কুকুর ধরার গাড়ি নয়, চিকিৎসার ভ্যান

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: ভোর হতেই রোমানিয়ার স্মেউরা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়ে একটি চিকিৎসার ভ্যান।
- উদ্দেশ্য কুকুর ধরে নিয়ে যাওয়া নয়, বরং বিনা খরচে তাদের নির্বীজন করানো।
- ক্যাতেয়াস্কায় এমনই এক কর্মসূচিতে নিজের তিনটি কুকুর নিয়ে এসেছিলেন ইউলিয়ান স্তোইকা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: ভোর হতেই রোমানিয়ার স্মেউরা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়ে একটি চিকিৎসার ভ্যান। গন্তব্য আশপাশের গ্রাম। উদ্দেশ্য কুকুর ধরে নিয়ে যাওয়া নয়, বরং বিনা খরচে তাদের নির্বীজন করানো। ক্যাতেয়াস্কায় এমনই এক কর্মসূচিতে নিজের তিনটি কুকুর নিয়ে এসেছিলেন ইউলিয়ান স্তোইকা। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের মাঠপ্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চলমান উদ্যোগের ছবি।
আয়োজকদের হিসাবে, ২০২৫ সালে ৩৭,৯৮৬টি নির্বীজন হয়েছিল। চলতি বছরের ওই সময় পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজারে পৌঁছেছে বলেও তাঁদের দাবি। অর্থাৎ এটি সেপ্টেম্বরেই শুরু হওয়া কোনও নতুন প্রকল্প নয়। নতুন খবর হল, উদ্যোগটি এখন কতটা বিস্তৃত এলাকায় পৌঁছচ্ছে এবং পথকুকুর নিয়ন্ত্রণে নির্বীজনভিত্তিক পদ্ধতিকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আশ্রয় নয়, উৎসে নজর
স্মেউরার ঠিকানাটিরও একটি পুরনো ইতিহাস আছে। পিতেশ্তির কাছে বনাঞ্চলের প্রায় পাঁচ হেক্টর জায়গাটি একসময় ছিল শিয়াল পালনের খামার। জার্মান প্রাণীকল্যাণ সংগঠন টিয়ারহিলফে হফনুং ২০০৫ সালে জমিটি কেনে। সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন সেখানে ছয় হাজারের বেশি কুকুর এবং কয়েকশো বিড়াল রয়েছে।
আহত, অসুস্থ বা পরিত্যক্ত প্রাণীকে আশ্রয় দেওয়া অবশ্যই কাজের একটি অংশ। কিন্তু সংগঠনটির নজর আরেক জায়গাতেও—নতুন প্রাণী জন্মানোর প্রবাহ কমানো।
পুরনো একটি অ্যাম্বুল্যান্সকে বদলে তৈরি করা হয়েছে চলমান চিকিৎসাকেন্দ্র। গ্রামের মানুষ আগে থেকে জায়গা ও তারিখ জেনে নাম লেখাতে পারেন। দূরের এলাকায় স্থানীয় পশুচিকিৎসকদের সঙ্গেও কাজ করা হয়। শুধু পথকুকুর নয়, মানুষের পোষা কুকুরও এই পরিষেবা পায়।
আয়োজকদের যুক্তি, গ্রাম ও বাড়িতে অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন থেকেই পরে বহু কুকুর রাস্তায় এসে পড়ে। তাই রাস্তায় দেখা প্রাণী সরিয়ে নিলেই সমস্যার উৎস বন্ধ হয় না। নির্বীজন সেই উৎসে পৌঁছনোর একটি চেষ্টা। তবে এটি আয়োজকদের ব্যাখ্যা; দেশজুড়ে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করা কোনও স্বাধীন ফলাফল-সমীক্ষা নয়।
সংখ্যা আছে, কিন্তু ফল আলাদা
স্মেউরায় একটি স্থায়ী নির্বীজন ও নিবন্ধনকেন্দ্রও চালু হয়েছে ২০২৪ সালের এপ্রিলে। পাশাপাশি স্কুলে প্রাণীর প্রতি আচরণ ও দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষামূলক কাজ করা হয়।
সংগঠনটির প্রকাশিত ২০২৫ সালের হিসাবে ৩৭,৯৮৬টি নির্বীজন হয়েছে এবং ২,৭৮৭টি কুকুর নতুন বাড়ি পেয়েছে। বর্তমান ওয়েবসাইটে ১৪২ জন কর্মী ও প্রতিদিন প্রায় ২,৮০০ কিলোগ্রাম খাবারের প্রয়োজনের কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ দত্তক দেওয়ার কাজ বন্ধ হয়নি। তার পাশাপাশিই চলছে নতুন করে রাস্তায় আসা প্রাণীর সংখ্যা কমানোর চেষ্টা।
তবে এই সংখ্যাগুলি সংগঠনটির নিজস্ব প্রশাসনিক হিসাব। স্বাধীনভাবে নিরীক্ষিত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে এগুলিকে দেখা ঠিক হবে না। আর এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—কত অস্ত্রোপচার হল, সেটি কাজের পরিমাণ; সমস্যাটি কতটা কমল, সেটি ফলাফল।
আশ্রয়েই কি নিরাপত্তা?
নির্বীজনভিত্তিক পদ্ধতির পটভূমিতে রোমানিয়ার আশ্রয়কেন্দ্রগুলির পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ১৫ মে প্রকাশিত এপি-র প্রতিবেদনে প্রাণীকল্যাণ সংগঠন ফোর পজের নয়টি রোমানীয় কেন্দ্র পরিদর্শনের ফল উঠে এসেছিল। সেখানে অতিরিক্ত ভিড়, চিকিৎসাহীন ক্ষত এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগ করা হয়।
পরিদর্শনটি হয়েছিল জানুয়ারিতে। ফলে সেটিকে সেপ্টেম্বরের নতুন কোনও ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না। আবার নয়টি কেন্দ্রের অবস্থা দিয়ে দেশের সব আশ্রয়কেন্দ্রের পরিস্থিতিও বিচার করা যায় না। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—রাস্তায় নেই মানেই নিরাপদে আছে, এমন সমীকরণও সবসময় ঠিক নয়।
স্মেউরার প্রস্তাবিত মডেলে তাই ধরা, নির্বীজন, টিকা এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে আবার এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। আশ্রয় ও দত্তক তার সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়।
ভ্যান পৌঁছচ্ছে যেখানে
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বাস্তব দিকটি হয়তো প্রযুক্তি নয়, দূরত্ব কমানো। কোনও গ্রামের মালিককে যদি কুকুর নিয়ে বহু দূরের শহরে যেতে হয়, চিকিৎসার খরচ ও যাতায়াতের ঝামেলাও থাকে, তাহলে শুধু সচেতনতার বার্তা সবসময় যথেষ্ট নাও হতে পারে।
চিকিৎসার ভ্যান সেই বাধাটাই কমানোর চেষ্টা করছে। পরিষেবা যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর নজরদারি, টিকাকরণ, নিরাপদ পরিচর্যা এবং প্রাণীটির পরবর্তী অবস্থার তথ্য না থাকলে এই ব্যবস্থার পূর্ণ ফল বোঝা কঠিন।
বিশ্লেষণ
পথকুকুরের প্রশ্নটি একই সঙ্গে প্রাণীকল্যাণ এবং জননিরাপত্তার প্রশ্ন। শিশু ও পথচারীর নিরাপত্তা, কামড়ের ঘটনা, টিকার আওতা এবং অন্য প্রাণীর সুরক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই অকারণ নিষ্ঠুরতা এড়ানোও জরুরি।
তাই কোনও একটি সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপা কঠিন। কত কুকুর অস্ত্রোপচার পেল, তার সঙ্গে দেখতে হবে নতুন ছানা জন্মের হার, পুনরায় পরিত্যাগ, কামড়ের ঘটনা, টিকার আওতা এবং আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ বদলাল কি না। দীর্ঘমেয়াদে কোনও এলাকায় কম প্রাণীর আশ্রয় প্রয়োজন হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
স্মেউরার ভ্যানগুলি আপাতত সেই পথেই বেরোচ্ছে—কুকুর ধরতে নয়, সমস্যার উৎসে পৌঁছতে। কাজটি কতটা সফল হবে, তার উত্তর দেবে পরের হিসাব।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



