস্কর্যগুলি গ্রিসে ফেরানোর দাবির সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বার্নহাম। ২০২৩ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালীন সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, “কোনও শর্ত ছাড়াই ওগুলি ফিরিয়ে দিন।” একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি বদলাতে সংস্কৃতিকে কাজে লাগানো উচিত।
তাই বার্নহামের প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে দীর্ঘদিনের এই বিরোধ মেটানোর বড় সুযোগ হিসেবেই দেখেছিল এথেন্স। গ্রিক সরকারকে দীর্ঘদিন আইনি পরামর্শ দিয়ে আসা এক ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞের মতে, তাঁর অবস্থানবদল “প্রবল হতাশার” জন্ম দিয়েছে এবং এতে ব্রিটেনের পুরনো ‘বিশ্বাসঘাতক’ ভাবমূর্তিও ফের সামনে এসেছে।
তবে মিৎসোতাকিস এখনও সমঝোতার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছেন না। বরং এমন একটি সাংস্কৃতিক চুক্তির প্রস্তাব সামনে রাখছেন, যাতে দুই পক্ষই লাভবান হতে পারে।
এথেন্সের ন্যাশনাল আর্কিয়োলজিক্যাল মিউজিয়াম শীঘ্রই সংস্কারের জন্য বন্ধ হওয়ার কথা। সেই সুযোগে আগে কখনও গ্রিসের বাইরে প্রদর্শিত হয়নি—এমন অমূল্য প্রত্নসম্পদ ব্রিটেনে পাঠানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিনিময়ে পার্থেননের ভাস্কর্যগুলি এথেন্সে ফেরানো হতে পারে।
মিৎসোতাকিসের মতে, এভাবে এথেন্সে পার্থেননের ভাস্কর্যগুলি আবার একত্রিত হলে গ্রিস ও ব্রিটেনের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রিস ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের মধ্যে, এক নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক অংশীদারিও গড়ে উঠতে পারে।
তাঁর কথায়, “ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলে আমি অবশ্যই অত্যন্ত জোরের সঙ্গে এই দাবি জানাব। আমার মনে হয়, সময় এসে গিয়েছে।”
ব্রিটিশ জনমতও ধীরে ধীরে ভাস্কর্যগুলি ফেরানোর পক্ষে ঝুঁকছে বলে দাবি করেছেন গ্রিক প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বার্তা স্পষ্ট—দুই শতাব্দীর পুরনো মার্বেল-দ্বন্দ্ব এবার আর চুপচাপ ছাড়ার ইচ্ছে নেই এথেন্সের।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



