প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরের দিকে যাত্রা করেছিলেন ইন্ডিয়া জোটের সাংসদেরা। কিন্তু মঙ্গলবার তাঁদের মিছিল আটকে দেয় দিল্লি পুলিশ। প্রতিবাদে রাস্তাতেই বসে পড়েন বিরোধী নেতারা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো। টাইম টু রিজাইন।’ অর্থাৎ, জ্ঞানেশ, এবার আপনার সময় শেষ, পদত্যাগ করুন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এই বিক্ষোভ।

মিছিলের আগেই সংসদ ভবন এবং নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর নির্বচন সদনের আশপাশে বিপুল নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বসানো হয় ব্যারিকেড। সাংসদেরা পৌঁছনোর অনেক আগে থেকেই এলাকায় অবস্থান নেন নিরাপত্তাকর্মীরা। সংসদের মকর দ্বারে জমায়েত হয়ে বিরোধীরা কমিশনের উদ্দেশে রওনা দেন। পার্লামেন্ট স্ট্রিটে নীতি আয়োগের দফতরের সামনে তাঁদের আটকানো হয়। নীতি আয়োগ ও আকাশবাণী ভবনের মধ্যবর্তী ওই পথ দিয়েই কমিশনের দফতরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের।

মিছিলে রাহুলের সঙ্গে ছিলেন রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা, তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েন, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব এবং সিপিএমের জন ব্রিটাস। প্রতিবাদকারীদের হাতে ছিল আরএসএসের পোশাকে জ্ঞানেশ কুমারকে দেখানো কাটআউট। ভোট চুরি বন্ধ করা এবং গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে স্লোগান ওঠে।

নিরাপত্তার এমন আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শিবসেনা উদ্ধব শিবিরের সাংসদ সঞ্জয় রাউত। তাঁর বক্তব্য, সাংসদেরা দেশের নাগরিকও; তাঁরা নিরস্ত্র অবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে হেঁটে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁদের আটকাতে এত বাহিনীর প্রয়োজন কেন? কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব বিজেপি নেতারা কেন দিচ্ছেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। বিরোধীদের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে ইভিএমের বদলে ব্যালট পেপারে নির্বাচন এবং বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের নাম ফেরানো।

বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক পটভূমিতে রয়েছে ভোটার হিসেবে নাম তোলার আবেদনপত্র ফর্ম ৬ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের পর্যবেক্ষণ। আদালত জানিয়েছে, ফর্মটির কোনও পরিবর্তিত সংস্করণ তারা অনুমোদন করেনি। পরিবর্তন করা হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে কে অনুমোদন দিয়েছেন, তা জানতে কমিশনের নথি পরীক্ষা করবে আদালত। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত আবেদনের শুনানিতে এই মন্তব্য আসে। বিরোধীরা এই পর্যবেক্ষণকে সামনে রেখে পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো করেছেন।

কমিশন অবশ্য ২৬ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে জানিয়েছিল, এসআইআরের জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্র সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন পেয়েছে। এসআইআরের বাইরে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিতে নির্ধারিত ফর্ম ব্যবহারের কথাও জানিয়েছিল তারা। কমিশনের অন্দরে বিভেদের খবর প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন সংস্থাটির দাবি, এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।

এদিন বিক্ষোভ চলাকালীন রাহুল পুলিশের ব্যারিকেডে উঠে জাতীয় পতাকা নাড়েন। পরে রাহুল, প্রিয়াঙ্কা এবং কংগ্রেস সাংসদ দীপেন্দ্র হুডা আকাশবাণী ভবনের চত্বরে ঢুকে অবস্থান শুরু করেন। পুলিশ তাঁদের সরে যেতে বললেও তাঁরা কমিশনের সঙ্গে দেখা করার দাবিতে অনড় থাকেন। ডেরেক ও’ব্রায়েন ও মহুয়া মৈত্রও সেখানে পৌঁছন। রাহুল জানান, যতক্ষণ প্রয়োজন তাঁরা বসে থাকতে প্রস্তুত। কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন বিরোধীরা।

সাক্ষাতের দাবি নিয়ে অবশ্য দু’পক্ষের বক্তব্যে ফারাক রয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কোনও রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেই সাক্ষাতের অনুরোধ পায়নি তারা। বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ জানাতেই তাঁরা কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। সন্ধ্যায় প্রায় নয় ঘণ্টার অবস্থানের পর পুলিশ রাহুল, প্রিয়াঙ্কা ও অন্য বিরোধী নেতাদের আটক করে বিক্ষোভ সরিয়ে দেয়। এসআইআর প্রত্যাহার এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিকে ঘিরে এদিনের কর্মসূচি শেষ হয় দীর্ঘ পুলিশি বাধা, অবস্থান ও আটকের মধ্য দিয়ে।