খাবারের দোকানে পুরসভার কোপ: ক্ষুব্ধ মালিকেরা, স্বস্তিতে ক্রেতারা

যা জানা জরুরি
- কলকাতার গলির মিষ্টির দোকান থেকে পরিচিত রেস্তোরাঁ—খাদ্যসুরক্ষা অভিযানের পরে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ক্রেতাদের স্বস্তির ছবি পাশাপাশি উঠে এসেছে।
- মঙ্গলবার কলকাতা পুরসভা ৪০টি খাবারের প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ব্যবসার অনুমতি স্থগিত করার পর কোনও মালিক অভিযোগ করেছেন, ত্রুটি সংশোধনের যথেষ্ট সময় মেলেনি।
- আবার ক্রেতাদের একাংশের বক্তব্য, দোকানের পরিচিতি কিংবা খাবারের জনপ্রিয়তার চেয়ে স্বাস্থ্যরক্ষা অনেক বেশি জরুরি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতার গলির মিষ্টির দোকান থেকে পরিচিত রেস্তোরাঁ—খাদ্যসুরক্ষা অভিযানের পরে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ক্রেতাদের স্বস্তির ছবি পাশাপাশি উঠে এসেছে। মঙ্গলবার কলকাতা পুরসভা ৪০টি খাবারের প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ব্যবসার অনুমতি স্থগিত করার পর কোনও মালিক অভিযোগ করেছেন, ত্রুটি সংশোধনের যথেষ্ট সময় মেলেনি। কেউ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বেচাকেনা চালিয়েছেন। আবার ক্রেতাদের একাংশের বক্তব্য, দোকানের পরিচিতি কিংবা খাবারের জনপ্রিয়তার চেয়ে স্বাস্থ্যরক্ষা অনেক বেশি জরুরি।
পুরসভার বক্তব্য, সপ্তাহব্যাপী পরিদর্শনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণের গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। কোথাও উপযুক্ত ঠান্ডায় খাদ্যসামগ্রী রাখা হচ্ছিল না, কোথাও রান্নাঘর এবং মজুতের জায়গা অপরিচ্ছন্ন। খাদ্যসামগ্রী রাখার এলাকায় ইঁদুর ও আরশোলার উপস্থিতি এবং খাবারে ছত্রাকের অভিযোগও জানিয়েছেন আধিকারিকেরা। মিষ্টির দোকানগুলির পরিচ্ছন্নতা নিয়েও বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পুরসভা। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছে, এমন নয়।
পুরকর্ত্রী স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, অভিযানে ৫৯২টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ১৬১টি খাদ্যনমুনা সংগ্রহ করা হয়। নোটিস দেওয়া হয় ১১২টি প্রতিষ্ঠানকে। বিধিসম্মত নয়, এমন ১,২২৪ কিলোগ্রাম খাদ্যসামগ্রী নষ্ট করা হয়েছে। পুরসভার যুক্তি, মানুষ বিশ্বাস করেই দোকানে খেতে যান কিংবা পরিবারের জন্য খাবার কেনেন। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখে নিরাপদ খাবার সরবরাহ করা ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব। পরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে বড় প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কোনও ছাড় পাওয়ার কারণ হতে পারে না।
স্থগিতাদেশের তালিকায় মির্জা গালিব স্ট্রিটের করিমস, পার্ক স্ট্রিটের ডন জিওভানিস এবং রাজা রামমোহন সরণির দাদা বৌদি হোটেলের মতো পরিচিত নামও রয়েছে। ফলে অভিযান পাড়ার ছোট দোকানে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ধাপা রোডের প্রায় চল্লিশ বছরের মাতৃ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিকপক্ষের অভিযোগ, জল পরীক্ষা, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতার নির্দেশ কার্যকর করার আগেই দোকান বন্ধ হয়েছে। দৈনিক মজুরির কর্মীদের কাজ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেড় বছরের নিউ পৌষী সুইটসের পরিচালকেরও দাবি, সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে পুলিশ এসে বন্ধ করতে বলে।
অন্য দিকে, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সাউথ পয়েন্ট স্কুলের কয়েকজন অভিভাবক অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের উদ্বেগ শিশুদের খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে। মহেন্দ্র রায় লেনের মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভান্ডারে আবার অনুমতি স্থগিত থাকা সত্ত্বেও বিক্রি চলতে দেখা যায়। মালিকের অনুপস্থিতি এবং নির্দেশ সম্পর্কে অজ্ঞতার কথা জানান সেখানে উপস্থিত লোকজন।
বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিকের নাম ঘিরেও বিতর্ক হয়েছে। পুরসভার তালিকায় উল্লিখিত বি এল সাহা রোডের উৎপাদনকেন্দ্রটির সঙ্গে নিজেদের কোনও সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে সংস্থা। তাদের দাবি, ওই কেন্দ্র তারা চালায় না বা নিয়ন্ত্রণও করে না। ফলে তালিকাভুক্ত ঠিকানা এবং পরিচিত প্রতিষ্ঠানের পরিচয় মিলিয়ে দেখা জরুরি।
একই নাম কিংবা কোনও একটি শাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার প্রভাব গোটা ব্যবসায় পড়তে পারে—এই উদ্বেগে একাধিক প্রতিষ্ঠান সামাজিক মাধ্যমে ব্যাখ্যা দিয়েছে। শিমলা বিরিয়ানি জানিয়েছে, তাদের তপসিয়া শাখা বন্ধ থাকলেও ই এম বাইপাস, লেকটাউন এবং চিনার পার্কের দোকান চালু রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমতিও রয়েছে বলে সংস্থার দাবি। গ্রাহকদের ফোন ও বার্তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই ব্যাখ্যা দিয়েছে তারা।
কষে কষা জানিয়েছে, তাদের ব্যবসা চালু রয়েছে; অভিযান ও অনুমতি স্থগিতের বিষয়ে ছড়ানো তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। গিরিশচন্দ্র দে ও নকুড়চন্দ্র নন্দীও জানিয়েছে, আলোচনায় আসা প্রতিষ্ঠানটি তাদের দোকান নয়। রামদুলাল সরকার স্ট্রিটের ৫৬ নম্বর বাড়িতেই তাদের একমাত্র দোকান। এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাখ্যা হিসেবেই সামনে এসেছে।
ট্যাংরার বিগ বসের তরফে দাবি করা হয়েছে, পরিদর্শকেরা কোনও খাবার পচা বা খাওয়ার অযোগ্য বলে ঘোষণা করেননি; পরীক্ষাগারে পাঠানোর জন্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়নি। পাঁচশো কিলোগ্রাম মজুত নিয়ে প্রচারিত দাবিও তারা অস্বীকার করেছে। আরসালান আবার আচারি কাবাবের টক গন্ধ সম্পর্কে জানিয়েছে, তা প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত আচারের স্বাদের মিশ্রণ থেকেই আসে। সেটিকে মাংস নষ্ট হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে সংস্থার বক্তব্য।
এর মধ্যেই বন্ধ দোকান খোলার পথ জানতে বুধবার পুরভবনে যান কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালকেরা। পুরসভার বক্তব্য, নোটিসে উল্লিখিত ত্রুটি আগে সংশোধন করতে হবে। তার পরে আবেদন করলে পরিদর্শক দল আবার গিয়ে পরিস্থিতি পরীক্ষা করবে। সংশোধন সন্তোষজনক হলেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে ব্যবসা চালুর অনুমতি দেওয়া হবে।
পরিদর্শনে ব্যবহৃত রান্নার তেল ফেলার হিসাব না থাকা, খাবার খোলা রাখা এবং কর্মীদের মাথা ঢাকার ব্যবস্থা বা উপযুক্ত পোশাক না থাকার অভিযোগও এসেছে। এগুলিও সংশোধন করতে বলেছে পুরসভা।
পুরসভার ব্যাখ্যায়, এই ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া নয়। রান্নাঘর, কাঁচামালের সংরক্ষণ এবং ব্যবহৃত উপকরণের মান ঠিক করাই উদ্দেশ্য। সংশোধনের জন্য দু’সপ্তাহ সময় দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন এক আধিকারিক। তবে সেই সময় পেরোলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দোকান খোলার ছাড়পত্র মিলবে না; পুরসভার অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া বেচাকেনা ঠেকাতে পুলিশের সহায়তাও চাওয়া হয়েছে।
বুধবারের পরবর্তী খবরে আরও প্রায় কুড়িটি প্রতিষ্ঠানে নোটিস দেওয়ার কথা জানা গিয়েছে। ফলে প্রথম দিনের চল্লিশের তালিকা বেড়ে প্রায় ষাট হয়েছে। নতুন তালিকায় রয়েছে এক্সাইড মোড়ের কাছের রুটস, পার্ক স্ট্রিটের গোল্ডেন ড্রাগন, চাঁদনি চকের চুং ওয়াহ এবং বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের নিউ আলিয়া হোটেল। উৎসবের মরশুমের আগে ব্যবসা হারানোর আশঙ্কা বাড়ছে মালিকদের। কোনও কোনও বন্ধ প্রতিষ্ঠানের বাইরে সংস্কার চলার বিজ্ঞপ্তিও দেখা গিয়েছে।
এই ঘটনায় ক্রেতার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্যটি হল, ঠিক কোন দোকান বা শাখার বিরুদ্ধে কী ত্রুটি পাওয়া গিয়েছে এবং তা সংশোধনের পরে ছাড়পত্র মিলেছে কি না। প্রতিষ্ঠানের সুনাম যেমন বর্তমান রান্নাঘরের অবস্থার বিকল্প নয়, তেমনই একটি ঠিকানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা মানেই একই নামের সব দোকানের বিরুদ্ধে অভিযোগও নয়। স্পষ্ট তথ্য এবং নিয়মিত তদারকিই এখানে ক্রেতার আস্থা ফেরানোর ভিত্তি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



