২০০ বছর পর টেনেসিতে নারীর ফাঁসি?

যা জানা জরুরি
- ত্রিশ বছর আগে খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল ক্রিস্টা পাইকের।
- কিন্তু শেষ মুহূর্তেও মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই মিলল না তাঁর।
- সোমবার পাইকের ক্ষমাভিক্ষার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন টেনেসির গভর্নর বিল লি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ত্রিশ বছর আগে খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল ক্রিস্টা পাইকের। বুধবার সেই সাজা কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু শেষ মুহূর্তেও মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই মিলল না তাঁর। সোমবার পাইকের ক্ষমাভিক্ষার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন টেনেসির গভর্নর বিল লি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে, ২০০ বছরেরও বেশি সময় পর টেনেসিতে কোনও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটবে।
পাইকের বয়স এখন ৫০। ১৯৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি এবং তাঁর ১৭ বছর বয়সি প্রেমিক তাদারিল শিপ নক্সভিল জব কোরের সহপাঠী ১৯ বছরের কলিন স্লেমারকে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা, অভিযুক্তদের অল্প বয়স এবং নিহতের শরীরে শয়তান-উপাসনার একটি প্রতীক খোদাই করার ঘটনা সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।
১৯৯৬ সালে ‘ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার’-এর দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন পাইক। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে তখন তিনিই হয়ে ওঠেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ নারী।
এরপর কেটে গিয়েছে প্রায় তিন দশক। এই সময়ে পাইকের অতীতের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের নানা সমস্যার কথা সামনে এসেছে। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, কৈশোর থেকেই গুরুতর মানসিক আঘাতের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় যত এগিয়েছে, ততই পাইকের সাজা মকুবের দাবিতে সরব হয়েছে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন বা এসিএলইউ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংগঠন। সাধারণ মানুষকেও গভর্নরের দফতরে যোগাযোগ করে মৃত্যুদণ্ড রদের আবেদন জানানোর আহ্বান জানিয়েছিল তারা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেননি গভর্নর লি।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ক্রিস্টা গেইল পাইকের ক্ষমাভিক্ষার আবেদন এবং মামলাটি “পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে” পর্যালোচনা করার পর তিনি অঙ্গরাজ্যের আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গভর্নরের সিদ্ধান্তে পাইকের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাঁরা “গভীরভাবে দুঃখিত ও মর্মাহত”। তাঁদের বক্তব্য, ১৮ বছর বয়সে সংঘটিত অপরাধের জন্য একজন তরুণীকে কতটা দায়ী করা যায়, বিশেষত যখন তাঁর জীবনে গুরুতর মানসিক আঘাত ও অসুস্থতার ইতিহাস রয়েছে—এই প্রশ্নে কয়েক দশকের গবেষণাকেও অঙ্গরাজ্য যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
আইনজীবীদের দাবি, ছোটবেলা থেকে পাইকের দেখভাল করার কথা ছিল যে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলির, তারা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। তাঁদের মতে, তখনকার সেই ১৮ বছরের তরুণী এবং আজকের ৫০ বছরের পাইকের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এখন তিনি নিজের অপরাধের গুরুত্ব বোঝেন, চিকিৎসা নিয়েছেন এবং কারাগারে থাকা অন্য নারীদেরও সাহায্য করেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উপর স্থগিতাদেশ চেয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছেন পাইকের আইনজীবীরা।
সহকারী ফেডারেল ডিফেন্ডার স্টিফেন ফেরেলের দাবি, ছোটবেলা থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন পাইক। ১১ এবং ১৭ বছর বয়সে তিনি ধর্ষিত হন। ফেরেলের অভিযোগ, মামলার সাজা নির্ধারণের পর্যায়ে পাইকের তৎকালীন আইনজীবীরা তাঁর অতীতের এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি জুরির সামনে যথেষ্টভাবে তুলে ধরেননি। তাঁর বয়স এবং কৈশোরের মানসিক বিকাশের বিষয়টিও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে দাবি তাঁর।
স্লেমারকে হত্যায় নিজের ভূমিকা অবশ্য কখনও অস্বীকার করেননি পাইক। পরবর্তী সময়ে তাঁর বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি ধরা পড়ে।
ক্ষমাভিক্ষার আবেদনের সঙ্গে দেওয়া বিবৃতিতে পাইক নিজেই লিখেছেন, তিনি তখন “মানসিক অসুস্থতায় ভোগা ১৮ বছরের একটি মেয়ে” ছিলেন। নিজের কাজের ভয়াবহতা বুঝতে তাঁর বহু বছর লেগেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, এমন একজনের জীবন তিনি কেড়ে নিয়েছিলেন, যিনি কারও সন্তান, কারও বোন, কারও বন্ধু। সেই অপরাধের কথা ভাবলেও এখনও তাঁর “অসুস্থ বোধ” হয়।
ফেরেলের যুক্তি, কৈশোরে মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পর্কে এখনকার জ্ঞান তিন দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁর মতে, পাইকের মামলাটি এই কারণেও ব্যতিক্রমী।
হত্যাকাণ্ডের সময় পাইকের প্রেমিক শিপের বয়স ছিল ১৭। তাঁকে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ-সহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। গত বছর তাঁর প্যারোলের আবেদন অবশ্য খারিজ হয়। ঘটনায় জড়িত তৃতীয় এক অল্পবয়সি অভিযুক্ত অপরাধে সহায়তার কথা স্বীকার করেছিল। তাকে কারাগারে পাঠানোর বদলে শর্তসাপেক্ষ নজরদারির সাজা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, নিহত কলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজের কাছে মেয়ের স্মৃতি আজও অন্য রকম। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি জানিয়েছেন, স্লেমার স্পেশাল অলিম্পিক্সে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতেন, রোলার স্কেটিং ভালবাসতেন এবং কম্পিউটার-সংক্রান্ত পেশায় যেতে চেয়েছিলেন।
মার্টিনেজের কথায়, “ও খুব সহজ-সরল, মিশুকে ছিল। গোড়া থেকেই কম্পিউটারে ভীষণ আগ্রহ ছিল ওর। ও আর আমার স্বামী সারাক্ষণ কম্পিউটার খুলত, আবার জোড়া লাগাত। ও সবাইকে বিশ্বাস করত। আর সেটাই ওর সর্বনাশ করল।”
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, টেনেসিতে শেষ কোনও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৮২০ সালে। হত্যায় সহায়তার অভিযোগে মার্টিন ইভ নামে এক নারীকে তখন ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতেও আমেরিকায় নারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০২৩ সালে মিসৌরিতে অ্যাম্বার ম্যাকলফলিন নামে এক রূপান্তরকামী নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০০৩ সালের একটি হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি এই সাজা পেয়েছিলেন। আমেরিকায় কোনও রূপান্তরকামী নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা হিসেবে এটিকে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালে ফেডারেল সরকার লিসা মন্টগোমারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। প্রায় সাত দশকের মধ্যে সেটিই ছিল ফেডারেল সরকারের হাতে কোনও নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা। তার আগে ২০১৫ সালে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যেও এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



