প্রাণনাশের সতর্কবার্তা, পুতিন ক্ষমতায় থাকলে পরিবারও নিরাপদ নয়: কাসপারভ

যা জানা জরুরি
- পুতিন-বিরোধিতার জন্য প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে—আমেরিকা ও লিথুয়ানিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছ থেকে এমনই সতর্কবার্তা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাশিয়ার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও প্রাক্তন বিশ্ব দাবা…
- তাঁর বক্তব্য, ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত তিনি বা তাঁর পরিবার প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নন।
- তবে সেই আশঙ্কা তাঁকে রাজনৈতিক লড়াই থেকে সরিয়ে দিচ্ছে না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পুতিন-বিরোধিতার জন্য প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে—আমেরিকা ও লিথুয়ানিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছ থেকে এমনই সতর্কবার্তা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাশিয়ার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও প্রাক্তন বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ। তাঁর বক্তব্য, ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত তিনি বা তাঁর পরিবার প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নন। তবে সেই আশঙ্কা তাঁকে রাজনৈতিক লড়াই থেকে সরিয়ে দিচ্ছে না। বরং সতর্কতা মেনেই প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সতর্কবার্তা
৩০ সেপ্টেম্বর নিজের অনলাইন প্রকাশনা ‘দ্য নেক্সট মুভ’-এ কাসপারভ লেখেন, তিনি এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী ইভান তিউত্রিনকে আমেরিকা ও লিথুয়ানিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলি সতর্ক করেছে। তাঁদের জানানো হয়েছে, প্রাণের ঝুঁকি রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাবিধি মেনে চলতে হবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন কাসপারভ—তাঁদের কাউকেই সরাসরি বলা হয়নি যে তাঁরা কোনও নির্দিষ্ট হত্যাচক্রান্তের আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত লক্ষ্য। অর্থাৎ নিরাপত্তা সংস্থার সতর্কবার্তা এবং কোনও নির্দিষ্ট মামলায় ‘সম্ভাব্য শিকার’ হিসেবে তাঁদের নাম নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়।
তাঁর সঙ্গে ‘ফ্রি রাশিয়া ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিউত্রিন। তিনিও লিথুয়ানিয়ায় নিরাপত্তা সংস্থার সতর্কতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
মামলার সূত্র
এই সতর্কবার্তার প্রেক্ষাপটে রয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগের একটি মামলা। ১৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তাঁদের রুশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করে আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে নজরদারি, হত্যার পরিকল্পনা এবং হামলা চালানোর জন্য লোক নিয়োগের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস বা এফএসবি-র এক আধিকারিকও রয়েছেন। পাঁচজনই পলাতক বলে জানিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
মামলার নথিতে আমেরিকায় বসবাসকারী এক রুশ ভিন্নমতাবলম্বীকে ‘ভিকটিম-১’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন তদন্তকারীদের অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে যুক্ত দু’টি ঠিকানায় নজরদারি চালিয়ে ছবি ও ভিডিয়ো সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে তাঁকে ‘খুন’ বা ‘নিখোঁজ’ করার জন্য ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আর একটি ঘটনায় লিথুয়ানিয়ায় বসবাসকারী এক ব্যক্তিকে হত্যার জন্য প্রায় ২৫ হাজার ডলারের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে রাশিয়া সম্পর্কে ‘মিথ্যা’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তাঁকে নিশানা করার কথা বলা হয়েছিল।
তবে এই সমস্ত তথ্য মার্কিন তদন্তকারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত। আদালতে এখনও অভিযুক্তদের দোষ প্রমাণিত হয়নি।
কে ‘ভিকটিম’?
মামলার নথিতে গোপন রাখা পরিচয়গুলি নিয়ে জল্পনা তৈরি হলেও, কাসপারভ বা তিউত্রিনকে সেখানে প্রকাশ্যে ‘ভিকটিম-১’ বা ‘ভিকটিম-২’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
কাসপারভ নিজেও লিখেছেন, তাঁদের সরাসরি বলা হয়নি যে তাঁরা ওই মামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্য। অন্য দিকে, সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে কাসপারভ, তিউত্রিন এবং ইউক্রেনভিত্তিক রুশ ভিন্নমতাবলম্বী ইলিয়া পোনোমারিয়ভের নাম উঠে এসেছে। তবে এই পরিচয়গুলি আনুষ্ঠানিক ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
তিউত্রিনও সতর্ক
লিথুয়ানিয়ায় বসবাসকারী তিউত্রিন জানিয়েছেন, প্রায় দু’সপ্তাহ আগে সেখানকার কর্তৃপক্ষ তাঁকে দ্রুত বাড়ি ছাড়তে এবং নিজের গাড়ি সরিয়ে ফেলতে বলেছিল। তবে কী ধরনের নির্দিষ্ট বিপদের আশঙ্কা রয়েছে, সে বিষয়ে তাঁকে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তিউত্রিনের ধারণা, ইউক্রেনের পক্ষে তাঁর অবস্থানের কারণে রুশ নিরাপত্তা সংস্থার নজরে পড়েছেন তিনি। তবে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; এর স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
দাবার বোর্ড থেকে রাজনীতি
৬৩ বছরের কাসপারভের পরিচিতি অবশ্য রাজনীতির অনেক আগের। ১৯৮৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে পেশাদার দাবা থেকে অবসর নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে আরও বেশি মন দেন। ২০১৩ সালে রাশিয়া ছেড়ে যাওয়ার পর ক্রমেই পুতিনের অন্যতম পরিচিত সমালোচক হয়ে ওঠেন।
রুশ কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালে তাঁকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০২৪ সালে তাঁকে ‘সন্ত্রাসবাদী ও উগ্রপন্থী’ তালিকাতেও যুক্ত করা হয়।
পুতিনের বিরোধিতা করতে গিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তাঁর কাছে অবশ্য নতুন নয়। তাঁর বন্ধু এবং রুশ বিরোধী নেতা বরিস নেমৎসভ ২০১৫ সালে মস্কোয় খুন হওয়ার পর সেই আশঙ্কা আরও প্রকট হয়ে ওঠে বলে কাসপারভ নিজেই লিখেছেন।
ক্রেমলিনের জবাব
মার্কিন মামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো। ক্রেমলিনের বক্তব্য, পর্যাপ্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এই ধরনের অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করার কারণ নেই। বিদেশের মাটিতে রুশ কর্তৃপক্ষের এমন হত্যাচক্রান্তের অভিযোগও অতীতে অস্বীকার করেছে রাশিয়া।
লড়াই চলবে
নিরাপত্তার আশঙ্কার মধ্যেও রাজনৈতিক অবস্থান বদলানোর ইঙ্গিত দেননি কাসপারভ। ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া এবং রাশিয়ার উপর আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখার পক্ষে প্রচার চালিয়ে যেতে চান তিনি।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা—নিরাপত্তার জন্য নিজেকে আড়াল করলেই স্থায়ী নিশ্চয়তা মিলবে না। তাই সতর্ক থাকবেন, কিন্তু থামবেন না। পুতিন-বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার বদলে সেই অবস্থানেই সক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



