ধার করা দেশে ফিরল ইতিহাস

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: মেক্সিকো সিটির জাতীয় নৃতত্ত্ব জাদুঘরের কাচঘেরা প্রদর্শনীতে খোলা একটি পুরনো বই।
- দেখা যাচ্ছে মূল পাণ্ডুলিপির মাত্র দুটি পৃষ্ঠা; বাকি ছবিগুলি প্রতিলিপিতে।
- বইটি আজকাতিতলান কোডেক্স—আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর, শাসন এবং স্পেনীয় দখলের ইতিহাস ছবিতে ধরে রাখা এক গুরুত্বপূর্ণ চিত্রপাণ্ডুলিপি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: মেক্সিকো সিটির জাতীয় নৃতত্ত্ব জাদুঘরের কাচঘেরা প্রদর্শনীতে খোলা একটি পুরনো বই। আলো মৃদু, সামনে দর্শক। দেখা যাচ্ছে মূল পাণ্ডুলিপির মাত্র দুটি পৃষ্ঠা; বাকি ছবিগুলি প্রতিলিপিতে। বইটি আজকাতিতলান কোডেক্স—আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর, শাসন এবং স্পেনীয় দখলের ইতিহাস ছবিতে ধরে রাখা এক গুরুত্বপূর্ণ চিত্রপাণ্ডুলিপি। প্রায় দুই শতাব্দী পর সেটি আবার মেক্সিকোয়। তবে এই প্রত্যাবর্তনের পাশে একটি শব্দ না রাখলেই নয়—ধার।
১৮ সেপ্টেম্বর থেকে সাধারণ দর্শকের জন্য প্রদর্শনীটি খুলেছে। আগের দিন উদ্বোধনী আয়োজনের ছবি প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই ফেরা স্থায়ী নয়; ডিসেম্বর পর্যন্ত পাণ্ডুলিপিটি মেক্সিকোয় থাকবে। সেটি এসেছে ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারের সংগ্রহ থেকে। বিনিময়ে মেক্সিকোর বোতুরিনি কোডেক্স প্যারিসে প্রদর্শিত হওয়ার কথা। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের দুইশো বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সাংস্কৃতিক বিনিময়। তাই ঘটনাটিকে স্থায়ী মালিকানা হস্তান্তর বা প্রত্নসম্পদ ফেরতের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
পাণ্ডুলিপিটির ফ্রান্সযাত্রার ইতিহাসও ঔপনিবেশিক সংগ্রহের দীর্ঘ ছায়া বহন করে। ১৮৪০ সালে সংগ্রাহক জোসেফ অবাঁ এটি মেক্সিকো থেকে ফ্রান্সে নিয়ে যান। পরে মালিকানা বদলের পথ পেরিয়ে পাণ্ডুলিপিটি পৌঁছয় ফরাসি জাতীয় সংগ্রহে। এত বছর পর মেক্সিকোর দর্শক নিজের ভূখণ্ডের ইতিহাসের এই মূল নিদর্শনকে সামনে থেকে দেখার সীমিত সুযোগ পাচ্ছেন।
খোলা পাতাগুলিতে ধরা পড়ে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের আখ্যান। তাই এটি কোনও একক জাতির সরল ‘জন্মকাহিনি’ নয়। বরং একাধিক জনগোষ্ঠীর চলাচল, সংঘাত, সহাবস্থান ও ক্ষমতার বদলের গল্প।
পুরনো গল্প, নতুন বই
তবে আজকাতিতলান কোডেক্স স্পেনীয়দের আগমনের আগের কোনও অক্ষত দিনলিপি নয়। মেক্সিকোর বিজ্ঞান আকাদেমিতে প্রকাশিত গবেষণা দেখায়, এটি ঔপনিবেশিক যুগে তৈরি। আদিবাসী চিত্রভাষার সঙ্গে সেখানে ইউরোপীয় রীতির মিশ্রণ ঘটেছে। কাগজ, বইয়ের বিন্যাস এবং পরে যুক্ত হওয়া লেখাতেও সেই সংমিশ্রণের ছাপ রয়েছে।
অর্থাৎ পাতায় যে অতীতের ছবি দেখা যায়, ছবিগুলি সেই সময়ে আঁকা হয়নি। বিষয়বস্তুর সময় আর বস্তুটির তৈরির সময় এক নয়। এই পার্থক্যটি না বুঝলে পাণ্ডুলিপিটিকে সরাসরি প্রাক্-ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ‘জানালা’ হিসেবে দেখা সহজ, কিন্তু তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
গবেষণায় আখ্যানটিকে মোটামুটি তিন ভাগে দেখা হয়—আদি বাসস্থান থেকে স্থানান্তর, তেনোচতিতলানের শাসকদের ইতিহাস এবং ১৫১৯ সালে স্পেনীয়দের আগমনের পরের পরিবর্তন। রাজাদের ক্ষমতার চিহ্ন, যুদ্ধজয় এবং নগর নির্মাণের বিবরণের পাশাপাশি রয়েছে বহু ছোট চরিত্রের উপস্থিতিও।
স্পেনীয় দলের সামনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দেখা যায় মালিনৎসিনকে, যিনি মালিঞ্চে নামেও পরিচিত। ফলে ছবিগুলি শুধু বিজয়ীদের একরৈখিক বিজয়যাত্রা নয়। সেখানে যোগাযোগ, মধ্যস্থতা, অনুবাদ এবং অসম ক্ষমতার সম্পর্কও দৃশ্যমান।
পাতার আড়ালে মানুষ
পাণ্ডুলিপিটির সব অংশ অবশ্য অক্ষত নেই। কয়েকটি দৃশ্যের অংশ হারিয়ে গিয়েছে। ফলে কোনও কোনও ছবির অর্থ ব্যাখ্যা করতে গবেষকদের সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলতে হয়।
শিল্পরীতিতেও পার্থক্য চোখে পড়ে। স্পেনীয় দলের ছবিতে বর্মধারী নেতাদের পাশাপাশি দেখা যায় পিঠে বোঝা নেওয়া বাহকদের। ইতিহাসের বড় চরিত্ররা যখন সামনে উঠে আসেন, তখন তাঁদের খাদ্য, অস্ত্র ও সরঞ্জাম বহন করা মানুষগুলিও ছবির প্রান্তে হারিয়ে যাননি।
এই ছোটখাটো উপস্থিতিই পাণ্ডুলিপিটিকে শুধু রাজা, যুদ্ধ আর ক্ষমতার তালিকায় পরিণত হতে দেয় না।
বর্তমান প্রদর্শনীতে সেই বিস্তৃত আখ্যান বোঝাতে প্রতিলিপিও রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রতিলিপি আর মূল বস্তু এক নয়। কাচের ভিতরে সীমিত কয়েকটি আসল পৃষ্ঠা, আর বাইরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছবির পুনরুৎপাদনের মধ্যে যে দূরত্ব, প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে সেটিও।
বিশ্লেষণ
সাময়িক ধারকে স্থায়ী প্রত্যাবর্তন না বলেও এর গুরুত্ব বোঝা যায়। মূল পাণ্ডুলিপির কাছে স্থানীয় গবেষক, শিক্ষক ও সাধারণ দর্শকের পৌঁছনো নিঃসন্দেহে একটি বাস্তব সুযোগ। কিন্তু কয়েক মাসের প্রদর্শনী দীর্ঘ বিদেশবাসের প্রশ্নটির সমাধান করে না।
কোনও ঐতিহাসিক সংগ্রহ কোথায় থাকবে, কারা সেটি নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন, মূল বস্তু কতটা সহজে দেখা যাবে এবং তার ছবির পুনরুৎপাদন কার হাতে থাকবে—এসব প্রশ্ন আলাদা। একটি প্রদর্শনী সেগুলির সব উত্তর দিতে পারে না।
আজকাতিতলান কোডেক্সের আকর্ষণ তাই শুধু ‘ফিরে আসা’য় নয়। কাগজের বইটি সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকোয় ফিরেছে, অথচ তার পাতার মানুষরা বহু আগেই চলাচল, ক্ষমতা, ভাষা ও পরিচয়ের গল্প বলে গিয়েছেন। আধুনিক রাষ্ট্রের কাছে তাঁরা আজ অতিথি হয়ে ফিরেছেন নিজেরই ভূখণ্ডে।
এই ইতিহাসকে শুধু জাতীয় গৌরবের প্রতীক বানালে পাতার বহু কণ্ঠ আবার চাপা পড়ে যেতে পারে। বরং প্রদর্শনীর সার্থকতা সেখানেই—ফিরে আসার আবেগের মধ্যেও যেন ইতিহাসের জটিলতাগুলি দেখা যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



