শেষ দিনে সোনার ঝলক, ২১ সোনা-সহ ৮৫ পদকে এশিয়াড অভিযান শেষ ভারতের

যা জানা জরুরি
- শেষ দিনের একের পর এক সাফল্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ভারতের এশিয়ান গেমস অভিযানের সমাপ্তি।
- জাপানের আইচি-নাগোয়ায় শনিবার, ৩ অক্টোবর, নিজেদের প্রতিযোগিতা শেষ করল ভারত।
- চূড়ান্ত সংগ্রহ ৮৫টি পদক—২১টি সোনা, ২৭টি রুপো ও ৩৭টি ব্রোঞ্জ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শেষ দিনের একের পর এক সাফল্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ভারতের এশিয়ান গেমস অভিযানের সমাপ্তি। জাপানের আইচি-নাগোয়ায় শনিবার, ৩ অক্টোবর, নিজেদের প্রতিযোগিতা শেষ করল ভারত। চূড়ান্ত সংগ্রহ ৮৫টি পদক—২১টি সোনা, ২৭টি রুপো ও ৩৭টি ব্রোঞ্জ। পুরুষদের ক্রিকেট ও হকিতে খেতাব ধরে রাখার পাশাপাশি কুস্তি, তিরন্দাজি এবং গল্ফে সোনা এল। শেষ মুহূর্তের এই উত্থান ভারতকে পদকতালিকার চতুর্থ স্থানে তুলে এনেছে। তবে গেমসের সব প্রতিযোগিতা তখনও শেষ হয়নি।
ভারতের এবারের অভিযানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য শেষ দু’দিনের সাফল্য। মোট ২১টি সোনার মধ্যে ১১টিই এসেছে এই সময়ে। শনিবার পাঁচটি আলাদা খেলায় সোনা জেতা দেখিয়েছে, শেষ পর্বে ভারতীয় প্রতিযোগীরা কতটা কার্যকরভাবে সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। পরিচিত দলগত শক্তির পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইভেন্টেও তৈরি হয়েছে নতুন নজির। বিশেষ করে তিরন্দাজ কুমকুম মোহোদ এবং গল্ফার প্রণবী উর্সের জয় এবারের প্রতিযোগিতাকে আলাদা তাৎপর্য দিয়েছে।
ভারতের শেষ সোনাটি এনে দেয় পুরুষ হকি দল। ফাইনালে মালয়েশিয়াকে ৫–১ গোলে হারিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন হরমনপ্রীত সিংরা। অধিনায়ক নিজে দু’টি গোল করেন। অন্য তিনটি গোল যুগরাজ সিং, হার্দিক সিং এবং শিলানন্দ লাকরার। এই জয়ে এশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার সঙ্গে ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনও নিশ্চিত হয়েছে। ফলে সোনার পদকটির গুরুত্ব এই প্রতিযোগিতার সীমানা ছাড়িয়ে আগামী অলিম্পিক প্রস্তুতির সঙ্গেও যুক্ত।
হকিতে ভারতের আনন্দ আরও বড় হয়েছে মেয়েদের সাফল্যে। আগের দিন চিনকে ১–০ গোলে হারিয়ে মহিলা দলও সোনা জিতেছে এবং অলিম্পিকের ছাড়পত্র পেয়েছে। ৪৪ বছর পরে এশিয়ান গেমসে তাদের এই খেতাব জয়। একই আসরে ভারতের পুরুষ ও মহিলা হকি দলের সোনা জেতার ঘটনা এই প্রথম। দুই দলের জয় তাই ভারতীয় হকির জন্য একটি বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকল।
ক্রিকেটে ফাইনালের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান। শ্রেয়স আয়ারের নেতৃত্বে ভারত ১৯ রানে জিতে পুরুষদের টি-টোয়েন্টি খেতাব ধরে রাখে। প্রথমে ব্যাট করে ভারত তোলে ছয় উইকেটে ২১১ রান। অভিষেক শর্মার ৬১ রানের ইনিংস বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেয়। শেষ দিকে তিলক বর্মা মাত্র ২২ বলে অপরাজিত ৫১ রান করে গতি বাড়ান। পাকিস্তানের হাসান নওয়াজ ৫১ বলে ৯৬ রান করলেও ভারতীয় বোলাররা প্রতিপক্ষকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছতে দেননি।
কুস্তির ম্যাটে দিনের প্রধান নায়ক আমন সেহরাওয়াত। পুরুষদের ৫৭ কেজি ফ্রিস্টাইলে উত্তর কোরিয়ার হান চং সংকে হারিয়ে সোনা জেতেন তিনি। হাংঝৌয়ের ব্রোঞ্জ এবং প্যারিস অলিম্পিকের ব্রোঞ্জের পরে এ বার এশিয়ান গেমসের সর্বোচ্চ মঞ্চে উঠলেন এই তরুণ কুস্তিগির। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাঁর ধারাবাহিক সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হল আরও একটি বড় জয়। আগের দিন সুজিত কলকল পুরুষদের ৬৫ কেজি ফ্রিস্টাইলে সোনা জিতেছিলেন।
মহিলাদের ৫৩ কেজি বিভাগে অন্তিম পাঙ্ঘাল রুপো জেতেন। ফাইনালে জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে ১–৯ পয়েন্টে হারলেও আগের এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জের তুলনায় নিজের পদকের রং বদলেছেন তিনি। অন্য দিকে, পুরুষদের ৯৭ কেজি ফ্রিস্টাইলে দীপক পুনিয়া ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে মঙ্গোলিয়ার গাঙ্কুয়াগ গানবাতারকে ২–১ ব্যবধানে হারান। শেষ পর্যন্ত অল্প ব্যবধানের লিড ধরে রাখাই তাঁকে পদক এনে দেয়। কুস্তিতে শেষ দিনের এই তিন পদক ভারতের সামগ্রিক সংগ্রহকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তিরন্দাজিতে বিশেষ নজর কাড়েন ১৭ বছরের কুমকুম মোহোদ। মহিলাদের ব্যক্তিগত রিকার্ভে প্রথম ভারতীয় হিসেবে এশিয়ান গেমসের সোনা জেতেন তিনি। ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার ও ইয়েজিনকে ৬–৫ ব্যবধানে হারান। এই সাফল্য ভারতের জন্য অলিম্পিকের একটি কোটাও এনে দিয়েছে। নিজের প্রথম এশিয়ান গেমস থেকেই দু’টি সোনা ও একটি রুপো নিয়ে ফিরছেন কুমকুম। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর এই অভিষেক ভারতীয় তিরন্দাজির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার জায়গা তৈরি করেছে।
গল্ফে প্রণবী উর্স প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে ব্যক্তিগত সোনা জিতে ইতিহাস গড়েন। শেষ রাউন্ডে বিপত্তি সামলে মাত্র এক স্ট্রোকের ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। তাঁর পারফরম্যান্স মহিলাদের দলগত বিভাগে ভারতের রুপো জয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রণবীর সঙ্গে সেই দলে ছিলেন অদিতি অশোক ও দীক্ষা ডাগর। ব্যক্তিগত সাফল্য এবং দলগত পুরস্কার—দুই দিক থেকেই দিনটি ভারতীয় গল্ফের জন্য স্মরণীয়।
গোটা প্রতিযোগিতায় ভারতের সোনার সংগ্রহে সবচেয়ে বড় অবদান তিরন্দাজির, পাঁচটি। শুটিং এবং বক্সিং থেকে এসেছে তিনটি করে সোনা। ক্রিকেট, হকি, কবাডি ও কুস্তি দিয়েছে দু’টি করে। অ্যাথলেটিক্সে মহিলাদের ৪×৪০০ মিটার রিলে দল এবং গল্ফে প্রণবী বাকি দু’টি সোনা জিতেছেন। এই হিসাব বিভিন্ন খেলায় সাফল্যের বিস্তার দেখায়। তবে প্রতিটি বিভাগের প্রত্যাশা, অংশগ্রহণ এবং আগের ফল আলাদাভাবে বিচার করলেই সামগ্রিক পারফরম্যান্সের যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব।
মোট পদকের বিচারে এটি ভারতের দ্বিতীয় সেরা এশিয়ান গেমস অভিযান। হাংঝৌয়ে আগের আসরের রেকর্ড অবশ্য অক্ষত থাকল। ২০১৮ সালের জাকার্তা-পালেমবাং গেমসে ভারতের সংগ্রহ ছিল ৭০টি পদক; সেই হিসাবে এ বারের অর্জন ওই আসরের চেয়ে ১৫টি বেশি। সেখানকার ২৮টি সোনার তুলনায় এ বার সাতটি কম এসেছে। ফলে শেষ দিনের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি আগের উচ্চতায় পৌঁছতে না পারার বিষয়টিও মূল্যায়নে থাকবে। বড় প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক উন্নতির দাবি মাপতে শুধু শেষ দিনের জয় নয়, গোটা আসরে প্রত্যেক খেলার ফল এবং সম্ভাবনার ব্যবধানও দেখতে হবে।
শনিবারের শেষে চতুর্থ স্থানে থাকলেও ভারতের অবস্থানকে তখনই চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না। রবিবার অশ্বারোহণের প্রতিযোগিতায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী উজবেকিস্তানের অংশগ্রহণ বাকি থাকায় ক্রম বদলানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের নিজের পদকসংখ্যা অবশ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। আইচি-নাগোয়া থেকে তাই ভারত ফিরছে একদিকে ৮৫ পদকের অর্জন, অন্যদিকে নতুন চ্যাম্পিয়ন এবং অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জনের সাফল্য নিয়ে। আগামী আন্তর্জাতিক আসরের প্রস্তুতিতে এই অর্জনগুলিই হবে গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



