বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে যৌথ সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকেই কেন্দ্রের কাছে ব্যাখ্যা চাইলেন সদস্যরা। বিশেষত, কোনও সংস্থার বিদেশি অনুদান গ্রহণের অনুমতি শেষ হলে তার অর্থ ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ সরকার মনোনীত কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দাবি, সংশোধনীর উদ্দেশ্য বিদেশি অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো।

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বিজেপি সাংসদ সঞ্জয় জয়সওয়ালের সভাপতিত্বে বৈঠকটি হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন এবং মন্ত্রকের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা বিলের ব্যাখ্যা দেন। তিন ঘণ্টারও বেশি আলোচনা চলে। কমিটিতে লোকসভার ২১ জন এবং রাজ্যসভার ১০ জন সদস্য রয়েছেন। গত ১২ অগস্ট সংসদের দুই কক্ষ বিলটি আরও খতিয়ে দেখার জন্য এই যৌথ কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রস্তাবিত ‘নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ’। সংশোধনী অনুযায়ী, কোনও সংস্থার এফসিআরএ নিবন্ধন বাতিল হলে, সংস্থা তা স্বেচ্ছায় সমর্পণ করলে অথবা তার মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হলে বিদেশি অনুদান এবং সেই অর্থে তৈরি সম্পদ এই কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে যাবে। বিরোধী সদস্যদের আপত্তি, সংস্থার বক্তব্য শোনার সুযোগ কিংবা বিচারিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই এমন হস্তান্তরের ব্যবস্থা কেন থাকবে?

সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত সংবিধানের ৩০০এ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গও তোলেন বিরোধীরা। তাঁদের প্রশ্ন, সরকার মনোনীত কর্তৃপক্ষকে এত বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে? বিদেশি অর্থের হিসাব পরীক্ষা এবং সেই অর্থে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের সম্পদের দখল নেওয়ার মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, আলোচনায় সেটিই সামনে এসেছে।

মন্ত্রকের পাল্টা বক্তব্য, বর্তমান আইনেও সম্পদ দেখভালের জন্য কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১৮ সালের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব অথবা প্রধানসচিব সেই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সম্পদ বুঝে নেওয়া, তালিকা তৈরি, দেশীয় অর্থে গড়া সম্পদ আলাদা করা কিংবা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট পদ্ধতি নেই। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়, হাসপাতাল বা অনাথাশ্রম চালানোর দায়িত্ব পড়লে রাজ্যগুলির অর্থ ও কর্মীর অভাবও সমস্যা তৈরি করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই আইনকে মূলত জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত বলে ব্যাখ্যা করেছে। আধিকারিকদের বক্তব্য, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বিভিন্ন অস্পষ্টতা ও প্রশাসনিক সমস্যা দেখা দিয়েছে; তৈরি হয়েছে অপ্রয়োজনীয় মামলাও। সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ঘাটতি দূর করার চেষ্টা হচ্ছে। কোনও বিশেষ সম্প্রদায়কে নিশানা করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেছে মন্ত্রক।

বৈঠকে পেশ করা সরকারি হিসাবে, গত এক দশকে এফসিআরএ নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হলেও বিদেশি অনুদান ১৭,৮৩২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২২,৯৭৪ কোটি টাকা হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে পাওয়া অর্থের প্রায় ৫৩ শতাংশ, অর্থাৎ ১২,১১৩ কোটি টাকা এসেছে আমেরিকা থেকে। ব্রিটেন থেকে এসেছে ২,৪১৪ কোটি টাকা।

অনুদানের ব্যবহারের হিসাবও দিয়েছে মন্ত্রক। সামাজিক কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ, শিক্ষায় ৩০ শতাংশ এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে আট শতাংশ। সামাজিক কাজের জন্য এসেছে প্রায় ১৩,০৭১ কোটি টাকা, শিক্ষার জন্য ৬,৯৩৩ কোটি এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ১,৮৪১ কোটি টাকা। এই তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি অনুদানের সবচেয়ে বড় অংশের গন্তব্য সামাজিক পরিষেবা ও শিক্ষার ক্ষেত্র। ধর্মীয় খাতে পাওয়া অর্থের প্রায় ৭৩ শতাংশ গিয়েছে খ্রিস্টান সংগঠনগুলির কাছে। ধর্মের ভিত্তিতে অনুদানপ্রাপকদের এভাবে আলাদা করে দেখানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও কমিটির সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন।

আলোচনায় কুদানকুলাম পরমাণু প্রকল্প এবং সর্দার সরোবর বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রসঙ্গ তোলেন জয়সওয়াল। বিজেপি সদস্য নিশিকান্ত দুবে প্রশ্ন করেন ফোর্ড ফাউন্ডেশন নিয়ে। বৈঠকের পরে জয়সওয়াল জানান, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে এবং সদস্যরা একাধিক প্রশ্ন করেছেন। আপাতত বিলটি সংসদীয় পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। বিদেশি অনুদানের নজরদারি বাড়ানোর সরকারি যুক্তির পাশাপাশি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের শর্ত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার অধিকারই পরবর্তী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।