বরফে ধরা মহাবিশ্ব

যা জানা জরুরি
- দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিশাল এক পর্যবেক্ষণযন্ত্র দিয়ে মহাবিশ্বের রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছিলেন তিনি।
- সেই যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতিতে ২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেলেন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন।
- মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁর নাম ঘোষণা করে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিশাল এক পর্যবেক্ষণযন্ত্র দিয়ে মহাবিশ্বের রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছিলেন তিনি। সেই যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতিতে ২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেলেন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন। মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁর নাম ঘোষণা করে। আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি গড়ে তোলা এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর নির্ণায়ক ভূমিকার জন্য এই সম্মান।
বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া হ্যালজেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ১৯৪৪ সালে জন্ম তাঁর। ১৯৬৯ সালে লুভেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। এবারের নোবেল তিনি একাই পাচ্ছেন। পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি কুড়ি লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা। তবে এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে বহু দেশের বিজ্ঞানী, গবেষক ও প্রকৌশলীদের দীর্ঘদিনের যৌথ পরিশ্রম।
পদার্থবিদ্যার নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্সের মতে, হ্যালজেনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক গবেষক ও প্রকৌশলীদের দল এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছে, যা বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তাঁর অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি নিউট্রিনোকে ব্যবহার করে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের নতুন পথ তৈরি করেছে।
কিন্তু নিউট্রিনো নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
নিউট্রিনো অতি ক্ষুদ্র, প্রায় ভরহীন কণা। প্রতি মুহূর্তে অগণিত নিউট্রিনো আমাদের শরীর এবং গোটা পৃথিবীর ভিতর দিয়ে চলে যায়। সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এদের মিথস্ক্রিয়া এতই দুর্বল যে আমরা তা টেরও পাই না। অথচ মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কিছু ঘটনা থেকে বেরিয়ে আসা নিউট্রিনো সেই ঘটনাগুলির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। সেই তথ্য ধরতে পারলে বহু দূরের মহাজাগতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা সম্ভব।
এই ভাবনাই হ্যালজেনকে দক্ষিণ মেরুর বরফের দিকে নিয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে তিনি এই পদ্ধতির ধারণা সামনে আনেন। দীর্ঘ গবেষণা ও প্রকৌশলগত প্রস্তুতির পর অ্যান্টার্কটিকার প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে তৈরি হয় আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। বরফের গভীরে বসানো হয় ৫,১৬০টি আলোকসংবেদী যন্ত্র। এত বিশাল এলাকা প্রয়োজন, কারণ মহাজাগতিক উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার মতো সংঘর্ষ অত্যন্ত বিরল।
কাজটা কী ভাবে হয়?
কোনও নিউট্রিনো বরফের পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খেলে কখনও কখনও তৈরি হয় দ্রুতগতির আধানযুক্ত কণা। সেই কণা বরফের ভিতর দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি করে। বরফের গভীরে থাকা সংবেদী যন্ত্রগুলি সেই আলো ধরে ফেলে। আলো কোথায়, কখন এবং কী ভাবে তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নিউট্রিনোর শক্তি ও তার আগমনের দিক সম্পর্কে ধারণা পান।
অর্থাৎ, অ্যান্টার্কটিকার বরফ এখানে শুধু যন্ত্র বসানোর জায়গা নয়—বরং গোটা শনাক্তকরণ ব্যবস্থারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০১৩ সালে আইসকিউবের গবেষকেরা মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার ঐতিহাসিক ফল প্রকাশ করেন। এরপর আরও বড় সাফল্য আসে। ২০১৭ সালে শনাক্ত হওয়া একটি নিউট্রিনোর সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দূরবীক্ষণযন্ত্র একই মহাজাগতিক উৎসের দিকে নজর দেয়। ২০১৮ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দূরের একটি সক্রিয় ছায়াপথের সঙ্গে ওই নিউট্রিনোর সম্ভাব্য যোগসূত্রের প্রমাণ সামনে আসে। একই মহাজাগতিক ঘটনাকে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র দিয়ে দেখার এই পদ্ধতি মহাবিশ্ব গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
বর্তমানে আইসকিউবের আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ১৪টি দেশের ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫০ জন পদার্থবিদ যুক্ত। প্রকল্পটির প্রধান অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন। পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়। অংশগ্রহণকারী দেশগুলির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও গবেষণায় সহায়তা করছে।
তাই হ্যালজেনের নোবেল শুধু একজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। বরং কয়েক দশকের গবেষণা, প্রকৌশল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তৈরি একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার স্বীকৃতি।
এই গবেষণার গুরুত্বও সেখানেই। আলো বা অন্য ধরনের বিকিরণ দিয়ে যেসব মহাজাগতিক ঘটনার সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া কঠিন, নিউট্রিনো সেখান থেকে অন্যরকম তথ্য এনে দিতে পারে। নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, কৃষ্ণগহ্বরের আশপাশের প্রবল শক্তির কর্মকাণ্ড কিংবা মহাজাগতিক কণার উৎস—সবই বোঝার ক্ষেত্রে এই কণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিউট্রিনোর নিজস্ব ধর্ম এবং অদৃশ্য পদার্থের সন্ধানেও আইসকিউবের তথ্য কাজে লাগছে।
দক্ষিণ মেরুর নিস্তব্ধ বরফ তাই আর শুধু বরফ নয়। তার গভীর থেকে ধরা পড়ছে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের মহাবিশ্বের বার্তা। হ্যালজেনের নোবেল সেই বার্তা শোনার নতুন জানালারই স্বীকৃতি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



