এসআরএফটিআইয়ে সংঘর্ষের পর পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে এফআইআর, বহিরাগত হামলার অভিযোগও

যা জানা জরুরি
- আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে সংঘর্ষের পরদিন কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের পড়ুয়াদের বিরুদ্ধেই স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করল পুলিশ।
- দু’টিতে অভিযুক্ত অজ্ঞাতপরিচয় পড়ুয়ারা, অন্যটিতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা।
- রবিবারের হিংসার পরে সোমবারও ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে সংঘর্ষের পরদিন কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের পড়ুয়াদের বিরুদ্ধেই স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করল পুলিশ। ঘটনায় মোট তিনটি এফআইআর হয়েছে। দু’টিতে অভিযুক্ত অজ্ঞাতপরিচয় পড়ুয়ারা, অন্যটিতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা। রবিবারের হিংসার পরে সোমবারও ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছিল। পড়ুয়ারা বি আর আম্বেদকরের ছবি নিয়ে নীরব প্রতিবাদ জানান।
পুলিশের দায়ের করা মামলায় অভিযোগ, পড়ুয়ারা পুলিশকর্মীদের আটকে কাজে বাধা দিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেছেন এবং সরকারি গাড়ির কাচ ভেঙেছেন। আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের অভিযোগের ভিত্তিতে দ্বিতীয় মামলাটি হয়েছে। সংগঠনের রাজ্য নেতা অঞ্জন সিংহের দাবি, রবিবার দুপুর ২টো ১৫ থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত তাঁদের সদস্যদের ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। মহিলা কর্মীদের অসম্মান এবং ভারতমাতা, দুর্গা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি ভাঙচুরের অভিযোগও করেছেন তিনি।
তৃতীয় এফআইআরটি হয়েছে প্রতিষ্ঠানের ফিল্ম বিভাগের ডিন সুকান্ত মজুমদারের অভিযোগে। তাঁর বক্তব্য, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা পড়ুয়া এবং দুই শিক্ষককে আটকে মারধর করেছে; ছাত্রীদের অসম্মান ও হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে এবং সংঘর্ষের সূত্রপাত বুঝতে সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষা করছে পুলিশ। অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।
সংঘর্ষের সূত্রপাত রবিবার বিকেলে। প্রতিষ্ঠানের মূল প্রেক্ষাগৃহে গ্রাহক পঞ্চায়েতের অনুষ্ঠান আয়োজনের বিরোধিতা করেন পড়ুয়াদের একাংশ। ছাত্র সংসদের অভিযোগ, আপত্তি জানাতেই তাঁদের দেশবিরোধী, শহুরে নকশাল এবং সন্ত্রাসবাদী বলে আক্রমণ করা হয়। তার পরে শুরু হয় মারধর। ছাত্রীদেরও ঘুষি ও লাথি মারা হয় বলে অভিযোগ। ইটপাথর ছোড়া এবং ক্যাম্পাসের ভিতরে পড়ুয়াদের তাড়া করার কথাও জানিয়েছে ছাত্র সংসদ। তাদের দাবি, যাঁরা প্রতিবাদে ছিলেন না, নিজেদের পড়াশোনার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তাঁরাও রেহাই পাননি।
ছাত্র সংসদের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকজন পড়ুয়া আত্মরক্ষার জন্য গ্রন্থাগারে আশ্রয় নেন। হামলাকারীরা সেখানেও পৌঁছে যায়; গ্রন্থাগারিককেও মারধর করা হয়। বাইরে থেকে জমায়েত হওয়া লোকজন ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করে এবং ভিতরে পাথর ও বোতল ছোড়ে বলে পড়ুয়াদের অভিযোগ। পরিস্থিতির মধ্যে তাঁরা মূল ফটক বন্ধ করে দেন। বাইরে বিক্ষুব্ধ জমায়েত থাকায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। রাত পর্যন্ত উত্তেজনা চলতে থাকে। ১৯৯৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। সত্যজিৎ রায়ের নামাঙ্কিত দেশের অন্যতম প্রধান চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে এমন সংঘর্ষ তাই পড়ুয়াদের নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানের অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পড়ুয়ারা। ছাত্র প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি; রবিবার সকালেই তাঁরা অনুষ্ঠানের কথা জানতে পারেন। ছাত্র প্রতিনিধি নচিকেতের দাবি, বিষয়টি নিয়ে রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও উত্তর মেলেনি। চলচ্চিত্র শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট পরিসরে এমন সংগঠনের অনুষ্ঠান কেন হবে, সেটিই তাঁদের আপত্তি। ডিন অবশ্য জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের নীতি মেনেই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। শান্তি ফেরানো এবং পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন উপাচার্য সন্তোষ আজমেরা। নচিকেত আরও জানিয়েছেন, তাঁদের ছাত্র সংগঠন কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের শাখা নয়। পড়ুয়াদের এসএফআইয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর বিরোধিতা করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ছাত্রকল্যাণের জন্য কাজ করা একটি সক্রিয় ছাত্র সংসদের প্রতিবাদকে ভুলভাবে রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়া হচ্ছে।
গ্রাহক পঞ্চায়েত পড়ুয়াদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনের বক্তব্য, ক্রেতাদের অধিকার ও আইন সম্পর্কে কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছিল। নিয়ম মেনে টাকা দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ নেওয়া হয়। তাদের দাবি, পড়ুয়ারাই প্রথমে সংগঠনের পোস্টারের উপর নিজেদের পোস্টার সাঁটেন, অনুষ্ঠান বন্ধ করার চেষ্টা করেন এবং উপস্থিত সদস্যদের আক্রমণ করেন। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বিজয় সাগরের বক্তব্য, তাঁদের উপর হামলার পরেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া হয়। তবে তাঁদের সদস্যদের পাথর ছোড়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
ঘটনায় রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিংসা বরদাস্ত করা হবে না। একই সঙ্গে বিবেকানন্দ বা ভারতমাতার ছবির অবমাননার অভিযোগ উল্লেখ করেছেন তিনি। এবিভিপি অবশ্য জানিয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই।
ঘটনার প্রতিবাদে বর্তমান পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনীরাও। পরিচালক অভিজিৎ সেন রবিবার ক্যাম্পাসে যান এবং হাসপাতালে আহত পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর প্রশ্ন, চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কহীন বাইরের অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিষ্ঠানের জায়গা ভাড়া দেওয়ার প্রয়োজন কী? পড়ুয়াদের প্রতিবাদের জবাবে হিংসা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও জানিয়েছেন তিনি। পরিচালক জয়ব্রত দাসের বক্তব্য, প্রকাশিত ভিডিয়োয় পড়ুয়াদের আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে; সমস্ত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
একই প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন শিক্ষক ও পরিচালক অভিজিৎ দাশগুপ্ত। তাঁর আপত্তি, উন্নত পরিকাঠামোযুক্ত চারশো আসনের মূল প্রেক্ষাগৃহ চলচ্চিত্রের বাইরের অনুষ্ঠানে ভাড়া দেওয়া নিয়ে। পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ও প্রতিষ্ঠানের চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনুষ্ঠান বাছাইয়ের কথা বলেছেন। প্রাক্তনী ত্রিবেণী রাইয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে আক্রান্ত পরিচিত পড়ুয়াদের জন্য উদ্বেগ এবং চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের সৃজনশীল পরিসর রক্ষার প্রয়োজন। ফলে সংঘর্ষের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের অনুষ্ঠান অনুমোদনের সিদ্ধান্তটিও আলোচনায় এসেছে।
আহতের সংখ্যা ও আঘাতের গুরুত্ব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে অমিল রয়েছে। পড়ুয়ারা গুরুতর আঘাতের অভিযোগ করেছেন; গ্রাহক পঞ্চায়েতও নিজেদের সদস্যদের হাসপাতালে ভর্তির দাবি করেছে। এই অবস্থায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান, চিকিৎসার নথি এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ভিডিয়ো মিলিয়ে দেখা জরুরি। ক্যাম্পাসে কারা প্রবেশ করেছিলেন, কোথায় প্রথম হামলা হয়েছিল এবং তার পরে কীভাবে হিংসা ছড়াল—তদন্তে এই প্রশ্নগুলির উত্তর প্রয়োজন। পড়ুয়াদের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানই এখন প্রতিষ্ঠানের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।
আরও লেখা →সম্পর্কিত প্রতিবেদন
খবরনির্বাচন কমিশনারকে ‘চাপ’ দেওয়ার অভিযোগ, মোদীর পদত্যাগ চাইলেন খাড়্গে
সেপ্টেম্বর 29, 2026
খবরকানহাইয়াকে কেন ডেকে পাঠালেন রাহুল, কী জানতে চাইলেন?
সেপ্টেম্বর 29, 2026
খবরসার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দশ বছর: বদলেছে জঙ্গি তৎপরতার ভূগোল, পাল্টেছে ভারতের প্রত্যাঘাতের কৌশল
সেপ্টেম্বর 29, 2026
খবরটানাপোড়েনেও এসসিও-তে ভারত
সেপ্টেম্বর 29, 2026দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে
বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।