নন্দীগ্রামে ভোটের মুখে পুরনো মামলা, মিলনের জামিনেও মেটেনি বিচারের অপেক্ষা

যা জানা জরুরি
- উনিশ বছর আগের রক্তক্ষয়ী জমি আন্দোলনের মামলা ফের নন্দীগ্রামের নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে।
- সেই মামলাগুলিতে গ্রেফতার হওয়া কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, কলকাতা হাই কোর্টে অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছেন।
- আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে প্রচারে ফেরার সুযোগ পেলেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
উনিশ বছর আগের রক্তক্ষয়ী জমি আন্দোলনের মামলা ফের নন্দীগ্রামের নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে। সেই মামলাগুলিতে গ্রেফতার হওয়া কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, কলকাতা হাই কোর্টে অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছেন। আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে প্রচারে ফেরার সুযোগ পেলেন তিনি। কিন্তু ভোটের উত্তাপ কিংবা গ্রেফতারির বিতর্ক নিহতদের পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটায়নি। তাঁদের কাছে এখনও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিচার কবে হবে।
বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ ২০০৭ সালের ছয়টি মামলায় মিলনকে তিন সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন দিয়েছেন। বার অ্যান্ড বেঞ্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামিনের মেয়াদ ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। আদালত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত জানিয়েছে। তবে এটি সাময়িক জামিনের নির্দেশ; মামলাগুলিতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ এবং অভিযোগের বিচার তাই পৃথক বিষয় হিসেবেই থাকছে।
মিলনকে গ্রেফতার করা হয় ১৮ সেপ্টেম্বর। তার কয়েক ঘণ্টা আগেই নন্দীগ্রামে তৃণমূল-সমর্থিত প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছিলেন। এই ঘটনাক্রম সামনে রেখে কংগ্রেস গ্রেফতারিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের দাবি, পুরনো মামলা তুলে তাঁদের প্রার্থীকে আটকানোর চেষ্টা হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের বক্তব্য, জামিন পাওয়া কিংবা না-পাওয়ায় তাঁদের দলের অবস্থান বদলায় না; আইন নিজের পথেই চলবে।
জামিনের শুনানিতে মামলার বয়স এবং পুলিশি পদক্ষেপের সময় বিশেষ গুরুত্ব পায়। আদালত লক্ষ করে, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া কার্যকর করার জন্য পুলিশের হাতে দীর্ঘ উনিশ বছর ছিল। অথচ মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরেই গ্রেফতার করা হয়েছে। মিলনের আইনজীবীদের যুক্তিও ছিল, এতদিন পরে নির্বাচনের মুখে গ্রেফতারির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা দরকার। আদালত নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বর্তমান নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছে।
রাজ্য অবশ্য জামিনের বিরোধিতা করে অভিযোগের গুরুতর চরিত্রের কথা বলেছিল। লাইভ ল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের আশঙ্কা ছিল, মুক্তি পেলে অভিযুক্ত সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারেন। শুনানিতে আদালত জানতে চায়, অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ হয়েছে এবং পুরনো নির্দেশ কার্যকর করার পুলিশি নথি কোথায়। সম্পত্তি ক্রোকের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ফলে বিতর্ক শুধু নির্বাচনী প্রচারের সুযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; দীর্ঘদিনের পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।
মিলনের বিরুদ্ধে চলা চারটি হত্যা মামলায় সহ-অভিযুক্তদের মধ্যে তৃণমূল ও বিজেপির স্থানীয় নেতারাও রয়েছেন। চারটির চার্জশিটেই তাঁকে পলাতক দেখানো হয়েছে। সেই সময় তাঁরা জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতায় গঠিত ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মিলনের গ্রেফতারির পরে আরও কয়েকজন অভিযুক্তের বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। এই তথ্য মামলাগুলির দীর্ঘসূত্রতা এবং অভিযুক্তভেদে পুলিশি তৎপরতার প্রশ্নকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এই উপনির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম ছেড়ে ভবানীপুর আসন রাখায় এখানে ভোট হচ্ছে। বিজেপি প্রার্থী করেছে তাঁর নিহত সহযোগী চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানিকে। অন্যদিকে কংগ্রেস প্রার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন মমতা। ফলে মিলনের গ্রেফতার ও জামিন বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কোনও দলের অভিযোগ কিংবা পাল্টা বক্তব্যই বিচারাধীন মামলার অপরাধ প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
নিহতদের স্বজনদের প্রতিক্রিয়ায় সেই দূরত্বই স্পষ্ট। তাঁদের কাছে ভোট কিংবা গ্রেফতারের কার্যত কোনও অর্থ নেই, কারণ প্রায় দুই দশক পরেও তাঁরা বিচারের অপেক্ষায়। মিলনের অন্তর্বর্তী জামিন নির্বাচনী প্রচারের একটি বাধা সরিয়েছে; হত্যার অভিযোগগুলির উত্তর দেয়নি। নন্দীগ্রামের সামনে তাই পাশাপাশি রয়ে গেল দুটি বিষয়: নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ এবং দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলার নিষ্পত্তি। প্রথমটির সময়সীমা ভোটের দিন দিয়ে নির্ধারিত; দ্বিতীয়টির জন্য এখনও অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



