Sports

শুধু দল নয়, ইংল্যান্ডের আত্মপরিচয়ও গড়তে হচ্ছে টুখেলকে

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • এখনও পর্যন্ত সপ্তাহটা বেশ ভালোই কাটছে টমাস টুখেলের।
  • শুধু একটা ইংল্যান্ড দল জোড়া লাগানো নয়, সেই দলকে দেখে যাতে সত্যিই একটা দল বলে মনে হয়, সেই চেহারাটাও তৈরি করতে হচ্ছে তাঁকে।
  • আর সেই কাজ করতে করতেই ইংল্যান্ডের ম্যানেজার হওয়ার সুবাদে বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা পরস্পরবিরোধী দাবিদাওয়ার ঝাপটা সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

দ্রুত এগোও, গলদগুলো সারাও। এখনও পর্যন্ত সপ্তাহটা বেশ ভালোই কাটছে টমাস টুখেলের। শুধু একটা ইংল্যান্ড দল জোড়া লাগানো নয়, সেই দলকে দেখে যাতে সত্যিই একটা দল বলে মনে হয়, সেই চেহারাটাও তৈরি করতে হচ্ছে তাঁকে। এ এমন এক কাজ, যা ঘুরেফিরে বারবার করতে হয়। আর সেই কাজ করতে করতেই ইংল্যান্ডের ম্যানেজার হওয়ার সুবাদে বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা পরস্পরবিরোধী দাবিদাওয়ার ঝাপটা সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।

এর মধ্যে নতুন কিছু নেই। এই চাকরিতে শুধু সঠিক ফুটবলার বেছে নিলেই চলে না, কিংবা দ্বিতীয়ার্ধে কাকে নামাবেন, তা নিয়ে মহার্ঘ সব হিসাব কষলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এই প্রাথমিক কাজগুলো করতে হয় এমন অবস্থায়, যেন আপনি ‘টেম্পল অব ডুম’-এর বাইরে ভেঙে পড়তে থাকা একটি দড়ির সেতুর উপর দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্ত ঠগি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছেন, আর একই সঙ্গে কেউ আপনার হৃৎপিণ্ডটাও উপড়ে নিচ্ছে।

আর কোনও দেশ ঠিক এভাবে একসঙ্গে দু’রকম দাবি চাপিয়ে দেয় না। ম্যাচ সামলাও। হ্যাঁ, সেটা তো করবেই। কিন্তু পাশাপাশি আমাদের এটাও বলে দাও, আমরা কারা, আর আমাদের কীভাবে খেলা উচিত। এই কারণেই এই চাকরি নিজের পাওনা এক পাউন্ড মাংস কিমা করে আদায় করবেই। এই কারণেই শেষ পর্যন্ত মানুষগুলো নিঃশেষ হয়ে যান, ভিতরটা ফাঁপা হয়ে যায়। পড়ে থাকে একটি শূন্য ট্র্যাকস্যুট, যা ওয়েম্বলির শৌচাগারে দাঁড়িয়ে পদত্যাগ করছে। কিংবা নিসে দাঁড়ানো রয় হজসন—দেখতে যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া এক রক্তচোষা, বলছেন, ‘আমি জানি না, আমি এখানে কেন।’

সেই কারণেই রিয়েকায় টুখেলকে তাঁর চেনা প্রাণশক্তিতে ভরপুর দেখে ভালো লাগছিল। সেই অনুতপ্ত সন্ন্যাসীর মতো কালো জুতো আর কালো ট্রাউজার্স পরে টাচলাইনের ধারে এখনও পাক খেয়ে চলেছেন তিনি। বরাবরের মতোই তাঁকে দেখাচ্ছে দুর্ভিক্ষে কাহিল কোনও আর্লের মতো, যিনি শিকারি কুকুরগুলোকে একটু হাঁটাতে বেরিয়েছেন, আর একই সঙ্গে নিজের শিকারের কুটিরে বসে এনিগমার সাংকেতিক ভাষার রহস্যও ভেদ করছেন।

টুখেলের চাকরি এখন নিরাপদ—এ কথা বলাটাই হাস্যকর মনে হয়। অন্তত এই কারণে যে, তাঁর চাকরি নিরাপদ না-ও থাকতে পারে, এমন ধারণাটাই ভয়ানক বাড়াবাড়ি। বাস্তবে টুখেল কখনওই তেমন বিপদে ছিলেন না। কিন্তু এই পদের প্রকৃতিই এমন যে, বিদেশের মাটিতে দেশের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ অভিযান এবং তার প্রায় পরমুহূর্তেই চাকরি থেকে ছুড়ে ফেলা—এই অবিশ্বাস্য যুগল কীর্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি পরাজয়।

অবশ্যই, শক্তি খর্ব হওয়া প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেশনস লিগে দুটো জয়কে যথাযথ মাপেই বিচার করা দরকার। ক্রোয়েশিয়াকে ৭–০ গোলে স্টিমরোলার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ম্যাচটা গোড়া থেকেই ছিল অদ্ভুত। দরজা খোলার মুহূর্ত থেকে গোটা আয়োজনটাকে মনে হচ্ছিল কোনও যুবক্লাব সমিতির বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যেখানে শেষে সবাই একটা করে পদক পাবে, আর শিক্ষকেরা দল বেঁধে ডিস্কো নাচ দেখাবেন।

ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলারদের মধ্যেও যেন সেই আবহ ছড়িয়ে পড়েছিল। গা গরম করার সময়েই তাঁরা দিব্যি হাসিঠাট্টায় মেতে ছিলেন। খুদে উগ্র সমর্থকদের দল চড়া গলায় তাঁদের উৎসাহ দিচ্ছিল, আর কান ঝালাপালা করে দেওয়া লাউডস্পিকারে বাজছিল ‘উই ডিডন্‌ট স্টার্ট দ্য ফায়ার’-এর ক্রোয়েশীয় সংস্করণ।

প্রথম মিনিট থেকেই ক্রোয়েশিয়াকে দেখে মনে হচ্ছিল, একদল ফুটবলার বুঝি ভেষজ ঘুমের ওষুধের ঘোর কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। লুকা মদ্রিচের পায়ে বল পড়লেই যে ধরনের চিৎকার উঠছিল, তা সাধারণত দেখা যায় অ্যাপল স্টোরের উদ্বোধনে কোনও কোরীয় বয়ব্যান্ড হাজির হলে। কিন্তু এই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলারকে ইংল্যান্ডের তরুণ, ক্ষুধার্ত মাঝমাঠ স্রেফ পিষে দিয়ে গেল।

তবে খেলতে তো এই দলগুলোর বিরুদ্ধেই হয়। বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া যথেষ্ট ভালোই খেলেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, টুখেল-যুগের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এই জয় এল। সামনের কুড়ি মাসই আসল সময়—এই পর্বটাই সমস্ত কাজের চালিকাশক্তি, এখানেই টুখেল ঠিক করে নিতে পারবেন তাঁর দল কতটা ভালো হয়ে উঠতে পারে। সামনে এমন একটি টুর্নামেন্ট, যা জেতার এর চেয়ে ভালো সুযোগ ইংল্যান্ড আর কখনও পাবে না।

এই মুহূর্তে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মাত্র দুটো। দলটা কেমন হবে এবং কীভাবে খেলবে, তার কি একটি স্পষ্ট ভাবনা আছে? আর আমরা কি এগোচ্ছি? দুটো প্রশ্নেরই উত্তর—হ্যাঁ।

ক্রোয়েশিয়ায় ইংল্যান্ডের ভালো খেলার ধরনটা ছিল আকর্ষণীয়। এমন ইংল্যান্ড দল দেখতে আমরা অভ্যস্ত, যাকে শক্তিশালী মনে হয়, কিন্তু যার মধ্যে খুঁতও থাকে। রিয়েকায় তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা একটি দল সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরও উন্নতি করেছে। প্রতিটি জায়গায় তারা শক্তিশালী—শারীরিক সামর্থ্যে, ফুটবল দক্ষতায় এবং দলের মৌলিক ভারসাম্যে।

এই পর্বে ইংল্যান্ডকে দেখে কখনও কখনও ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের গ্যারেথ সাউথগেটের দলের কথা মনে পড়েছে। তখন বিকশিত হতে থাকা একটি পরিবেশে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নতুন ফুটবলার এসে ঢুকেছিলেন, আর হঠাৎই তাঁরা মাঝারি শক্তির প্রতিপক্ষদের উড়িয়ে দিতে শুরু করেছিলেন। কোভিডের বিরতি এসে সেই অগ্রগতির পথ জটিল করে দেয়। প্রমাণ করার উপায় নেই, তবু একটি ‘যদি’ ভাবা যায়: সাউথগেটের প্রথম ইউরো যদি এক বছর আগে হত, ইংল্যান্ডের হয়তো সেই ছন্দ থাকত, যার জোরে ফাইনালে ইতালিকে হারিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল।

এবার টুখেলের ইংল্যান্ডের দুটো দিক আছে। প্রথমটি হল সাম্প্রতিক অতীতের ভুলগুলো নিয়ে হিসাবনিকাশ। কেন, কেন তিনি কোল পামারকে নিয়ে গেলেন না? আচ্ছা, হয়তো সেই একই কারণে, যে কারণে পামার এখনও এখানে নেই। তা হলে ফিল ফোডেনকে কেন, কেন নিয়ে গেলেন না? এই প্রশ্নের উত্তরও এখন নিজে থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। বিকল্প স্ট্রাইকার হিসেবে যাঁকে দলে নেওয়া হয়নি, আর যিনি এখন দেখা যাচ্ছে সৌদি আরবে খেলছেন, তাঁর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই সমস্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এখনও দ্বিমত পোষণ করা পুরোপুরি সংগত। কিন্তু এখন অন্তত আরও স্পষ্ট মনে হচ্ছে, সিদ্ধান্তগুলোর পিছনে যুক্তি ছিল, ভাবনাচিন্তা ছিল।

অতীত নিজের মামলা নিজেই আবার লড়ুক। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল এগিয়ে চলার অনুভূতি। এমনটাই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। নিজের ফুটবলারদের চিনতে সময় লাগে। জাতীয় দলের হয়ে কোনও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা টুখেলের আগে ছিল না। কেউ কেউ যেমন ধরে নিয়েছিলেন, তিনি আদৌ তেমন কোনও নকআউট-বিশেষজ্ঞ নন। তাঁর রেকর্ডটা একবার দেখলেই বোঝা যাবে। তিনি ধাপে ধাপে, একটি পদ্ধতি ধরে দল গড়ে তোলার মানুষ। আর আমরা এখন ঠিক সেই প্রক্রিয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।

তা হলে কী বদলেছে? সবচেয়ে স্পষ্ট পরিবর্তন, এই দলের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলা হয়েছে জুড বেলিংহ্যামকে। ভাবনাটা চমৎকার—এবং শুধু তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার জন্য নয়। বেলিংহ্যামকে ঘিরে গোটা দলকে একজোট করাটাই হল টুখেলের নিজস্ব সংস্করণ—সাউথগেটের সেই হাওয়া-ভরা ইউনিকর্ন, স্পিটফায়ার যুদ্ধবিমানের গল্প, কিংবা বিশেষ বাহিনী এসএএসের সঙ্গে দিন কাটাতে গিয়ে এমন এক বাধার পথ বেয়ে হামাগুড়ি দেওয়া, যা পুরোটাই চেডার চিজ আর একল্‌স কেক দিয়ে তৈরি।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles