খবর

নিরাপত্তার নামে নারীর স্বাধীনতায় তালা কেন?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • কী করে নিরাপদে থাকব, সেই হিসাব মনে মনে কষে যেতে হয়—কী পরছি, কোথায় যাচ্ছি, কী ভাবে সেখানে পৌঁছব, আরও কত কী।
  • রাগ হয় এই গোটা ব্যাপারটার চূড়ান্ত অযৌক্তিকতায়।
  • রাগ হয় প্রতিদিন পড়া যৌন হিংসা ও হেনস্থার খবরে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

কী করে নিরাপদে থাকব, সেই হিসাব মনে মনে কষে যেতে হয়—কী পরছি, কোথায় যাচ্ছি, কী ভাবে সেখানে পৌঁছব, আরও কত কী। রাগ হয় এই গোটা ব্যাপারটার চূড়ান্ত অযৌক্তিকতায়। রাগ হয় প্রতিদিন পড়া যৌন হিংসা ও হেনস্থার খবরে। এমন অনুভূতি আমার একার নয়।

গত সপ্তাহে বিশেষ ভাবে ক্ষোভ জাগানো দু’টি ঘটনা গোটা দেশের নজর কেড়েছে। প্রথমে বিহারের জামুইয়ে রাতে দুই কিশোরীকে একদল পুরুষের হেনস্থা ও শ্লীলতাহানি করার অভিযোগের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তার পরে দিল্লিতে এক বন্ধুর সঙ্গে বাইরে বেরোনো ১৭ বছরের এক কিশোরীকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে কয়েক জন পুরুষ একটি পার্কে গণধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। জামুইয়ের ঘটনার পরে বিহারের মহিলারা ‘আউটলুক’কে জানিয়েছেন, কী ভাবে ওই ঘটনা তাঁদের উপর নিয়ন্ত্রণ ও চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দিল্লিতে কর্তৃপক্ষ সর্বসাধারণের পার্কে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। মেয়েদের অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লেডি শ্রীরাম কলেজও অল্প সময়ের জন্য ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নিয়েছিল।

আমি বারবার একই প্রবণতা লক্ষ করেছি: যৌন হিংসার কোনও ঘটনা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার পরিণামে নারীর জীবনই আরও বেশি বিধিনিষেধের জালে জড়িয়ে পড়ে। আমাদেরই বলা হয়, নির্দিষ্ট কিছু জায়গা এড়িয়ে চলতে, নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে, শালীন পোশাক পরতে কিংবা আরও আগে বাড়ি ফিরতে। এ ভাবেই এই বিপদ থেকে বাঁচার দায় আমাদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া হয়। নারীবাদী আন্দোলনকর্মী কবিতা কৃষ্ণন এই প্রবণতাকে বর্ণনা করেছেন, “সম্ভবত ভারতে লিঙ্গভিত্তিক হিংসার সবচেয়ে ব্যাপক রূপ” হিসেবে।

আমাদের সমাজে যৌন হিংসার শিকড় এত গভীরে কেন, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার চর্চা কী ভাবে এই হিংসাকে টিকিয়ে রাখে, কিংবা পুরুষদের কী ধরনের সামাজিক মূল্যবোধে গড়ে তোলা প্রয়োজন—এসব বোঝার চেষ্টা হয় না। পরিবর্তে আশা করা হয়, জনপরিসরে নারীরা নিজেদের উপস্থিতি আরও গুটিয়ে নেবেন। যদিও নিজের ঘরের ভিতরেও যে তাঁরা নিরাপদ থাকবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

নারীদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, কারণ “এতে প্রতিষ্ঠানকে কোনও খরচ বহন করতে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায় যে সমস্যাটির মোকাবিলা করা হচ্ছে,” বলছেন নারীবাদী লেখক মীনা কান্দাসামি। তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘ফিল্ডওয়ার্ক অ্যাজ আ সেক্স অবজেক্ট’-এ এক নারীর মুখ ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে কী ভাবে তাঁর জীবন ওলটপালট হয়ে যায়, সেই কাহিনি উঠে এসেছে। কান্দাসামির কথায়, “যে তরুণীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তাঁদের উদ্দেশে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর লক্ষ্য সমাজের বাকি অংশ।”

আমার অভিজ্ঞতায়, এই দমন চলে তিনটি স্তরে: প্রথমে পরিবারে, তার পরে বৃহত্তর সমাজে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের হাতে। সুরক্ষা দেওয়ার অজুহাতে বাড়িতে এর শুরু—ইচ্ছেমতো বাড়ি ফেরার সময় বেঁধে দেওয়া কিংবা পোশাকের বিধিনিষেধ চাপানো হয়। সমাজের স্তরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠী নীতিপুলিশি, নির্যাতিতাকেই দায়ী করা এবং নারীরা যেন নিজেদের ‘অনিরাপদ’ পরিস্থিতিতে না ফেলেন—এমন প্রত্যাশার মাধ্যমে সেই নিয়ন্ত্রণকে আরও পোক্ত করে।

এর পরে আসে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। সূর্যাস্তের পরে পার্কে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করলে সেখানে মানুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই কমতে পারে। কিন্তু ওই জায়গায় নারীরা কেন নিরাপদ নন, তার কোনও সমাধান হয় না। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, হেনস্থা ও যৌন হিংসা নির্দিষ্ট সময় কিংবা দিনের আলোর হিসাব মেনে ঘটে না। আর নারীর উপরে চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়ের প্রতিকার তাঁর জীবনে আরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে না। কান্দাসামির কথায়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন পক্ষই নারীকে দেখে এমন এক “সমস্যা” হিসেবে, যাকে “সামলাতে হবে”।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের কাছে তিনি নাগরিক নন, সমাজের কাছে সদস্য নন, পরিবারের কাছে প্রাপ্তবয়স্ক নন। তাঁকে দেখা হয় প্রাণহীন অথচ মূল্যবান কোনও বস্তু হিসেবে—যেন একটি হিরে, চুরি ঠেকাতে যাকে তালাবন্ধ করে রাখতে হবে।”

‘নীতিপুলিশি’র নিশানায় ভুল পক্ষ

তবে নারীরা এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলিতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা নিরাপদ জনপরিসরের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে রাস্তায় আরও আলোর ব্যবস্থা, ব্যবহারযোগ্য সর্বসাধারণের শৌচাগার এবং ছাত্রীদের জন্য আরও আবাসন ও বৃত্তি। লেডি শ্রীরাম কলেজের ২০ বছরের ছাত্রী বেদায়না বলছেন, পার্কে তালা ঝোলানো সমাধান নয়। “মহিলারা যাতে সেখানে যেতে পারেন, তার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা যদি না করেন, তা হলে কার্যত বলা হচ্ছে, পার্কটি কেবল পুরুষদের জন্য।”

সমস্যার ব্যাপকতা ভয়াবহ ভাবে স্পষ্ট। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় নয়াদিল্লি ও বেঙ্গালুরুর চার হাজারেরও বেশি মহিলার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। তাতে দেখা গিয়েছে, গত এক বছরে নয়াদিল্লির ৬৫ শতাংশ এবং বেঙ্গালুরুর ২৯ শতাংশ মহিলা জনপরিসরে হেনস্থার শিকার হয়েছেন।

ভারত ও পাকিস্তান নিয়ে ২০২৪ সালের আর একটি গবেষণায় দেখা যায়, সামগ্রিক ভাবে নারীদের চলাফেরার সুযোগ এখনও অত্যন্ত সীমিত। যতটুকু স্বাধীনতা তাঁরা পান, তার প্রায় পুরোটাই বাঁধা থাকে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে অন্যের যত্ন নেওয়ার কাজের সঙ্গে। নিছক অবসর কাটাতে বা আনন্দের জন্য বাইরে বেরোনোর বাস্তব সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

সমস্যাটি এত ব্যাপক ও জরুরি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মানুষের আস্থা আরও নড়িয়ে দিতে পারে। শ্লীলতাহানির ভিডিওটি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বিহারের এক মহিলা মন্ত্রী বলেছেন, “নীতিপুলিশি আরও ভদ্র ও মার্জিত ভাবে করা যেতে পারে।” একই রাজ্যের আর এক মন্ত্রী ঘটনাটিকে “বিচ্ছিন্ন” বলে বর্ণনা করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

নারীর বিরুদ্ধে অপরাধকে লঘু করে দেখা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় দেয়, যেখানে জবাবদিহি বাধ্যতামূলক নয়। বেদায়নার মতো ছাত্রীরা এই অবস্থার পরিবর্তন চান। তিনি আমাকে বললেন, যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত কাউকে নির্বাচনে প্রার্থী না করা কিংবা কোনও পদ না দেওয়ার অঙ্গীকার করা উচিত রাজনৈতিক দলগুলির। তাঁর কথায়, “আমরা চাই না, শীর্ষে বসে থাকা নেতারা ধর্ষণ-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখুন ও তার প্রচার করুন।”

এ ধরনের অভিযোগ থেকে সংসদও মুক্ত নয়। ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রাক্তন প্রধান, বিজেপি রাজনীতিক ব্রিজভূষণ সিংহের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ছয় মহিলা কুস্তিগির যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একটি মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে খালাস দিয়েছেন; সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রক্রিয়া চলছে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসের ২০২৪ সালে নির্বাচিত সাংসদদের নিয়ে করা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে ১৫ জন নিজেদের বিরুদ্ধে নারী-সংক্রান্ত অপরাধের মামলা থাকার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

বেদায়নার মতে, মানসিকতার পরিবর্তন শুরু করতে হবে ছোটবেলা থেকেই—পরিবারে এবং ছেলেদের বড় করে তোলার পদ্ধতিতে। “আপনি যদি কর্তৃত্বের কোনও জায়গায় থাকেন, তা হলে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলে মানুষকে প্রভাবিত করতে সেই অবস্থান কাজে লাগান। আর সবার আগে নিজের ছেলেদের মানসিকতা গড়ে তুলুন।”

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles