পশ্চিম তীরের ‘বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসবাদীদের’ রুখতে পারবে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা?

যা জানা জরুরি
- ব্রিটেনের বিদেশসচিব এড মিলিব্যান্ড অধিকৃত প্যালেস্তাইনের বেআইনি বসতিগুলি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
- পাশাপাশি, এই বসতিগুলির নির্মাণ, পরিকাঠামো তৈরি ও বিপণনে যেসব সংস্থা অর্থ জোগায় বা সহায়তা করে, তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে।
- মিলিব্যান্ড আরও বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ‘বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসবাদীরা’ জাতিগত সাফাই চালাচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ব্রিটেনের বিদেশসচিব এড মিলিব্যান্ড অধিকৃত প্যালেস্তাইনের বেআইনি বসতিগুলি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি, এই বসতিগুলির নির্মাণ, পরিকাঠামো তৈরি ও বিপণনে যেসব সংস্থা অর্থ জোগায় বা সহায়তা করে, তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে।
মিলিব্যান্ড আরও বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ‘বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসবাদীরা’ জাতিগত সাফাই চালাচ্ছে। ইজরায়েল সরকার তা দেখেও না-দেখার ভান করছে, এমনকি সরকারের কিছু সদস্য এই কর্মকাণ্ডে সমর্থনও দিচ্ছেন।
তাঁর বক্তব্য, ব্রিটেনের বিরোধ ইজরায়েলের সরকারের সঙ্গে, সে দেশের মানুষের সঙ্গে নয়। নতুন পদক্ষেপগুলির লক্ষ্য হবে প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের বেআইনি দখলদারির সম্প্রসারণ ও তাকে আরও পাকাপোক্ত করার প্রক্রিয়া। ‘গ্রিন লাইন’-এর ভিতরে অবস্থিত ইজরায়েল এই পদক্ষেপের আওতায় পড়বে না। ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতিতে নির্ধারিত এই সীমানাকেই এক সময়ে ইজরায়েল ও ভবিষ্যৎ প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সীমান্তের ভিত্তি হিসেবে দেখা হত।
পশ্চিম তীরের কেন্দ্রস্থলে ‘ই–১’ নামে পরিচিত এলাকায় একটি বিশাল নতুন বসতি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইজরায়েল এগিয়ে যাওয়ায় ব্রিটেন এই পদক্ষেপ করছে। ইজরায়েলের অতি দক্ষিণপন্থী মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের কথায়, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ‘প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দেওয়া’। অগস্টে ওই বসতি নির্মাণের দরপত্র জারিকে মিলিব্যান্ড এমন একটি সীমারেখা লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছেন, যা ব্রিটেনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
সংসদে মিলিব্যান্ড ইজরায়েলের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের কথাও বলেন। ছোটবেলায় সেখানে তাঁর দিদিমার কাছে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দময় স্মৃতি তুলে ধরেন। নাৎসিরা তাঁর দিদিমার স্বামী ও আরও ৬০ জন আত্মীয়কে হত্যা করার পরে তিনি ইজরায়েলে আশ্রয় পেয়েছিলেন।
মিলিব্যান্ড বলেন, জাতিগত সাফাই ও বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ব্রিটেন তার মৌলিক মূল্যবোধ—‘আইনের শাসন, স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’—এবং ইজরায়েলি ও প্যালেস্তিনীয় উভয় জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যতের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর কথায়, নতুন পদক্ষেপগুলির উদ্দেশ্য ‘ইজরায়েলি ও প্যালেস্তিনীয়দের শান্তি ও নিরাপত্তার একমাত্র পথ, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে বাঁচিয়ে রাখা’।
ই–১ বসতিতে অর্থ জোগানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বসতিগুলিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর বাণিজ্য ইজরায়েলের রফতানি অর্থনীতির তুলনামূলক ছোট একটি অংশ। যদিও ইজরায়েলি পরিসংখ্যানের অভাবে এই বাণিজ্যের সঠিক আয়তন স্পষ্ট নয়।
মিলিব্যান্ড উল্লেখ করেছেন, গত তিন দশকে অধিকৃত প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়েছে। ১৯৯৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ২ লক্ষ ৭০ হাজার। এখন তা ৭ লক্ষ ৭০ হাজার।
এই সম্প্রসারণের পিছনে রয়েছে বিপুল সরকারি ভর্তুকি। ফলে শুধু বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা নির্মাণ প্রকল্পগুলির কার্যকারিতায় বড় প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা কম। ইজরায়েলের বৃহত্তর অর্থনীতিতেও তার প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু বসতি সম্প্রসারণে অর্থ জোগায় বা সহায়তা করে এমন যেকোনও সংস্থার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা ইজরায়েলের প্রধান ব্যাঙ্ক ও বিমা সংস্থাগুলিকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলতে পারে। ব্রিটেনে ব্যবসায়িক স্বার্থ বজায় রাখবে, নাকি অধিকৃত প্যালেস্তাইনে—তাদের সেই বাছাই করতে হতে পারে।
মিলিব্যান্ড এখনও নতুন ব্যবস্থাগুলির বিস্তারিত জানাননি। তিনি বলেছেন, সেগুলি চালু করতে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগবে। তবে এই পদক্ষেপের ফলে নির্মাণের গতি কমে যেতে পারে, এমনকি কাজ বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
নতুন নির্মাণ প্রকল্পগুলি নিয়ে সমাজমাধ্যমে এক পোস্টে আন্দোলনকর্মী ইয়েহুদা শাউল লিখেছেন, ‘বসতি সম্প্রসারণ-সহ সরকার পরিচালিত প্রকল্পগুলির দরপত্রে অংশ নেওয়া সংস্থাগুলির একজন আর্থিক জামিনদার থাকা বাধ্যতামূলক। ইজরায়েলি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সমর্থন ছাড়া এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হতে পারে না।’
ইজরায়েলি বসতি এবং সেগুলির অর্থনীতির আইনি অবস্থান কী?
মিলিব্যান্ড বলেছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক রায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ব্রিটেন প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের দখলদারিকে বেআইনি বলে স্বীকার করছে। এর আগে ব্রিটেন বসতিগুলিকে বেআইনি বলে মেনে নিলেও সামগ্রিক দখলদারি নিয়ে নীরব ছিল।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইজরায়েলকে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ দখলদারির অবসান ঘটাতে এবং তার ‘আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী কার্যকলাপের’ জন্য পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছিল।
ব্রিটিশ পদক্ষেপের সমর্থক ইজরায়েলিদের বক্তব্য, এর মাধ্যমে ইজরায়েলের নিজস্ব ভূখণ্ড ও বেআইনিভাবে অধিকৃত এলাকার মধ্যে সীমারেখা আবার স্পষ্ট হচ্ছে। তাঁদের মতে, ইজরায়েল সরকারের যেসব নীতি দেশটিরই ক্ষতি করছে, তার বিরুদ্ধে এমন প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।
ইজরায়েলের অন্যতম বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী মাইকেল স্ফার্ড এই পদক্ষেপগুলিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলেছেন।
তাঁর কথায়, ‘এটি গ্রিন লাইনকে আবার স্পষ্ট করে তুলছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার জানাচ্ছে। বসতিগুলির অর্থনীতিকে সাহায্য করতে ব্রিটেন বা অন্য কোনও দেশ থেকে যাওয়া প্রতিটি পয়সাই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সুযোগ করে দেয়।’
ইজরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বলেছেন, ‘পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাসবাদীদের একটি বড় গোষ্ঠীর ধারাবাহিক জাতিগত সাফাই অভিযানের ফলে ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল… নিষেধাজ্ঞাগুলি সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে, ইজরায়েলের বিরুদ্ধে নয়। সেই কারণেই এগুলি অনিবার্য।’
মিলিব্যান্ড তাঁর বক্তৃতায় ওলমার্টের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
ব্রিটেন–ইজরায়েল সম্পর্কে মিলিব্যান্ডের এই হস্তক্ষেপের অর্থ কী?
ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রী গিডিয়ন সা’আর দ্রুত পাল্টা একগুচ্ছ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে পূর্ব জেরুসালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া। এই কনস্যুলেটই অধিকৃত প্যালেস্তাইনে ব্রিটেনের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদফতর।
ইজরায়েলের অন্য রাজনীতিকেরাও তীব্র নিন্দা করেছেন। অতি দক্ষিণপন্থী মন্ত্রী বেন গভির ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উপরে আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বকে ইজরায়েলের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছেন—মিলিব্যান্ডের বক্তৃতার আগেই।
তবে ছয় সপ্তাহ পরেই ইজরায়েলে নির্বাচন। কয়েক মাস ধরে জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর জোট নতুন সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থনের সীমার নীচেই আটকে রয়েছে।
তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে প্রধান দাবিদারদের কেউই দখলদারির বিরোধী নন। কিন্তু পশ্চিম তীরের হিংসার বিরুদ্ধে নিন্দা ক্রমশ বাড়ছে। নতুন সরকার এলে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
ইজরায়েল হয়তো চাইছে, অন্য দেশগুলি যেন ব্রিটেনের পথ অনুসরণ না করে। কিন্তু ইতিমধ্যেই এক ডজন দেশ বসতিগুলির সঙ্গে বাণিজ্যে একই ধরনের বিধিনিষেধ আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের মিত্র কানাডা ও ফ্রান্সও।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, এই পদক্ষেপ ‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষায় আমাদের অবস্থানের আরও একটি মোড়বদল’।
নেতানিয়াহুর নীতি ইতিমধ্যেই ইজরায়েলকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বিচ্ছিন্নতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সমস্ত দেশের বিরুদ্ধে একই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে সেই বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে।
আর কী ধরনের চাপ দেওয়া যেতে পারে?
বসতি সম্প্রসারণের জন্য ইজরায়েলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চোকাতে বাধ্য করার লক্ষ্যে মিলিব্যান্ডের ঘোষিত পদক্ষেপগুলিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর উদ্যোগ।
ইজরায়েল সরকারের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার আড়ালে অন্য একটি বাস্তবতাও রয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে হিংসা বন্ধ করতে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন বাড়ছে—ইজরায়েলের ভিতরেও, আবার বিদেশে দেশটির সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থকদের একাংশের মধ্যেও।
এই গ্রীষ্মে ইজরায়েলের নিরাপত্তা, রাজনীতি ও সংস্কৃতি জগতের কয়েক ডজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীরে ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ’ এবং ‘জাতিগত সাফাইয়ের মতাদর্শকে’ সমর্থন করছে।
ইজরায়েলে ট্রাম্পের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এবং মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য মিলিব্যান্ডের বক্তৃতার আগেই তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু এ বছরের শরতে আমেরিকাতেও নির্বাচন রয়েছে।
ডেমোক্র্যাট নেতা এবং শিকাগোর প্রাক্তন মেয়র রাম ইমানুয়েল তেল আভিভে এক বক্তৃতায় প্যালেস্তিনীয়দের বিরুদ্ধে হিংসা বন্ধ করতে ইজরায়েলের আর্থিক ক্ষেত্রের উপরে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বাবা ইজরায়েলি সেনাবাহিনীতে যুদ্ধ করেছিলেন।
বসতিগুলিতে শাখা রয়েছে এমন ব্যাঙ্কগুলির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির পরিণাম কী হতে পারে, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়। ইজরায়েলের সব প্রধান ব্যাঙ্কেরই ওই বসতিগুলিতে শাখা রয়েছে।
জেরুসালেম পোস্টকে ইমানুয়েল বলেন, ‘আমেরিকা তার নীতিগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের হাতে থাকা উপায়গুলি ব্যবহার করে। আমরা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বিশ্বাস করি। আপনি বৃহত্তর ইজরায়েল গড়তে চান? তার পুরো মূল্য আপনাকেই চোকাতে হবে। সবটাই। সেই সিদ্ধান্ত আপনার।’
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



