ভোটার তথ্যভাণ্ডার নিয়ে উদ্বেগ, ক্যাবিনেট সচিবের দ্বারস্থ দুই কমিশনার

যা জানা জরুরি
- ভোটার তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে পৃথক চিঠি লিখেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর…
- তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর নজরদারি কমিয়ে দেওয়া একটি প্রশাসনিক নির্দেশের বিরুদ্ধে তাঁরা ব্যবস্থা চেয়েছিলেন।
- কমিশনের প্রশাসনিক বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েই বরিষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ কাজের বণ্টন বদলান।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোটার তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে পৃথক চিঠি লিখেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর নজরদারি কমিয়ে দেওয়া একটি প্রশাসনিক নির্দেশের বিরুদ্ধে তাঁরা ব্যবস্থা চেয়েছিলেন।
ঘটনাটি ২৮ জুলাইয়ের। কমিশনের প্রশাসনিক বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েই বরিষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ কাজের বণ্টন বদলান। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের তত্ত্বাবধান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় উপনির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমারকে। দুই কমিশনারের অভিযোগ, কমিশনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই এই পরিবর্তন হয়েছিল। ২৯ জুলাই তাঁরা ক্যাবিনেট সচিবকে লেখেন; পরদিন যৌথভাবে নির্দেশটি খারিজ করে আগের ব্যবস্থা বহাল রাখতে বলেন।
উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল দিল্লিতে তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হওয়া। ২৯ মে জোশী আইআইটির বহিরাগত বিশেষজ্ঞ যুক্ত করে নিরীক্ষার প্রস্তাব দেন। উদ্দেশ্য, আইনস্বীকৃত কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারও হাতে ভোটারের তথ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে কি না, পরীক্ষা করা। ১৪ অগস্ট সান্ধু জানান, প্রস্তাবের অগ্রগতি অজানা। একই দিনে তিনি সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দেন।
সান্ধুর অভিযোগ ছিল, তালিকার দায়িত্ব রাজ্য ও স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের হলেও ব্যবস্থায় প্রবেশের নিয়ন্ত্রণ তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের হাতে। সেই বিভাগের আইনপ্রদত্ত ক্ষমতা নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের কাজের স্বাধীনতা খর্ব করার।
গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দোবার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন দুই কমিশনার। বিষয়গুলির মধ্যে নতুন ভোটারের আবেদন, নাম বাদ দেওয়া ও ফিরিয়ে আনা এবং কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই নির্দেশ জারি করার অভিযোগ রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও আপত্তির কথা জানানো হয়েছিল। চার মাসের ব্যবধানে ৯ সেপ্টেম্বর তিন সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বৈঠক হয়।
এই সমস্যার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে গোয়ার ৯৭ জন ভোটারের কথা জানা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী আগে বাদ পড়া নাম ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা চালু করতে ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আটবার লিখেছিল রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে সুবিধাটি চালু হয়নি। ওই ৯৭ জনের নাম তালিকার বাইরে থেকে যায়। সংখ্যাটি ছোট হলেও, সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পথে প্রযুক্তিগত বাধার পরিণতি এতে স্পষ্ট।
যে প্রযুক্তিব্যবস্থাকে ঘিরে এত প্রশ্ন, সেই ইসিআইনেট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ২২ জানুয়ারি। কমিশনের নিজস্ব ঘোষণায় বলা হয়েছিল, চল্লিশের বেশি প্রয়োগব্যবস্থা ও পরিষেবা একত্র করা হয়েছে। ভোটার হিসেবে নাম তোলা, তালিকায় নাম খোঁজা, আবেদনের অগ্রগতি জানা, অভিযোগ জানানো এবং নির্বাচনী আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে এতে। ইংরেজি ছাড়াও সংবিধানের অষ্টম তফসিলভুক্ত বাইশটি ভাষায় পরিষেবা দেওয়ার কথা জানানো হয়।
উদ্বোধনে জ্ঞানেশ কুমার দাবি করেছিলেন, ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে আইন মেনেই। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহানির্দেশক সীমা খন্না নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জনবিশ্বাস বৃদ্ধির কথা বলেন। সান্ধুও তখন প্রযুক্তিটির স্বচ্ছতা বাড়ানোর সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ফলে বিতর্কের বিষয় প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নয়; ঘোষিত নীতি মেনে তার পরিচালনা হচ্ছে কি না। কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, বিহারের ২০২৫ সালের নির্বাচন ও বিশেষ নিবিড় সংশোধনে এর পরীক্ষামূলক ব্যবহার হয়েছিল।
আইনি ব্যবস্থাটি বুঝলে বিরোধের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৩বি ধারা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের দায়িত্ব নির্বাচক নিবন্ধন আধিকারিকের। তাঁকে রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচন কমিশন মনোনীত করে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তালিকা প্রস্তুতি, সংশোধন ও পরিমার্জনের তত্ত্বাবধান করেন। জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের দায়িত্ব জেলার কাজের সমন্বয় ও নজরদারি। কমিশনের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানের অধীনেই বিভিন্ন স্তরে এই আইনি দায়িত্ব পালন করার কথা।
এই দায়িত্ববণ্টনের তাৎপর্য হল, নাগরিকের আবেদন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সুযোগের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। কোনও আধিকারিক আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও কম্পিউটার ব্যবস্থা যদি তা কার্যকর করতে না দেয়, তাহলে নাগরিকের কাছে তাঁর দায়বদ্ধতা অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। প্রযুক্তির নকশা তখন প্রশাসনিক ক্ষমতার বাস্তব সীমা নির্ধারণ করবে। এই জটিলতা নিছক দাপ্তরিক বিষয় নয়।
কমিশনের নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিধান রয়েছে। ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ ও চাকরির শর্তসংক্রান্ত আইনের ১৮ ধারায় যথাসম্ভব সর্বসম্মতভাবে কাজ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কমিশনের কাজের পদ্ধতি এবং কমিশনারদের মধ্যে কাজ বণ্টন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নির্ধারণের বিধানও রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের নামে জারি হওয়া সিদ্ধান্তের পিছনে প্রতিষ্ঠানের বৈধ অনুমোদন থাকা জরুরি।
২১ সেপ্টেম্বর কমিশন এবং দুই কমিশনারকে প্রশ্ন পাঠানো হয়। তাঁদের উদ্বেগের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না এবং ৯ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে বিষয়গুলি উঠেছিল কি না, জানতে চেয়েছিল সংবাদপত্রটি। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত উত্তর মেলেনি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে কমিশনের ব্যাখ্যা এখনও সামনে আসেনি।
এই তথ্য থেকে সরাসরি ভোটার তালিকায় কারচুপি হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, পরিবর্তনের অনুমতি কে দেন এবং ভুল সংশোধনের ক্ষমতা কার—এই প্রশ্নগুলির নির্দিষ্ট উত্তর প্রয়োজন। নিরীক্ষার ফল প্রকাশ করা, অনুমোদনের নথি দেখানো এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত করা জনবিশ্বাস ফেরানোর পথ হতে পারে।
সাধারণ ভোটারের কাছে তথ্যপ্রযুক্তির এই প্রশাসনিক বিরোধের পরিণতি বাস্তব। তাঁর নাম ভুলভাবে বাদ গেলে কোথায় আবেদন করবেন, কে তা বিচার করবেন, অনুকূল সিদ্ধান্ত হলে নাম ফিরবে কীভাবে—প্রতিটি ধাপ কার্যকর থাকা চাই। তালিকার শুদ্ধতা শুধু ভুল নাম সরানোর বিষয় নয়; যোগ্য নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্তি এবং সংশোধনের সুযোগও তার অংশ। দুই কমিশনারের চিঠি সেই জবাবদিহির প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।
কমিশনের অন্দরেই বিস্ফোরণ: দশ মাসে দুই কমিশনারের চোদ্দো আপত্তি
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



