বাইশ হাজার কোটি টাকার বেশি স্বীকৃত পাওনার বিপরীতে মাত্র সাড়ে ছয় কোটি টাকার নিষ্পত্তি। জি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়া মামলা ঘিরে এই বিপুল ব্যবধান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেউলিয়া আইনের কার্যকারিতা নিয়ে। তবে এই ধরনের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম নিয়ে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের তৎপরতা চন্দ্রের বিতর্কের আগে থেকেই। গত দু’বছরে প্রায় এক ডজন মামলায় দেউলিয়া প্রক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগ তদন্ত করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থাটি।

ইডির নজরে মূলত এমন বন্দোবস্ত, যেখানে ঋণদাতারা পাওনার বড় অংশ ছেড়ে দিচ্ছেন, অথচ পুরনো মালিকই অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছেন। বেঙ্গালুরুতে ইডি আধিকারিকদের সম্মেলনেও দেউলিয়া আইন এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় এই ধরনের প্রতারণা উদ্ঘাটনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তদন্তের বিষয় কেবল কত টাকা উদ্ধার হল, তা নয়; কার হাতে সম্পত্তি গেল এবং ক্রেতার অর্থ কোথা থেকে এল, সেটিও।

পাওনার যে অংশ ঋণদাতা ছেড়ে দেন, এই প্রসঙ্গে তাকেই বলা হচ্ছে ‘হেয়ারকাট’। যেমন, একশো টাকা পাওনার বদলে কুড়ি টাকা পেলে ছাড়ের পরিমাণ আশি শতাংশ। তবে বড় ছাড় মানেই প্রতারণা প্রমাণিত নয়। আর্থিক সংকটে পড়া সংস্থার সম্পদের প্রকৃত মূল্য কমে যেতেও পারে। প্রশ্ন ওঠে যখন মূল্য কম দেখানো, যোগসাজশ অথবা প্রকৃত ক্রেতার পরিচয় আড়াল করার অভিযোগ যুক্ত হয়।

সানস্টার ওভারসিজের ঘটনায় এই শেষের প্রশ্নটিই সামনে এসেছে। ইডির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সংস্থাটির বিরুদ্ধে স্বীকৃত দাবি ছিল ১,২৭৪.১৪ কোটি টাকা। কিন্তু দেউলিয়া নিষ্পত্তির মাধ্যমে উমাইজা ইনফ্রাকন এলএলপি সেটি অধিগ্রহণ করে ১৯৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ পাওনার প্রায় ৮৫ শতাংশ ছাড়। ইডির অভিযোগ, ক্রেতা ছিল নিজস্ব অর্থহীন একটি খোলস সংস্থা; ঋণের টাকা ঘুরিয়ে ব্যবহার করে অভিযুক্তেরা পুরনো ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। এই মামলায় ২৯৪.১৯ কোটি টাকার সম্পত্তি সাময়িকভাবে সংযুক্ত করেছে ইডি। গ্রেফতারও হয়েছেন তিনজন।

রিচা ইন্ডাস্ট্রিজের ক্ষেত্রে অভিযোগের কেন্দ্রে ঋণদাতাদের কমিটির ভোটাধিকার। প্রায় ২৩৬ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক প্রতারণার তদন্তে ইডির দাবি, প্রোমোটাররা এক প্রাক্তন কর্মীকে সামনে রেখে সারিগা কনস্ট্রাকশনস নামে একটি সংস্থা গড়েন। সেই সংস্থা ঋণদাতাদের কমিটিতে ভোটাধিকার আদায় করে নিষ্পত্তির সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানোর সুযোগ তৈরি করে। পরে রিচাকে অধিগ্রহণের প্রস্তাবও দেয় সারিগা। ফলে কাগজে নতুন ক্রেতা এলেও বাস্তবে পুরনো মালিকের নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।

ইডি আরও জানিয়েছে, রিচার দেউলিয়া প্রক্রিয়া পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশাদার অরবিন্দ কুমারের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। লেনদেনের নিরীক্ষায় অনিয়ম ধরা পড়লেও প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। প্রোমোটারদের ব্যক্তিগত দেউলিয়া প্রক্রিয়াতেও সম্পত্তির তথ্য গোপন করে ব্যাঙ্কের দায় এড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি সংস্থাটির।

অ্যালকেমিস্টের ঘটনায় আবার ঋণদাতাদের কমিটিতেই প্রাধান্য পেয়েছিল একই গোষ্ঠীর সংস্থাগুলি। ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, টেকনোলজি পার্কসের হাতে ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ ভোটাধিকার। অর্থাৎ ঋণদাতাদের নামে গঠিত ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত কার্যত সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণেই থাকার অভিযোগ ওঠে। ইডির হস্তক্ষেপের পরে ৩ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল প্রতারণা ও যোগসাজশের কারণে অ্যালকেমিস্টের দেউলিয়া প্রক্রিয়া প্রত্যাহার করে।

সুভাষ চন্দ্রের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যক্তিগত জামিনদার হিসেবে তাঁর দায় এবং ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলির দায় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে সামান্য অর্থ আদায়ের প্রস্তাবের অর্থ এই নয় যে মূল ঋণগ্রহীতা সংস্থার কাছ থেকে বাকি টাকা উদ্ধারের অধিকারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়।

এসব ঘটনা দেউলিয়া ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনছে: নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন, আর তার আর্থিক সুবিধা শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছেন? তদন্তে ওঠা অভিযোগ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া অবশ্য পৃথক বিষয়। সেই উত্তর পেতেই ক্রেতার পরিচয়, অর্থের উৎস এবং ভোটের নিয়ন্ত্রণ খতিয়ে দেখছে ইডি।