মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের বৈধতা নিয়ে দায়ের হওয়া মামলা আগামী সপ্তাহে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। আবেদনে নির্বাচন কমিশনের মূল নথিপত্র পরীক্ষা করার আর্জিও জানানো হয়েছে। তবে আদালত এখনও এসআইআরকে বেআইনি ঘোষণা করেনি কিংবা ওই নথি তলবের নির্দেশ দেয়নি। আপাতত মামলাটি শুনানির তালিকায় তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আবেদনকারী রাকেশ কুমার সিংহের হয়ে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিংহ দ্রুত শুনানির আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য, একাধিক সদস্য নিয়ে কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যই হল যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অথচ এসআইআরের মতো ব্যাপক প্রভাবসম্পন্ন কর্মসূচির পিছনে পূর্ণ কমিশনের যথাযথ সিদ্ধান্ত ছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি হয়েছে। আদালত এত দিন যেসব পদক্ষেপকে কমিশনের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করেছে, সেগুলির প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন বলে তিনি যুক্তি দেন।

এই বিতর্কের সূত্র নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুসন্ধান। নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের অজ্ঞাতে অথবা সুপারিশ ছাড়াই কিছু পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। আবেদনকারীর দাবি, এই আপত্তিগুলির আলোকে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকৃত প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা জরুরি।

আবেদনের সাংবিধানিক যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ৩২৪ অনুচ্ছেদ। আবেদনকারী বলেছেন, নির্বাচনের তত্ত্বাবধান, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। সেই ক্ষমতা কোনও ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার নয়। অন্য নির্বাচন কমিশনাররা নিযুক্ত থাকলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। আবেদনকারীর ব্যাখ্যায়, চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা এবং গোটা কমিশনের ক্ষমতা এক করে দেখা চলে না। কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া আর কমিশনের সমষ্টিগত কর্তৃত্ব এককভাবে প্রয়োগ করা পৃথক বিষয়।

এখানে প্রাসঙ্গিক ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার সংক্রান্ত আইনের ১৮ ধারা। এই ধারায় কমিশনের কাজের পদ্ধতি এবং সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নির্ধারণের কথা রয়েছে। কমিশনের কাজও যথাসম্ভব সর্বসম্মতভাবে পরিচালিত হবে। তবে কোনও বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য কমিশনারদের মতভেদ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ, সর্বসম্মতির অভাব মাত্রেই প্রতিটি সিদ্ধান্ত বেআইনি হয়ে যায় না; সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধানও আইনে রয়েছে।

আবেদনকারী ‘কো ওয়ারান্টো’ রিট চেয়ে জ্ঞানেশ কুমারকে তাঁর কর্তৃত্বের ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে বলার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োগ করার অধিকার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কোথা থেকে পেলেন? আবেদনে চাওয়া হয়েছে, আইনসম্মত যৌথ সিদ্ধান্ত ছাড়াই এমন ক্ষমতা প্রয়োগের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপকে বৈধ কর্তৃত্ববিহীন ঘোষণা করা হোক। কমিশনের নামে নির্দেশ বা অন্য কার্যক্রম জারির ক্ষেত্রেও যৌথ সিদ্ধান্তের শর্ত কার্যকর করার দাবি উঠেছে।

নথি পরীক্ষার দাবিটি তাই মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কমিশনের বৈঠকের কার্যবিবরণী, আলোচ্যসূচি, অনুমোদনের কাগজপত্র, ফাইলের মন্তব্য, দায়িত্ব বণ্টনের নির্দেশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারের রেকর্ড আদালতে আনার আবেদন জানানো হয়েছে। সার্ভারের লগ এবং তথ্যভাণ্ডারে পরিবর্তনের ইতিহাসও চাওয়া হয়েছে। এগুলির মাধ্যমে কোন সিদ্ধান্ত কখন নেওয়া হয়েছিল, কার অনুমোদন ছিল এবং অন্য সদস্যরা কী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। কাগজের পাশাপাশি ডিজিটাল নথি সংরক্ষণেরও দাবি রয়েছে।

আবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে ভোটার হিসেবে নাম তোলার ফর্ম ৬ পরিবর্তন, ভোটার তালিকার তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ এবং পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর সংক্রান্ত আপিল। বিচারিক আধিকারিকদের নির্দেশে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ভোটারদের বিরুদ্ধে কমিশনের নামে প্রায় ১৬.১০ লক্ষ আপিল দায়েরের অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এগুলি আবেদনকারীর উত্থাপিত অভিযোগ; আদালতের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়। আবেদনকারীও প্রথমেই প্রতিটি অভিযোগ সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে মূল নথি পরীক্ষা করার আর্জি জানিয়েছেন।

পৃথক প্রতিকার হিসেবে এসআইআর এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপগুলিকে গোড়া থেকেই অবৈধ ঘোষণার দাবি করা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমারকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার আবেদনও রয়েছে। তবে এসবই চাওয়া প্রতিকার। সুপ্রিম কোর্ট ওই দাবিগুলি মেনে নিয়েছে, এমন কোনও সিদ্ধান্ত মঙ্গলবারের তালিকাভুক্তির নির্দেশ থেকে টানা যায় না।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানিয়েছে, বিভিন্ন মত ও পর্যবেক্ষণ প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার স্বাভাবিক অঙ্গ। কমিশনের দাবি, গত এক বছরে এসআইআর-সহ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলি পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য, কয়েকটি অভ্যন্তরীণ মন্তব্য আলাদা করে তুলে ধরে বৃহত্তর অনুমোদন ও সিদ্ধান্তের ধারাকে উপেক্ষা করলে অসম্পূর্ণ ছবি তৈরি হয়। কমিশনের আধিকারিকদেরও নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নতির জন্য মতামত দেওয়ার অধিকার রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ফলে বিরোধটি এখন দু’টি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। আবেদনকারী নথির ভিত্তিতে পরীক্ষা চান, আর কমিশন বলছে প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল। এই অবস্থায় মূল প্রশ্ন হবে, আপত্তির পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে গৃহীত হয়েছিল এবং তার নির্ভরযোগ্য রেকর্ড কী। মতপার্থক্যের অস্তিত্ব এবং নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়। আবার চেয়ারম্যানের নাম বা স্বাক্ষর থাকাই যৌথ অনুমোদনের প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর নয়। আগামী সপ্তাহে মামলাটি উঠলে আদালত কোন প্রশ্নে ব্যাখ্যা চাইবে এবং কী পরবর্তী নির্দেশ দেবে, সেদিকেই নজর থাকবে। ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে, সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই বিতর্ক যুক্ত। তাই সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সাংবিধানিক সংস্থার অনুমোদনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুনানিতে অভিযোগ, কমিশনের জবাব এবং প্রামাণ্য নথির পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।