এবার সিবিআই মামলায় জড়ালেন সুভাষচন্দ্র

যা জানা জরুরি
- ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনালে ঋণ মেটানোর বিতর্কিত প্রস্তাব আপাতত আটকে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন বিপদে পড়লেন জি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা তথা এসেল গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান…
- এলআইসি হাউজিং ফাইন্যান্স লিমিটেডকে ১,৩২২ কোটি টাকারও বেশি প্রতারণা করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই।
- অভিযোগ, নিজের মোট সম্পদের পরিমাণ বিপুল ভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে তিনি গোষ্ঠী-ঘনিষ্ঠ সংস্থাগুলির জন্য ঋণ অনুমোদন করিয়েছিলেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনালে ঋণ মেটানোর বিতর্কিত প্রস্তাব আপাতত আটকে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন বিপদে পড়লেন জি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা তথা এসেল গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্র। এলআইসি হাউজিং ফাইন্যান্স লিমিটেডকে ১,৩২২ কোটি টাকারও বেশি প্রতারণা করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। অভিযোগ, নিজের মোট সম্পদের পরিমাণ বিপুল ভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে তিনি গোষ্ঠী-ঘনিষ্ঠ সংস্থাগুলির জন্য ঋণ অনুমোদন করিয়েছিলেন। পরে সেই ঋণ অনাদায়ী হয়ে যায়।
এলআইসি হাউজিং ফাইন্যান্সের জেনারেল ম্যানেজার নীতা মেঙ্ঘানির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট সিবিআইয়ের ব্যাঙ্কিং সিকিউরিটিজ ফ্রড শাখা এফআইআরটি দায়ের করে। সুভাষ চন্দ্রকে মামলার এক নম্বর অভিযুক্ত করা হয়েছে। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় কয়েকটি সংস্থা, তাদের পরিচালকদের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় সরকারি কর্মচারীদেরও অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদনে কোনও সরকারি আধিকারিকের সন্দেহজনক ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখবে সিবিআই।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ২০১৮ সালে মঞ্জুর হওয়া মোট ৯৮০ কোটি টাকার দু’টি ঋণ। প্রথমে বসন্ত সাগর প্রপার্টিজ প্রাইভেট লিমিটেড এবং সহ-ঋণগ্রহীতা প্যান ইন্ডিয়া ইনফ্রা প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেডকে ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। অধিগ্রহণ, অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ওই ঋণ মঞ্জুর হয়েছিল। ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ সুভাষ চন্দ্র এই ঋণের ব্যক্তিগত অব্যাহত নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড এবং সহ-ঋণগ্রহীতা স্পিরিট ইনফ্রাপাওয়ার অ্যান্ড মাল্টিভেঞ্চার্স প্রাইভেট লিমিটেডকে ৪৮০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। এটি ছিল ভাড়া থেকে সম্ভাব্য আয়ের ভিত্তিতে মঞ্জুর করা ঋণ। ১০ আগস্ট, ২০১৮-তে এই ঋণেরও ব্যক্তিগত নিশ্চয়তা দেন চন্দ্র।
এলআইসি হাউজিং ফাইন্যান্সের অভিযোগ, দু’টি ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রেই চন্দ্রের জমা দেওয়া মোট সম্পদের শংসাপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। প্রথম শংসাপত্রে ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তাঁর সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছিল ৬১৯ কোটি ৭৬ লক্ষ ২০ হাজার ডলার—ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৫৯,১১৩ কোটি ২১ লক্ষ টাকা। অন্য একটি শংসাপত্রে, ২০১৮ সালের ৬ জুলাই তাঁর মোট সম্পদ দেখানো হয় ৪০,৫৬২ কোটি টাকা।
কিন্তু ব্যক্তিগত দেউলিয়াত্ব নিরসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে সম্পদের অন্য ছবি সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই প্রক্রিয়ায় চন্দ্র আগের শংসাপত্রে উল্লিখিত সম্পদ থাকার কথাই অস্বীকার করেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ মাত্র ৩১ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকা। এমনকি ২০১৭-১৮ সালেও তাঁর সম্পদ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল না। ঋণ নেওয়ার সময়কার ঘোষণা এবং দেউলিয়াত্ব মামলায় দেওয়া হিসাবের এই বিপুল ফারাকই এখন সিবিআই তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয়।
দু’টি ঋণই পরে অনাদায়ী সম্পদে পরিণত হয়। বসন্ত সাগর সংক্রান্ত ঋণে বকেয়া দাঁড়ায় প্রায় ৫৭০ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা এবং ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার সংক্রান্ত ঋণে প্রায় ৫০৭ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। সুদ, অন্যান্য প্রাপ্য ও আনুষঙ্গিক দায় মিলিয়ে নিজেদের মোট ক্ষতির পরিমাণ ১,৩২২ কোটি টাকারও বেশি বলে দাবি করেছে এলআইসি হাউজিং ফাইন্যান্স। সংস্থাটির আরও অভিযোগ, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্তারা যোগসাজশ করে অর্থের অপব্যবহার করেছেন এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ করতে ব্যক্তিগত নিশ্চয়তাদাতার সম্পদ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এফআইআরে বসন্ত সাগর প্রপার্টিজ, তার পরিচালক পঙ্কজ সুরোলিয়া, প্যান ইন্ডিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার ম্যানেজমেন্ট, তার পরিচালক অমীশ পাণ্ড্য, স্পিরিট ইনফ্রাপাওয়ার অ্যান্ড মাল্টিভেঞ্চার্স এবং তার পরিচালক রাজীব ঢোলাকিয়ার নাম রয়েছে। তবে এগুলি আপাতত তদন্তাধীন অভিযোগ; আদালতে দোষ প্রমাণিত হয়নি এবং অভিযুক্তদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি।
এই মামলা এমন সময়ে দায়ের হল, যখন চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়াত্ব মামলায় এনসিএলটির পরস্পরবিরোধী নির্দেশ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। তাঁর বিরুদ্ধে ঋণদাতাদের স্বীকৃত দাবি ২২,০০৬ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা। অথচ চন্দ্রের ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনায় ঋণদাতাদের জন্য রাখা হয়েছিল মাত্র ৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা—অর্থাৎ দাবির প্রায় ০.০৩ শতাংশ। ২৫ আগস্ট এক সদস্যের নির্দেশে পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলেও পরে পাঁচ সদস্যের বিশেষ বেঞ্চ সেই নির্দেশ স্থগিত করে। চন্দ্রকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কোনও সম্পত্তি বিক্রি কিংবা হস্তান্তরেও নিষেধ করা হয়েছে। বিশেষ বেঞ্চের মতে, আগের পরস্পরবিরোধী মতগুলির ভিত্তিতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত তৈরি হয়নি; তাই মামলাটি নতুন করে শোনা প্রয়োজন। ৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকার প্রস্তাবটি এখন অনুমোদিতও নয়, প্রত্যাখ্যাতও নয়।
দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়া এবং সিবিআইয়ের ফৌজদারি তদন্ত আইনত পৃথক। তবে দু’টির কেন্দ্রেই একই প্রশ্ন—এক সময় যে শিল্পপতির সম্পদ কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা বলে দেখানো হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যে সেই সম্পদ মাত্র ৩১ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকায় নেমে এল কী ভাবে? এখন সিবিআইকে খুঁজে দেখতে হবে, আগের শংসাপত্রগুলি মিথ্যা ছিল, না কি মাঝের সময়ে সম্পদ গোপন বা হস্তান্তর করা হয়েছিল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



