গিলোটিনের চত্বরে পোপের প্রার্থনা

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন একদা যেখানে গিলোটিনে ঝরেছিল রাজা-প্রজার রক্ত, শনিবার সেই চত্বরই ভরে উঠল প্রার্থনা আর ধর্মীয় উচ্ছ্বাসে।
- প্যারিসের প্লাস দ্য লা কঁকর্দে পোপ লিওর উন্মুক্ত প্রার্থনাসভায় জড়ো হলেন প্রায় সাত লক্ষ মানুষ।
- ফ্রান্স সফরের দ্বিতীয় দিনে এটাই ছিল তাঁর সফরের সবচেয়ে বড় আয়োজন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন
একদা যেখানে গিলোটিনে ঝরেছিল রাজা-প্রজার রক্ত, শনিবার সেই চত্বরই ভরে উঠল প্রার্থনা আর ধর্মীয় উচ্ছ্বাসে। প্যারিসের প্লাস দ্য লা কঁকর্দে পোপ লিওর উন্মুক্ত প্রার্থনাসভায় জড়ো হলেন প্রায় সাত লক্ষ মানুষ। ফ্রান্স সফরের দ্বিতীয় দিনে এটাই ছিল তাঁর সফরের সবচেয়ে বড় আয়োজন।
ভ্যাটিকানের হিসাব অনুযায়ী, ৭১ বছর বয়সি মার্কিন পোপের প্রার্থনাসভায় উপস্থিতির সংখ্যা প্রায় সাত লক্ষ। আগাম নাম নথিভুক্ত করেছিলেন যত জন, তার চেয়েও প্রায় এক লক্ষ বেশি মানুষ শেষ পর্যন্ত সমাবেশে যোগ দেন।
কিন্তু এই বিপুল জনসমাগমের পাশাপাশি জায়গাটিই তৈরি করেছে অন্য এক আলোচনার। ফরাসি বিপ্লবের সময় প্লাস দ্য লা কঁকর্দে ছিল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অন্যতম প্রধান স্থান। এখানেই গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল বহু মানুষকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্যাথলিক ধর্মে গভীর বিশ্বাসী ফরাসি রাজা ষোড়শ লুইও। সেই বিপ্লবই শেষ করেছিল তাঁর শাসন।
আজ সেই একই চত্বর ধর্মনিরপেক্ষ ফরাসি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রতীক। ফলে সেখানে পোপের প্রার্থনাসভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্র-গির্জার কঠোর পৃথকীকরণের নীতির সমর্থকেরা।
তবে বিতর্ক ছাপিয়ে শনিবারের সমাবেশে ছিল উৎসবের আবহ। ধর্মোপদেশের সময় ফ্রান্স সফরের সুযোগ পেয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান পোপ। সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে জনতা।
১৮ বছর পর এই প্রথম কোনও পোপ আনুষ্ঠানিক সফরে ফ্রান্সে এলেন। চার দিনের সফরে তিনটি শহরে গিয়ে ক্যাথলিক ধর্ম ও তার শিক্ষা নিয়ে কথা বলছেন লিও। তাঁর কর্মসূচি ঠাসা—আর শনিবারের এই প্রার্থনাসভাই হয়ে উঠল সফরের সবচেয়ে বড় জনসমাগম।
উপস্থিত মানুষকে পোপ আহ্বান জানান, ধর্মবিশ্বাস যেন শুধু ব্যক্তিগত পরিসরে আটকে না থাকে। তাঁর কথায়, সেই বিশ্বাস যেন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, অন্যদের জীবনেও আশার সঞ্চার করে।
“সেই বিশ্বাস উপচে পড়ুক, যাতে আপনাদের সংস্পর্শে যাঁরা আসবেন, তাঁরা সঞ্জীবিত হন, তাঁদের তৃষ্ণা মেটে,” বলেন পোপ। “এই সুন্দর প্যারিস শহর থেকে আমি আন্তরিক প্রার্থনা জানাই, পবিত্র আত্মার জীবনদায়ী জল যেন গোটা ফ্রান্সে প্রবাহিত হয়।”
জাগতিক সম্পদের বদলে বিশ্বাসকেই প্রকৃত সুখের উৎস হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। পোপের ভাষায়, “একমাত্র ঈশ্বরই আমাদের অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারেন।”
পোপের সফর ঘিরে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও ছিল নজিরবিহীন। প্রার্থনাসভার জন্য প্রায় ২.২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয় নিরাপত্তাবলয়। প্লাস দ্য লা কঁকর্দ থেকে আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফ এবং তার পরের অংশ পর্যন্ত মধ্য প্যারিসের বিস্তীর্ণ এলাকায় যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
বিশেষ ভাবে তৈরি আংশিক খোলা গাড়িতে চড়ে শঁজেলিজের প্রশস্ত সড়ক ধরে এগিয়ে যান পোপ। রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ ফ্রান্স ও ভ্যাটিকানের পতাকা নাড়িয়ে স্লোগান দেন—“লিও, লিও”, “পোপ দীর্ঘজীবী হোন”।
বারবার থামেন পোপ। ভিড়ের মধ্য থেকে শিশুদের তুলে তাঁর কাছে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দেন তিনি। অন্য দিকে, শহরের কেন্দ্রজুড়ে নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো। আকাশে চক্কর কাটে হেলিকপ্টার, বাড়ির ছাদে মোতায়েন ছিলেন দূরপাল্লার নিশানায় প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মীরা।
নিরাপত্তা ও জরুরি পরিষেবার দায়িত্বে ছিলেন প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ পুলিশকর্মী, আধাসামরিক পুলিশ, সেনাসদস্য ও দমকলকর্মী। প্রার্থনাসভায় অংশ নেন প্রায় ২ হাজার ৪০০ যাজক ও সহকারী ধর্মসেবক এবং প্রায় ১০০ জন বিশপ।
বার্গান্ডি থেকে আসা ৪৪ বছর বয়সি সন্ন্যাসিনী মারি-এলিজাবেথ ফ্রান্স ২৪-কে বলেন, “এই সমাবেশের মাধ্যমে আমরা সগর্বে, জোর গলায় বলতে চাই—খ্রিস্টানরা এখানে আছেন।”
এএফপিকে ৫১ বছর বয়সি শিক্ষিকা সিলভি লেক্লের বলেন, নিজেদের ধর্মবিশ্বাসের উদ্দীপনা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চান তিনি ও তাঁর খ্রিস্টান সহধর্মাবলম্বীরা।
“আমরা ক্যাথলিকরা সাধারণত তেমন সরব হই না। কিন্তু এ বার আমাদের গলা শোনা যাবে!” বলেন তিনি। তবে সেই আওয়াজ যে ভালবাসা, শান্তি আর আনন্দের বার্তা দেবে, সেটিও স্পষ্ট করে দেন লেক্লের।
একই শহর, একই চত্বর—ইতিহাসের এক প্রান্তে গিলোটিন, অন্য প্রান্তে প্রার্থনা। প্যারিসের প্লাস দ্য লা কঁকর্দে শনিবার যেন সেই দুই সময়কেই পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



