ণতন্ত্রের পরীক্ষা শাসকের পছন্দের কথায় হয় না; হয় তাঁর অপছন্দের কথা বলার স্বাধীনতায়। সেই পরীক্ষায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য দুটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। একটিতে ধর্মপ্রচারকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের গ্রেফতারের নির্দেশ, অন্যটিতে বিরোধী দলের বইয়ের দোকানের জন্য শব্দচয়নের শর্ত। দুটির মধ্যেই রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়ে নাগরিকের প্রকাশভঙ্গি নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং আদালতে প্রমাণযোগ্য বেআইনি পদক্ষেপের মধ্যে পার্থক্য রেখেই বিচার করা প্রয়োজন।

বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর পুজোয় আমিষ বর্জনের বক্তব্যের প্রতিবাদে ছবি পোড়ানো হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেফতার করতে বলেছেন। একইসঙ্গে তিনি শাস্ত্রীর নিজের বিশ্বাস প্রকাশের অধিকার সমর্থন করেছেন। এই সমর্থন গণতান্ত্রিক; সমস্যা হল, বিরুদ্ধমত প্রকাশকারীদের ক্ষেত্রে সেই উদারতার অনুপস্থিতি।

কেউ ধর্মবিশ্বাস থেকে নিরামিষ খাওয়ার পরামর্শ দিতেই পারেন। অন্য কেউ সেই পরামর্শকে অনধিকারচর্চা মনে করে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। প্রথম ব্যক্তির গেরুয়া পোশাক কিংবা দ্বিতীয় ব্যক্তির দলীয় পরিচয় তাঁদের নাগরিক অধিকারের পরিমাণ বদলায় না। ধর্মগুরুকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব; তাঁকে সমালোচনা থেকে রক্ষা করা প্রশাসনের কাজ হতে পারে না। একজনের ধর্মীয় মর্যাদা অন্যজনের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করার ছাড়পত্র নয়।

ছবি পোড়ানোকে কেউ কুরুচিকর, উগ্র কিংবা অপ্রয়োজনীয় মনে করতেই পারেন। কিন্তু অপছন্দের কারণ আর গ্রেফতারযোগ্য অপরাধ এক জিনিস নয়। ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে।  জনশৃঙ্খলা, মানহানি, অপরাধে প্ররোচনাসহ নির্দিষ্ট কারণে আইনসম্মত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগ রেখেছে। শাসকের বিরক্তি সেই তালিকায় নেই। তাই প্রতীকী প্রতিবাদ দেখেই অপরাধের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো চলে না।

অবশ্য ছবি পোড়ানোর সঙ্গে অগ্নিসংযোগের বিপদ, অন্যের সম্পত্তির ক্ষতি, হিংসার হুমকি কিংবা নির্দিষ্ট অপরাধের উপাদান থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সেসব ঘটেছিল কি না, তা তথ্যপ্রমাণে দেখতে হবে। কোনও ধর্মপ্রচারকের ছবি পোড়ালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষের অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংশ্লিষ্ট আইনের শর্তও পূরণ হতে হবে। প্রতিবাদের পদ্ধতি সমর্থন না করেও নির্বিচার গ্রেফতারের বিরোধিতা করা যায়।

এখানেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা। তিনি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলতে পারতেন। প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে গ্রেফতারের ফলাফল আগেই নির্ধারণ করে দিলে পুলিশের স্বাধীন মূল্যায়ন চাপে পড়ে। অপরাধ হয়েছে কি না, গ্রেফতারের আইনি শর্ত আছে কি না—এই প্রশ্নগুলি তখন নেতার ইচ্ছার অধীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক প্রশাসনে পুলিশকে আইন প্রয়োগ করতে হয়; মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ বাস্তবায়ন করতে নয়।

বইয়ের দোকান নিয়ে মন্তব্যটির ক্ষেত্রে একটি তথ্যগত সতর্কতা জরুরি।  শুভেন্দু পুজো কমিটিগুলিকে সিপিএমের দোকানের ব্যানারে ‘শারদোৎসব’-এর বদলে ‘দুর্গাপুজো’ লেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এটিকে ইতিমধ্যেই জারি হওয়া সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলা ঠিক হবে না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর মুখের আহ্বান সাধারণ দর্শনার্থীর অনুরোধের সমানও নয়। তাঁর কথার সঙ্গে প্রশাসনিক ক্ষমতার ওজন যুক্ত থাকে।

‘দুর্গাপুজো’ বলার পক্ষে যুক্তি দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। অনুষ্ঠানটির ধর্মীয় পরিচয় আড়াল হচ্ছে বলে কারও মনে হলে তিনি প্রকাশ্যে বিতর্ক করতে পারেন। কিন্তু সেই বিতর্কে জেতার উপায় বইয়ের দোকান বন্ধের ভয় দেখানো হতে পারে না। ‘শারদোৎসব’ শব্দটি ব্যবহার করলেই দেবী দুর্গার অবমাননা ঘটে, এমন সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র চাপিয়ে দিতে পারে না। উৎসবকে ধর্মীয়, সামাজিক অথবা সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখার বিভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

এখানেও অধিকারের সীমা স্পষ্ট করা দরকার। কোনও রাজনৈতিক দলের প্রত্যেক ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত পুজোমণ্ডপে দোকান বসানোর অবাধ অধিকার নেই। আয়োজকের অনুমতি, জায়গা, নিরাপত্তা এবং প্রযোজ্য নিয়ম মানতে হবে। আয়োজকেরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু সরকারি প্রভাব খাটিয়ে একটি দলের জন্য বিশেষ শব্দ ব্যবহারের শর্ত চাপানো হলে প্রশ্নটি বদলে যায়। তখন সেটি আয়োজনের ব্যবস্থাপনা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক মতের ভিত্তিতে বঞ্চনার প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

এর প্রভাব কেবল সিপিএমের ওপর পড়ে না। কোনও আয়োজক ভাবতে পারেন, মুখ্যমন্ত্রীর পছন্দের বাইরে গেলে অনুমতি কিংবা প্রশাসনিক সহযোগিতায় অসুবিধা হবে কি না। বাস্তবে প্রতিশোধ না ঘটলেও সেই আশঙ্কা মানুষকে আগাম আত্মসমর্পণে ঠেলে দিতে পারে। ক্ষমতার এমন প্রভাবেই অনেক সময় লিখিত নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই স্বাধীনতার পরিসর ছোট হয়ে আসে।

মন্তব্য দুটি পাশাপাশি রাখলে দ্বৈত মানদণ্ডটি স্পষ্ট। ধর্মপ্রচারক নিজের সাংস্কৃতিক পছন্দ জানাবেন স্বাধীনভাবে, অথচ প্রতিবাদকারী কীভাবে আপত্তি জানাবেন এবং বিরোধীরা উৎসবকে কী নামে ডাকবেন, তার সীমা ঠিক করে দেবেন মুখ্যমন্ত্রী। এই ব্যবস্থায় অধিকার নাগরিকের সমান সম্পদ থাকে না; শাসকের অনুমোদন অনুযায়ী বণ্টিত সুবিধায় পরিণত হয়। এই ধরনের প্রশাসনিক পক্ষপাতমূলক আচরণ ১৪ অনুচ্ছেদের সমান আইনি সুরক্ষার নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হতে বাধ্য।

সরকারের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব তাই স্পষ্ট: শাস্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিবাদকারীদের বৈধ অধিকার রক্ষা করা এবং অপরাধের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা। পুজোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সবার জন্য প্রযোজ্য স্বচ্ছ নিয়ম। মুখ্যমন্ত্রী নিজের পছন্দের নাম ব্যবহার করুন, অন্যদের বোঝান, রাজনৈতিক সমালোচনা করুন। কিন্তু পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক প্রতিপত্তিকে সেই মত জেতানোর অস্ত্র করলে সাংবিধানিক দায়িত্বের সীমা অতিক্রমের প্রশ্ন উঠবেই।

আজ যে নিয়ম বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হচ্ছে, আগামীকাল অন্য সরকার সেই নিয়ম শাসকদলের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারে। সেই কারণেই নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষা দলনিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। ক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে অধিকার বদলালে গণতন্ত্রের ভিত বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

এই দুটি মন্তব্য দিয়ে গোটা সরকারকে চূড়ান্ত কোনও অভিধা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে মন্তব্য দুটির কর্তৃত্ববাদী ঝোঁক অস্বীকার করাও সম্ভব নয়। ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার চালানোর অধিকার দেয়; নাগরিকের প্রতিবাদের ভাষা এবং উৎসবের অভিধান নির্ধারণের সর্বময় অধিকার দেয় না। মুখ্যমন্ত্রীর গণতান্ত্রিক সংযমের পরীক্ষা এখানেই।