শেষ ঘর গোনা, বাকি মানুষ: জনগণনার প্রথম দফায় বাংলায় ১০০% ছোঁয়ার দাবি

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের জনগণনার প্রথম পর্বের সরেজমিন কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে বলে ১৬ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
- রাজ্য প্রশাসনের হিসাবে, মোট ১ লক্ষ ৭৩ হাজার ৬৬টি গৃহতালিকা ব্লকে কর্মীরা পৌঁছেছেন।
- নথিভুক্ত হয়েছে ৩ কোটি ৬৮ লক্ষ ৩০ হাজার ১৫০টি 'সেনসাস হাউস'।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের জনগণনার প্রথম পর্বের সরেজমিন কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে বলে ১৬ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য প্রশাসনের হিসাবে, মোট ১ লক্ষ ৭৩ হাজার ৬৬টি গৃহতালিকা ব্লকে কর্মীরা পৌঁছেছেন। নথিভুক্ত হয়েছে ৩ কোটি ৬৮ লক্ষ ৩০ হাজার ১৫০টি ‘সেনসাস হাউস’। পূর্বানুমান ছিল ৩ কোটি ৬৯ লক্ষ ৩০ হাজার ৩৪৪টি; অর্থাৎ সম্ভাব্য ঘরের ৯৯.৭ শতাংশ বাস্তবে গণনাভুক্ত হয়েছে।
দুটি হিসেব পাশাপাশি রাখলে আপাত বিরোধ দেখা দিতে পারে। শতভাগ সম্পূর্ণ হওয়ার অর্থ রাজ্যের প্রত্যেক নির্ধারিত ব্লকে সরেজমিন কাজ হয়েছে; ৯৯.৭ শতাংশ হল আগাম অনুমানের তুলনায় পাওয়া ঘরের সংখ্যা। অনুমান ও বাস্তব সংখ্যার ফারাক মানেই এক লক্ষ ঘর বাদ পড়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। নতুন নির্মাণ, পরিত্যক্ত বাড়ি, ভাঙা কাঠামো, একই চৌহদ্দিতে একাধিক ব্যবহার এবং ব্লকের সীমানা সংশোধনে দুই সংখ্যা আলাদা হতে পারে।
এটি জনগণনার চূড়ান্ত জনসংখ্যা নয়। প্রথম পর্বে বসতবাড়ি ও অন্যান্য কাঠামোর তালিকা তৈরি করা হয়, যাতে পরবর্তী জনসংখ্যা-গণনার ভিত্তি নির্ভুল থাকে। কে কোথায় নিয়মিত থাকেন, পরিবারের সদস্য কতজন এবং বয়স, ভাষা, শিক্ষা বা জীবিকা অনুযায়ী রাজ্যের জনবিন্যাস কেমন—এসবের পূর্ণ ফল পরের ধাপ ও যাচাই শেষ হওয়ার আগে জানা যাবে না। অতএব বর্তমান ঘোষণা দিয়ে জেলার জনসংখ্যা বেড়েছে বা কমেছে বলা অনুচিত।
জাতীয় স্তরে স্ব-গণনার সুযোগ ১ এপ্রিল থেকে চালু হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে সরেজমিনে গৃহতালিকার কাজ শুরু হয় ১ আগস্ট এবং প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হয়। পাহাড়ি বসতি, নদীভাঙনে স্থান বদলানো পরিবার, সুন্দরবনের দ্বীপ, চা-বাগানের শ্রমিক লাইন এবং বহুতল আবাসনের মতো ভিন্ন পরিবেশে একই সংজ্ঞা প্রয়োগ করাই ছিল বড় প্রশাসনিক পরীক্ষা।
গৃহতালিকা কেবল পরিসংখ্যানের অনুশীলন নয়। ভবিষ্যতে বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, আবাসন ও দুর্যোগ-পরিকল্পনার চাহিদা হিসাব করতে এই ভিত্তি ব্যবহৃত হয়। নমুনা-সমীক্ষার কাঠামোও জনগণনার ব্লক থেকে তৈরি হয়। কোনও দ্রুত-বর্ধনশীল শহরতলি বা ভাঙনপ্রবণ চর বাদ পড়লে পরবর্তী এক দশক সরকারি পরিকল্পনায় সেখানকার মানুষের প্রয়োজন কম দেখা যেতে পারে।
এ কারণে সরেজমিন কাজ শেষ হওয়াই শেষ পরীক্ষা নয়। বন্ধ বাড়ি কতবার পুনরায় দেখা হয়েছে, গণনাকারীর নিবন্ধিত তথ্য তত্ত্বাবধায়ক কত শতাংশ যাচাই করেছেন এবং ডিজিটাল নথি ও মানচিত্রের অসঙ্গতি কীভাবে মেটানো হয়েছে—এসব গুণমানসূচক প্রকাশ প্রয়োজন। বিশেষত নির্মাণশ্রমিক, ভাড়াটে, গৃহহীন মানুষ ও মৌসুমি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ‘ঘর’ এবং ‘স্বাভাবিক বাসস্থান’ এক বিষয় নয়।
ডিজিটাল সংগ্রহ গতি বাড়ালেও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা জরুরি। সরেজমিন কর্মীর যন্ত্র হারানো, অননুমোদিত নকল বা সরকারি পরিচয় দিয়ে প্রতারণা ঠেকাতে পরিচয় যাচাই ও অভিযোগ জানানোর সহজ পথ থাকা দরকার। একই সঙ্গে ইন্টারনেট দুর্বল বলে কোনও অঞ্চল যেন বাদ না পড়ে—অফলাইন সংগ্রহ ও পরে নিরাপদ সমন্বয়ের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজ্যের সব ব্লকে পৌঁছানো উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক সাফল্য। কিন্তু জনগণনার মান শুধু কত দ্রুত কাজ শেষ হল দিয়ে বিচার করা যায় না। বাদ পড়ার হার, পুনরায় যাচাই এবং সংজ্ঞাগত সংশোধনের তথ্য প্রকাশিত হলে শতভাগ সম্পূর্ণতার দাবিটি স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। এখনকার যথাযথ বক্তব্য—ঘর চিহ্নিত করার প্রথম পর্ব শেষ; পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও জনবিন্যাসের পূর্ণ ছবি এখনও তৈরি হচ্ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



