অন্যের দোষ দেখিয়ে নাগরিকের ভোটাধিকার হরণ ন্যায্য নয়: বিচারপতি ভুঁইয়া

যা জানা জরুরি
- ‘ভারতীয় নাগরিকের সত্তা থেকে ভোট দেওয়ার অধিকার কিংবা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকারকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
- তা হবে শরীর থেকে আত্মাকে বের করে নেওয়ার মতো,’ বললেন বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের মাধ্যমে নাগরিকদের ঢালাও ভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ৩২৬ এবং ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে সতর্ক…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
‘ভারতীয় নাগরিকের সত্তা থেকে ভোট দেওয়ার অধিকার কিংবা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকারকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তা হবে শরীর থেকে আত্মাকে বের করে নেওয়ার মতো,’ বললেন বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের মাধ্যমে নাগরিকদের ঢালাও ভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ৩২৬ এবং ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে সতর্ক করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া। অন্য প্রসঙ্গ তুলে কিংবা অন্যের দোষ দেখিয়ে এমন কোনও প্রক্রিয়াকে ন্যায্য প্রতিপন্ন করা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “এটি সংবিধানের একেবারে মর্মমূলে আঘাত করে। আমি এমনকি এ-ও বলব, ভারতের সংবিধানের মাধ্যমে আমরা যে সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি, এটি সেই ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করার শামিল।”
বিশেষত ভারতের প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিচারপতি ভুঁইয়া বলেন, “ভারতীয় নাগরিকের সত্তা থেকে ভোট দেওয়ার অধিকার কিংবা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকারকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তা হবে শরীর থেকে আত্মাকে বের করে নেওয়ার মতো।”
ভুঁইয়া বলেন, ভারতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ধারণার প্রাচীনতম প্রকাশের সন্ধান পাওয়া যায় ১৮৯৫ সালের ‘কনস্টিটিউশন অব ইন্ডিয়া বিল’-এ, যা ‘স্বরাজ বিল’ নামেও পরিচিত।
সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার নিয়ে গণপরিষদের বিতর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণপরিষদে যে খসড়া সংবিধান নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তাতে এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক দু’টি অনুচ্ছেদ ছিল, যদিও সেগুলি পরে যুক্ত করা হয়। এগুলি ছিল ২৮৯এ এবং ২৮৯বি অনুচ্ছেদ… খসড়া ২৮৯এ অনুচ্ছেদ সংবিধানের ৩২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে এবং খসড়া ২৮৯বি অনুচ্ছেদ ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিণত হয়… ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ, ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সন্নিবিষ্ট সাম্যের নীতিকে অর্থ ও বাস্তব বিষয়বস্তু দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “ভারতের সংবিধানের ৩২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ঘোষণা করে, লোকসভা কিংবা কোনও রাজ্যের আইনসভার নির্বাচনের জন্য প্রতিটি ভৌগোলিক নির্বাচনী কেন্দ্রে একটি সাধারণ ভোটার তালিকা থাকবে। কেবল ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, লিঙ্গ কিংবা এগুলির কোনও একটির ভিত্তিতে কাউকে এমন তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অযোগ্য বলে গণ্য করা যাবে না। আবার শুধু ওই পরিচয়গুলির ভিত্তিতে কেউ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কেন্দ্রের জন্য কোনও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবিও করতে পারবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লোকসভা এবং প্রতিটি রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচন হবে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। অন্য কথায়, প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক, যাঁর বয়স অন্তত ১৮ বছর—১৯৮৯ সালের ২৮ মার্চের আগে এই বয়স ছিল ২১ বছর—এবং যিনি অনাবাসিকতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, অপরাধ অথবা দুর্নীতিমূলক বা বেআইনি আচরণের কারণে সংবিধান কিংবা উপযুক্ত আইনসভা প্রণীত কোনও আইনের অধীনে অযোগ্য ঘোষিত হননি, তিনি এই ধরনের নির্বাচনে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার অধিকারী।”
ডক্টর বি আর আম্বেদকরকে উদ্ধৃত করে বিচারপতি ভুঁইয়া বলেন, “সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডক্টর আম্বেডকর বলেছিলেন, আমরা যেহেতু এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা কার্যত অতীতের ব্যবস্থাকে নাকচ করে দেয়, তাই বিষয়টি সংবিধানে স্পষ্ট ভাষায় বলা থাকাই শ্রেয়। এই কারণেই খসড়া সংবিধানে ২৮৯এ এবং ২৮৯বি অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছিল, যা এখন ৩২৫ এবং ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ।”
তিনি বলেন, “ডক্টর আম্বেদকর তাঁর সমাপনী ভাষণে সতর্ক করেছিলেন, ভোট দেওয়ার অধিকার এবং প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ভারতীয় নাগরিকের প্রাপ্য অধিকারকে সংসদীয় আইন প্রণয়নের খেয়ালখুশির উপর ছেড়ে না দিয়ে ভারতের সংবিধানেই লিখে রাখতে হবে।”
বিচারপতি ভুঁইয়া বলেন, “সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার গ্রহণের মধ্যে গণপরিষদের দৃঢ় প্রত্যয় প্রতিফলিত হয়েছে। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারকে একটি স্বাভাবিক পছন্দে পরিণত করেছিল। শাসনব্যবস্থা হিসেবে আমরা যে গণতন্ত্র গ্রহণ করেছি, এই ভোটাধিকার তার অপরিহার্য উপাদান।”
তিনি বলেন, “সুতরাং, এর মধ্য দিয়ে আমাদের সংবিধান-প্রণেতারা ভারতের সাধারণ মানুষ, তাঁদের বাস্তববোধ এবং প্রজ্ঞার উপর আস্থা রেখেছিলেন। ভারতে সাম্য প্রতিষ্ঠার পথে এটিই ছিল প্রথম পদক্ষেপ।”
‘একজন ধনকুবের হতে পারেন…’
বিচারপতি বলেন, “একজন ধনকুবের হতে পারেন, অন্যজন রিকশাচালক। তবু দু’জনেরই ভোট থাকবে এবং তাঁদের ভোটের মূল্য হবে সমান। একই ভাবে, এক দিকে সমাজের উঁচু স্তরে প্রতিষ্ঠিত কোনও মন্দিরের পুরোহিত, অন্য দিকে সমাজের একেবারে নীচের স্তরের এমন একজন মানুষ, যিনি হাতে করে মানুষের মল পরিষ্কার করতে বাধ্য হন—তাঁদের দু’জনেরই সমান ভোটাধিকার, তাঁদের ভোটের মূল্যও সমান। এটাই ভারতীয় সংবিধানের সমাজ বদলে দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি।”
বক্তব্যের শেষে নালসারের পড়ুয়াদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁরা “পড়ুয়াদের, বিশেষত আইনের পড়ুয়াদের যেমন হওয়া উচিত”, তেমনই হয়ে উঠেছেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



