খবর

জনগণনার তথ্য গোপন রাখতেই হবে, এনপিআর–এনআরসি যোগের আশঙ্কায় সরব প্রাক্তন আধিকারিকেরা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • নয়াদিল্লি: জনগণনায় সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে—জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন বা এনপিআর এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি-র সঙ্গে জনগণনার সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে…
  • আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: পরিসংখ্যান তৈরির জন্য মানুষ রাষ্ট্রকে যে তথ্য দিচ্ছেন, সেই তথ্য কি পরবর্তী সময়ে তাঁর নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজে ব্যবহৃত…
  • বিতর্কে নতুন তাৎপর্য যোগ করেছে ১৯৫১ সালের অভিজ্ঞতা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

নয়াদিল্লি: জনগণনায় সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে—জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন বা এনপিআর এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি-র সঙ্গে জনগণনার সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই দাবি তুলেছেন প্রাক্তন সরকারি আধিকারিকেরা। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: পরিসংখ্যান তৈরির জন্য মানুষ রাষ্ট্রকে যে তথ্য দিচ্ছেন, সেই তথ্য কি পরবর্তী সময়ে তাঁর নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে?

বিতর্কে নতুন তাৎপর্য যোগ করেছে ১৯৫১ সালের অভিজ্ঞতা। সংশ্লিষ্ট সংবাদপ্রতিবেদনের সারাংশ অনুযায়ী, ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যাচ্ছে, সে বছর জনগণনার প্রশ্নপত্রে নথিভুক্ত তথ্য অনুলিপি করে দেশজুড়ে নাগরিকপঞ্জি প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে সেই দেশব্যাপী তালিকা প্রকাশিত হয়নি; প্রকাশের ব্যতিক্রম ছিল অসম। ফলে জনগণনার তথ্য এবং নাগরিকপঞ্জির মধ্যে অতীতে যোগাযোগ ছিল কি না, সেই প্রশ্নকে নিছক অনুমান বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অসমের ক্ষেত্রে জনগণনার নথি থেকে নাগরিকপঞ্জি তৈরির ইতিহাস অন্য সূত্রেও পাওয়া যায়। অসম সরকারের ২০১২ সালের শ্বেতপত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে, ওই নিবন্ধনে নাম, বয়স, জাতীয়তা, জীবিকা এবং পরিবারের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ছিল। প্রথমে জেলা ও মহকুমা প্রশাসনের কাছে থাকা নথি পরে, ষাটের দশকের গোড়ায়, অনুপ্রবেশকারী যাচাইয়ের সুবিধার জন্য পুলিশের কাছে পাঠানো হয়।

তবে অতীতের প্রশাসনিক ব্যবহার বর্তমান জনগণনার তথ্য অন্য কাজে ব্যবহারের অনুমতি প্রমাণ করে না। জনগণনা পরিচালিত হয় ১৯৪৮ সালের জনগণনা আইনে। সেই আইনের ১৫ নম্বর ধারায় জনগণনা আধিকারিকের তৈরি খাতা, নিবন্ধন, নথি এবং জমা দেওয়া প্রশ্নপত্র পরিদর্শনের সাধারণ অধিকার নিষিদ্ধ। সেগুলির কোনও তথ্য দেওয়ানি মামলায় সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। ফৌজদারি মামলাতেও নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া একই নিষেধ প্রযোজ্য।

ব্যতিক্রমটি মূলত জনগণনা আইনের অধীনে অপরাধের বিচারসংক্রান্ত। অর্থাৎ, সব পরিস্থিতিতে সব আদালতে এই নথি ব্যবহার নিষিদ্ধ—এমন সরলীকরণ সঠিক নয়। আবার জনগণনায় তথ্য দিলেই তা প্রশাসনের যে কোনও শাখার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, এমন ধারণাও আইনের সুরক্ষার সঙ্গে মেলে না। এই সুরক্ষার উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যক্তির পরিচয়যুক্ত তথ্য এবং সামগ্রিক পরিসংখ্যানের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।

সরকারের জনগণনা বিষয়ক তথ্যেও বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা হয়; প্রকাশ করা হয় বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরের সমষ্টিগত পরিসংখ্যান। কোনও জেলায় কত মানুষ থাকেন, কতজন শিক্ষিত, কিংবা কত পরিবার নির্দিষ্ট সুযোগসুবিধা পায়—এসব প্রকাশ এবং কোনও নির্দিষ্ট পরিবারের দেওয়া উত্তর প্রকাশ এক বিষয় নয়। পরিকল্পনার কাজে প্রথম ধরনের তথ্য প্রয়োজন হয়, দ্বিতীয় ধরনের তথ্যের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার প্রশ্ন ওঠে।

এনপিআরের আইনি ভিত্তি আলাদা। এটি ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন এবং ২০০৩ সালের নাগরিক নিবন্ধন বিধির অধীনে তৈরি বাসিন্দাদের নিবন্ধন। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, এখানে সাধারণভাবে বসবাসকারী নাগরিক ও অ-নাগরিক উভয়ের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে এনপিআরে নাম থাকা এবং ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সমার্থক নয়। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিকপঞ্জির উদ্দেশ্য ভারতীয় নাগরিকদের বিবরণ নথিভুক্ত করা।

এনপিআর ও এনআরসি-র সম্ভাব্য সংযোগের আলোচনায় তাই ২০০৩ সালের বিধি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে জনসংখ্যা নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করে স্থানীয় নাগরিক নিবন্ধন তৈরির কথা রয়েছে। যাচাইয়ের সময়ে কারও নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ হলে তা চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারকে জানানোর বিধানও আছে। অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তাঁদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এই বিধিবদ্ধ সংযোগ ব্যাখ্যা করে কেন এনপিআর নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে এনআরসি-র প্রসঙ্গ আসে। কিন্তু সেখান থেকে জনগণনার তথ্য ইতিমধ্যেই নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য হস্তান্তরিত হচ্ছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। ঐতিহাসিক নজির, আইনে থাকা ক্ষমতা এবং বর্তমানে বাস্তবে নেওয়া সিদ্ধান্ত—প্রতিটি আলাদা প্রমাণের বিষয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশ বা তথ্য হস্তান্তরের প্রমাণ ছাড়া সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে দেখানো বিভ্রান্তিকর হবে।

গোপনীয়তার বিতর্কের আরেকটি দিক জনগণনার নির্ভরযোগ্যতা। উত্তরদাতা যদি আশঙ্কা করেন, তাঁর দেওয়া পারিবারিক পরিচয় বা জন্মস্থানসংক্রান্ত তথ্য ভবিষ্যতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, তা হলে তথ্য দিতে দ্বিধা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কেউ উত্তর এড়িয়ে গেলে কিংবা ভুল তথ্য দিলে তার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক পরিসংখ্যানে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সরকারি পরিকল্পনার ভিত্তিও।

সেই কারণে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাসস্থান বা পানীয় জলের প্রয়োজন নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য জনসংখ্যাতথ্য জরুরি। বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিক, ঘনঘন ঠিকানা বদলানো পরিবার এবং প্রান্তিক মানুষের তথ্য ঠিকভাবে উঠে না এলে তাঁদের প্রয়োজনও পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব নাও পেতে পারে। জনগণনায় আস্থা বজায় রাখা তাই পরিষেবা বণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ব্যাখ্যায় কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন: কোন তথ্য কোন আইনে নেওয়া হচ্ছে, কারা তা দেখতে পারবেন এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবেন। জনগণনা ও অন্য নিবন্ধনের প্রশ্নপত্রে মিল থাকলেও তথ্যের ব্যবহারসংক্রান্ত আইনি সীমা কী, তা সহজ ভাষায় জানানো দরকার। গোপনীয়তার আশ্বাস কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা যথেষ্ট নয়; অনুমোদিত ব্যবহারের সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের জবাবদিহি এবং অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থাও মানুষের কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার, যাতে আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব সুরক্ষার যোগ থাকে।

প্রাক্তন আধিকারিকদের গোপনীয়তা রক্ষার দাবিটি এই বৃহত্তর আস্থার প্রশ্নকেই সামনে আনছে। জনগণনার সাফল্য নির্ভর করে মানুষের সহযোগিতা এবং সঠিক উত্তরের উপর। ১৯৫১ সালের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা সেই আস্থা রক্ষার দায়িত্ব কমায় না, বরং তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য ও পরবর্তী ব্যবহারের সীমা স্পষ্ট করার প্রয়োজন বাড়ায়। রাষ্ট্র মানুষের সম্পর্কে জানবে, কিন্তু সেই জানার অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করবে, তারও সুস্পষ্ট নিয়ম থাকা চাই।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles