লকাতা হাই কোর্টের ৪৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর শপথ নিলেন বিচারপতি রবীন্দ্র বিঠলরাও ঘুগে। হাই কোর্টের এক নম্বর আদালতকক্ষে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর এন রবি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসু। বম্বে হাই কোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব থেকে কলকাতায় এলেন তিনি।

দায়িত্বগ্রহণের দিনে ঘুগে স্মরণ করেন নিজের শুরুর দিনগুলি। তিনি পরিবারের প্রথম আইনজীবী; এই পেশায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কোনও প্রতিষ্ঠা ছিল না। প্রথম বর্ষে প্রতিদিন চার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আইন কলেজে যেতেন। ওকালতির প্রথম সাড়ে সাত বছর মোটরসাইকেলই ছিল যাতায়াতের সঙ্গী। তাঁর বক্তব্য, পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও অধ্যবসায় সাধারণ সূচনা থেকে সর্বোচ্চ সম্মানের দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। স্ত্রী বর্ষা এবং পরিবারের ত্যাগও স্মরণ করেন তিনি। কলকাতা হাই কোর্টের নির্ভীক ও পক্ষপাতহীন বিচারদানের ঐতিহ্যের কথাও বলেন তিনি। নিজের এই উত্তরণকে দেশের গণতন্ত্রের সম্ভাবনার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন।

এই নিয়োগের সুপারিশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগকারী মণ্ডলী করেছিল ৬ আগস্ট। কেন্দ্রীয় সরকার ৫ সেপ্টেম্বর তাতে অনুমোদন দেয়। তখন ঘুগে বম্বে হাই কোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে কর্মরত। ওই আদালতের প্রধান বিচারপতি শ্রী চন্দ্রশেখর সুপ্রিম কোর্টে নিযুক্ত হওয়ার পরে জুন মাসে তিনি দায়িত্বটি পেয়েছিলেন। ফলে কলকাতার প্রধান বিচারপতি হওয়ার আগে অন্য একটি বৃহৎ হাই কোর্টের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন ঘুগে।

তাঁর শিক্ষাজীবন ও পেশাগত পরিচয়ে রয়েছে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাপ। পুণে জেলা আদালতের প্রকাশিত জীবনপঞ্জি অনুযায়ী, তাঁর মা মীনা এবং বাবা অধ্যাপক ভি বি ঘুগে। বাবা ছিলেন উপাচার্য। কোলহাপুরের সেন্ট জেভিয়ার্স হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে কোলহাপুরের ছত্রপতি শাহাজি আইন কলেজ এবং ঔরঙ্গাবাদের এম পি আইন কলেজে পাঁচ বছরের আইন পাঠক্রম সম্পূর্ণ করেন। ১৯৯০ সালের এপ্রিল-মে মাসে তাঁর সেই পড়াশোনা শেষ হয়।

ছাত্রাবস্থাতেই আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের অনুশীলনে সাফল্য পেয়েছিলেন ঘুগে। ১৯৮৯ সালে কাল্পনিক মামলার সওয়াল প্রতিযোগিতায় নিজের কলেজ এবং মরাঠওয়াড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হন। সেই বছরের অক্টোবরে হিমাচল প্রদেশের সিমলায় আয়োজিত জাতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বও করেন। আইন পাঠের সঙ্গে ব্যবহারিক সওয়ালের এই পরিচয় তাঁর ছাত্রজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ।

১৯৯০ সালেই আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু। বম্বে হাই কোর্টের পাশাপাশি শ্রম ও শিল্প আদালতে মামলা লড়েছেন তিনি। কর্মজীবনের গোড়ায় শ্রমিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলির হয়ে প্রায় দু’হাজার মামলায় প্রতিনিধিত্ব করেন। পরবর্তী সময়ে প্রায় আড়াইশো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হয়েও মামলা পরিচালনা করেছেন। সেই তালিকায় বহুজাতিক সংস্থা এবং বড় বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ছিল। হাই কোর্ট, শ্রম আদালত, শিল্প আদালত ও বিচারাধিকরণে কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা বিস্তৃত হয়।

ওকালতির পাশাপাশি আইনশিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ঘুগে। ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ডক্টর বাবাসাহেব আম্বেডকর মরাঠওয়াড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর আইন পাঠক্রমে অতিথি অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেন। ঔরঙ্গাবাদের শিল্প আইনজীবীদের সংগঠনের সম্পাদক ছিলেন পাঁচ বছর। পরে ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বও সামলান। অর্থাৎ বিচারকের আসনে পৌঁছনোর আগে আদালত, শ্রেণিকক্ষ এবং পেশাগত সংগঠন—তিন ক্ষেত্রেই কাজ করেছেন তিনি।

২০১৩ সালের ২১ জুন বম্বে হাই কোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে তাঁর বিচারকজীবনের সূচনা। ২০১৬ সালের ২ মার্চ স্থায়ী বিচারপতি হন। প্রায় তেরো বছর বম্বে হাই কোর্টে দায়িত্ব পালনের পরে এ বার কলকাতায় তাঁর নতুন অধ্যায় শুরু হল। কলকাতায় এই সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী। শ্রমিকের পক্ষে সওয়াল থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মামলা, আইন পড়ানো থেকে বিচারবিভাগীয় নেতৃত্ব—দীর্ঘ কর্মজীবনের এই অভিজ্ঞতা নিয়েই কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির আসনে বসলেন ঘুগে।