International

বডলিয়ানের পাতায় এআই

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • অক্সফোর্ডের ঐতিহাসিক বইয়ের পাতায় এবার ‘পাঠ’ নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
  • চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইকে বডলিয়ান গ্রন্থাগারের বিরল ও পুরনো বইপত্র ডিজিটাল রূপে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সেই ডিজিটাল উপকরণের একটি অংশ ইতিমধ্যেই ওপেনএআইয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণে যুক্ত হয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

অক্সফোর্ডের ঐতিহাসিক বইয়ের পাতায় এবার ‘পাঠ’ নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইকে বডলিয়ান গ্রন্থাগারের বিরল ও পুরনো বইপত্র ডিজিটাল রূপে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেই ডিজিটাল উপকরণের একটি অংশ ইতিমধ্যেই ওপেনএআইয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণে যুক্ত হয়েছে। আর তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন—বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থাগারের জ্ঞানভান্ডার কি এবার এআইয়ের প্রশিক্ষণসামগ্রী?

২০২৫ সালের মার্চে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে অংশীদারির কথা ঘোষণা করেছিল অক্সফোর্ড। তখন বলা হয়েছিল, সংস্থাটির প্রযুক্তি ব্যবহার করে বডলিয়ানের ঐতিহাসিক বইপত্র ডিজিটাল রূপে সংরক্ষণ করা হবে। এতে ছাত্রছাত্রী ও গবেষকেরা আরও সহজে সেই সব দুর্লভ লেখা ব্যবহার করতে পারবেন।

তবে সেই ঘোষণায় বলা হয়নি, ডিজিটাল করা উপকরণ ওপেনএআইয়ের মডেল প্রশিক্ষণের কাজেও ব্যবহার করবে।

অভ্যন্তরীণ নথি থেকে জানা যাচ্ছে, বডলিয়ানের যে সব উপকরণ ইতিমধ্যে ডিজিটাল করা হয়েছে, তার কিছু অংশ ওপেনএআইয়ের প্রশিক্ষণ-তথ্যসম্ভারে যুক্ত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ লেখা বিশ্লেষণ করেই এ ধরনের মডেল শব্দের বিন্যাস, বাক্যের কাঠামো এবং বিভিন্ন ধারণার পারস্পরিক সম্পর্ক চিনতে শেখে। পরে সেই শেখা প্যাটার্নের ভিত্তিতেই তারা লেখা তৈরি ও নানা ভাষাভিত্তিক কাজ করতে পারে।

ওপেনএআইয়ের এক মুখপাত্রের দাবি, ‘আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলি যাতে ভবিষ্যতের জন্য বিশ্বের ঐতিহাসিক জ্ঞান সংরক্ষণ করতে পারে’, তা নিশ্চিত করতে পেরে সংস্থা ‘গর্বিত’। তাঁর কথায়, প্রতিদিন একশো কোটিরও বেশি মানুষ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। তাই এআইয়ের মধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন থাকা জরুরি।

তবে অক্সফোর্ডের অন্দরমহলে সংশয়ও ছিল। তথ্য জানার অধিকার আইনে পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে কর্মীদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। বডলিয়ানের পরিচালন কমিটির সদস্যদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, ওপেনএআইয়ের সঙ্গে এই অংশীদারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামে কোনও ঝুঁকি তৈরি করবে কি না। একই সঙ্গে বিপুল শক্তি খরচকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সঙ্গে এমন চুক্তি অক্সফোর্ডের পরিবেশরক্ষার অঙ্গীকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এদিকে পুরনো বইয়ের বাজারেও দেখা যাচ্ছে অদ্ভুত এক পরিবর্তন। বই বিক্রেতাদের কাছে অল্পপরিচিত কিছু পুরনো বইয়ের চাহিদা হঠাৎ বেড়েছে। তালিকায় রয়েছে অষ্টাদশ শতকের আফ্রিকায় ব্যবহৃত কৃষিযন্ত্রের নির্দেশিকা থেকে শুরু করে ১৯৫০-এর দশকের গাড়িচালকদের জীবনী। পুরনো বইয়ের দোকানের মালিকদের অনুমান, অনলাইনে এসব বইয়ের ডিজিটাল কপি সহজে পাওয়া যায় না বলেই হয়তো এগুলির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। আর সেই বইগুলিই ভবিষ্যতের এআই মডেলের কাছে হয়ে উঠতে পারে নতুন তথ্যের উৎস।

কারণ, এআইয়ের জন্য এত দিন তথ্যের অন্যতম বড় উৎস ছিল ওয়েব। কিন্তু এখন সেই ওয়েবেই তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ এআই-নির্মিত লেখা। ফলে ওয়েবসাইট থেকে নতুন, নির্ভরযোগ্য ও মানুষের লেখা তথ্য সংগ্রহের উপযোগিতা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই মডেল নির্মাতাদের নজর ঘুরছে এমন সব বইয়ের দিকে, যেগুলি এখনও ডিজিটাল দুনিয়ায় সহজলভ্য নয়।

এই কারণেই ওপেনএআইয়ের ‘নেক্সটজেনএআই’ প্রকল্পে আমেরিকার একাধিক গবেষণামূলক গ্রন্থাগারও যুক্ত হয়েছে। তালিকায় রয়েছে বস্টন পাবলিক লাইব্রেরি, ক্যালটেক, এমআইটি এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়। ব্রিটেন থেকে এই প্রকল্পের একমাত্র সদস্য অক্সফোর্ড।

২০২৫ সালের জুনের মধ্যে বডলিয়ানের সংগ্রহ থেকে পুরনো গবেষণাপত্র স্ক্যান করে তৈরি প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার ছবি ওপেনএআইকে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা পিএইচডি গবেষণাপত্র। পাশাপাশি ডিজিটাল রূপ দেওয়া হয়েছে ষোড়শ শতকের প্রায় ১০ হাজার ‘ব্রডসাইড ব্যালাড’-এর বিরল সংগ্রহকে। এক পাতায় ছাপা এই গীতিকাগুলিতে থাকত গানের কথা ও স্বরলিপি; টিউডর যুগে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এগুলি প্রচারিত হত।

অষ্টাদশ শতকের আইরিশ রাষ্ট্রীয় নথিপত্র, আইরিশ ঔপন্যাসিক মেরি এজওর্থের ব্যক্তিগত চিঠি এবং পেনিসিলিন গবেষণায় নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ডরোথি হজকিনের গবেষণার খাতাগুলিও ডিজিটাল করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

চুক্তির আওতায় বডলিয়ানের প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ উপকরণের বিশাল সংগ্রহকে আরও বড় পরিসরে ডিজিটাল রূপ দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈঠকে ‘আস্ক দ্য বড’ নামে প্রশ্নোত্তরভিত্তিক একটি কথোপকথন-ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।

তবে অক্সফোর্ডের দাবি, ডিজিটাল করার কাজের পরিসর আপাতত ‘সীমিত’। কেবল সেই সব লেখাই এর আওতায় আসছে, যেগুলির কপিরাইট সুরক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। স্ক্যান করা প্রতিলিপির অধিকার বডলিয়ানের কাছেই থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কয়েক মাসের মধ্যেই এই উপকরণ সাধারণ মানুষের জন্য অনলাইনে প্রকাশ করা শুরু হবে।

অর্থাৎ, বডলিয়ানের বহু শতকের পুরনো পাতাগুলি এবার শুধু গবেষকের চোখেই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘চোখেও’ পড়ছে। প্রশ্নটা তাই শুধু ডিজিটাইজেশনের নয়—ঐতিহাসিক জ্ঞান যখন এআইয়ের শেখার উপকরণ হয়ে ওঠে, তখন সেই জ্ঞানের ব্যবহার, অধিকার এবং সীমারেখা কোথায়, সেটিও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles