দুর্গাপূজার আগাম দর্শন বা ‘প্রিভিউ শো’ আয়োজনকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর কলকাতার ১৫টি ঠিকানায় তল্লাশি চালাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। তল্লাশির আওতায় রয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন পর্যটনমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বাসভবন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন জায়গা। মহানির্বাণ রোড মাস আর্ট, সংক্ষেপে মাসআর্ট নামে একটি অলাভজনক সংস্থার অর্থ সংগ্রহ ও তা ব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই তদন্ত। তদন্তকারীদের দাবি, পূজার প্রিভিউ আয়োজনের নামে সংগৃহীত অর্থের একাংশ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

ইডির এক আধিকারিক জানিয়েছেন, মাসআর্টের দুর্গাপূজা প্রিভিউ শো পরিচালনায় কথিত আর্থিক অনিয়মের সূত্রেই অভিযান চলছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রাক্তন মন্ত্রী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে যুক্ত ঠিকানাগুলিও তল্লাশির আওতায় এসেছে। তবে তল্লাশি থেকে কী উদ্ধার হয়েছে, কত অর্থের নির্দিষ্ট লেনদেন চিহ্নিত হয়েছে কিংবা কার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, সে বিষয়ে এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের অধীনে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।

মাসআর্টের প্রিভিউ শোয়ের মূল ধারণা ছিল, সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য পূজামণ্ডপ খুলে দেওয়ার আগে দেশবিদেশের আগ্রহী দর্শকদের নির্বাচিত কয়েকটি পূজার শিল্পসজ্জা দেখানো। মণ্ডপ, প্রতিমা এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পকর্মকে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরাই এই আয়োজনের প্রচারিত উদ্দেশ্য। সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, উদ্যোগটি শুরু হয় ২০২২ সালে। সেখানে আগাম নিবন্ধিত দর্শক ও সাংস্কৃতিক পর্যটকদের জন্য বাছাই করা পূজার শিল্পকর্ম দেখানোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। সেই আয়োজনকে ঘিরে অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

মাসআর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পরিচিতিতে বলা হয়েছে, বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরাই তাদের লক্ষ্য। সেখানে ইউনেসকোর সঙ্গে অংশীদারত্বে পূর্ববর্তী আয়োজনগুলি করার দাবিও রয়েছে। এই বক্তব্য সংস্থাটির নিজস্ব পরিচিতির অংশ; তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে দেওয়া নতুন বিবৃতি নয়।

মামলার সূত্রপাত চলতি বছরের জুনে কলকাতা পুলিশের কাছে জমা পড়া একটি অভিযোগ থেকে। অভিযোগকারী জয়দীপ মুখোপাধ্যায় একটি ভ্রমণ সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর। কলকাতার পুলিশ কমিশনারের কাছে দেওয়া অভিযোগে তিনি ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অনিয়মে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনেন। তাঁর দাবি, মাসআর্ট নিজেকে ইউনেসকোর পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছিল। অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই পরিচয় বিভ্রান্তিকর ছিল এবং সেই দাবির ভিত্তিতেই দর্শকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়।

ইডির বক্তব্যে অর্থের ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সংস্থাটি যে উদ্দেশ্যে টাকা সংগ্রহ করেছিল, তার পরিবর্তে সেই অর্থ ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। এই অভিযোগের নিষ্পত্তিতে আয়ব্যয়ের হিসাব, অর্থপ্রাপ্তির নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারও যোগাযোগ থাকা এবং বেআইনি লেনদেনে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযানে একাধিক ঠিকানা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার খবর থেকেও প্রত্যেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর একাধিক ধারায় মামলা রুজু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩১৬(২), ৩১৮(৪) এবং ৩৩৬ ধারা—যথাক্রমে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা এবং জালিয়াতির অভিযোগসংক্রান্ত বিধান। পুলিশের মামলায় অর্থ সংগ্রহের সময় কোনও মিথ্যা পরিচয় বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং সংগৃহীত অর্থের অপব্যবহার হয়েছিল কি না, সেই অভিযোগগুলি উঠে এসেছে। এখন সেই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে অর্থপাচারের যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ইডি।

ইউনেসকোর নাম ব্যবহারের প্রসঙ্গে একটি প্রাসঙ্গিক তথ্যও রয়েছে। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেসকোর মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় স্থান পায়। পাশাপাশি ইউনেসকোর নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক ওয়েবসাইটে ‘প্রিভিউ শো ২০২৩ অব দুর্গাপূজা আর্ট—কলকাতা’ নামে একটি অনুষ্ঠানের বিবরণ রয়েছে, যেখানে আয়োজক হিসেবে মাসআর্টের উল্লেখ দেখা যায়। ফলে ইউনেসকোর সঙ্গে সংস্থাটির সম্পর্কের প্রকৃতি বিচার করতে নির্দিষ্ট নথি প্রয়োজন। ওয়েবসাইটে কোনও অনুষ্ঠানের উল্লেখ থাকা থেকেই সব অর্থসংগ্রহ বা পৃষ্ঠপোষকতার দাবির অনুমোদন প্রতিষ্ঠিত হয় না।

একইভাবে, দুর্গাপূজার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া এবং কোনও নির্দিষ্ট সংস্থার বাণিজ্যিক বা আর্থিক কার্যকলাপের অনুমোদন পাওয়া পৃথক বিষয়। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে দর্শকদের কাছে ঠিক কী দাবি করা হয়েছিল, সেই দাবির নথিগত ভিত্তি কী এবং সংগৃহীত অর্থ কোথায় গিয়েছে। এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া ইউনেসকোর নামের উপস্থিতিকেই অপরাধের প্রমাণ অথবা দায়মুক্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা সঙ্গত হবে না। তদন্তে প্রতিষ্ঠানের প্রচারপত্র ও বাস্তব আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে মিল ছিল কি না, সেটিও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।

অভিযান সম্পর্কে ইন্দ্রনীল সেনের এক আত্মীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তল্লাশির কথা তাঁরা শুনেছেন এবং সমস্ত নথি পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। এটি পরিবারের এক সদস্যের প্রতিক্রিয়া; অভিযোগের প্রতিটি দিক নিয়ে প্রাক্তন মন্ত্রী বা মাসআর্টের বিস্তারিত জবাব হিসেবে একে ধরা যায় না। সেই পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এবং তদন্তকারীদের নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে এলে অভিযোগ ও প্রতিপক্ষের ব্যাখ্যা তুলনা করার সুযোগ আরও স্পষ্ট হবে।

ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও উল্লেখযোগ্য। তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারে পর্যটনমন্ত্রী ছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে জুন মাসে পুলিশের কাছে অভিযোগ জমা পড়ে; সেপ্টেম্বরের শেষে সেই অভিযোগের সূত্রে ইডির তল্লাশি হলো। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ক্রম নিজে কোনও অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করে না। এখন মূল বিষয় হলো, অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবহারের নথি কী বলছে এবং সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যার সঙ্গে তা কতটা মিলছে। তল্লাশি তদন্তের একটি পদক্ষেপ; অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়।