বীরভূমের বোলপুরে বিজেপির বুথস্তরের নেতা চন্দন ভল্লাকে গুলি করে খুনের ঘটনায় তদন্তে নামল সিআইডি ও রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে হামলার পর সোমবার বিশেষজ্ঞ দলগুলি জেলা পুলিশের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে এই দুই সংস্থাকে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুবরাজপুরের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা।

ঘটনাটি ঘটে বোলপুরের ত্রিশূলাপট্টি এলাকায়। পরিবারের বক্তব্য, অপরিচিত কারও ফোন পেয়ে চন্দন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। তার পরেই তাঁর উপর হামলা হয়। প্রাথমিক তদন্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা জানালেও পুলিশ প্রথমে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষার কথা বলেছিল। বিজেপির বোলপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল জানান, চন্দন দলের পুরনো ও সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ঘটনার পরেই তিনি পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী, মোটরবাইকে এসে দুই আততায়ী খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে পালায়। চন্দনের মাথায় একটি গুলি লেগেছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হামলাকারীদের শনাক্ত করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইলের তথ্য এবং সম্ভাব্য যাতায়াতের পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি সিসিটিভি না থাকায় তদন্তে অসুবিধার কথাও উঠে এসেছে। আলামত যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য ঘটনাস্থল ঘিরে রেখে ছাউনির ব্যবস্থাও করেছে পুলিশ।

চন্দন বোলপুর পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ২০২ নম্বর বুথের বিজেপি সভাপতি ছিলেন। তিনি ভূমি ও ভূমিসংস্কার দফতরে করণিকের কাজ করতেন এবং জমি কেনাবেচার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এক সম্ভাব্য ক্রেতাকে জমি দেখানোর জন্য তিনি বেরিয়েছিলেন কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তে এসেছে। তাঁর ছোট ছেলে শুভ্রকান্তি বোলপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে নির্দিষ্ট কারও নাম নেই।

সোমবার ছয় সদস্যের ফরেন্সিক দল ঘটনাস্থল থেকে রক্তসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে। মোটরবাইকের চাকার দাগ এবং পায়ের ছাপও পরীক্ষা করা হয়। কোন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, কতটা দূর থেকে গুলি চালানো হয় এবং অস্ত্র কোথা থেকে এসেছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজের পাশাপাশি চন্দনের ফোনের কল রেকর্ড ও শেষ কথোপকথনের তথ্যও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

চন্দনের স্ত্রী শ্যামলীর অভিযোগ, তাঁর স্বামীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়েছে। পরিবারের সন্দেহ, এর পিছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। তবে পুলিশ এখনও সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি। রাজনৈতিক শত্রুতার পাশাপাশি জমি লেনদেন ঘিরে কোনও বিরোধ ছিল কি না, তা-ও দেখা হচ্ছে। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকটি সূত্র মিলেছে; তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত প্রকাশ করা হচ্ছে না।

ধ্রুব সাহা জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী দলীয় নেতৃত্বকে নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার ময়নাতদন্তের পরে চন্দনের দেহ বাড়িতে পৌঁছলে স্থানীয় মানুষ ও বিজেপি নেতারা সেখানে যান। এলাকায় উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আততায়ীদের খোঁজে তল্লাশির পাশাপাশি বোলপুরে নজরদারি ও টহলও বাড়ানো হয়েছে। সোমবার প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, তখনও কাউকে আটক করা হয়নি।

শ্যামাপদ মণ্ডলের বক্তব্যে দলীয় কর্মীর মৃত্যুতে ক্ষোভের সঙ্গে দ্রুত পুলিশি পদক্ষেপের দাবিও উঠে এসেছে। তিনি ঘটনার পরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। পরিবারের কাছে এখন প্রধান দাবি অপরাধীদের গ্রেফতার ও শাস্তি। তবে ফোন করে ডেকে পাঠানোর অভিযোগ থেকে হামলাকারীদের পরিচয় পর্যন্ত একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া বাকি। চন্দন কেন নিশানা হলেন, সেই প্রশ্নও অমীমাংসিত।

তদন্তের এই পর্যায়ে পরিবারের সন্দেহ এবং পুলিশের প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি। নিহতের রাজনৈতিক পরিচয় জানা গেলেও হত্যার উদ্দেশ্য এখনও নিশ্চিত নয়। সংগৃহীত নমুনা, ফোনের তথ্য এবং সাক্ষীদের বয়ান মিলিয়ে ঘটনার যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করাই এখন তদন্তের মূল চ্যালেঞ্জ।