অগ্নিসুরক্ষায় গুরুতর গলদ, অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস খালি করার নির্দেশ

যা জানা জরুরি
- কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস থাকা বহুতলের একাংশ অবিলম্বে খালি করার নির্দেশ দিল পশ্চিমবঙ্গ…
- পর্যাপ্ত অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকা এবং অগ্নিসুরক্ষা শংসাপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বহুতলটির ভূগর্ভস্থ অংশের পাশাপাশি ষষ্ঠ ও সপ্তম তল খালি করতে বলা…
- অগ্নিনির্বাপণ দফতরের বক্তব্য, ভবনটির অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থায় এমন কয়েকটি গুরুতর ঘাটতি পাওয়া গিয়েছে, যা সেখানে কর্মরত ব্যক্তি, দর্শনার্থী এবং আশপাশের সম্পত্তির নিরাপত্তার পক্ষে আশু বিপদ…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস থাকা বহুতলের একাংশ অবিলম্বে খালি করার নির্দেশ দিল পশ্চিমবঙ্গ অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি পরিষেবা দফতর। পর্যাপ্ত অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকা এবং অগ্নিসুরক্ষা শংসাপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বহুতলটির ভূগর্ভস্থ অংশের পাশাপাশি ষষ্ঠ ও সপ্তম তল খালি করতে বলা হয়েছে। এই দুই তলেই অভিষেকের অফিস রয়েছে।
অগ্নিনির্বাপণ দফতরের বক্তব্য, ভবনটির অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থায় এমন কয়েকটি গুরুতর ঘাটতি পাওয়া গিয়েছে, যা সেখানে কর্মরত ব্যক্তি, দর্শনার্থী এবং আশপাশের সম্পত্তির নিরাপত্তার পক্ষে আশু বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করে নতুন করে বৈধ অগ্নিসুরক্ষা শংসাপত্র না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অংশগুলি কোনও কাজেই ব্যবহার করা যাবে না।
মধ্য কলকাতার ৯, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরণির ওই বাণিজ্যিক বহুতলে সম্প্রতি পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপণ দফতরের একটি যৌথ দল তল ধরে পরিদর্শন চালায়। সেই পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবনের ভূগর্ভস্থ অংশে কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার প্রায় কোনও চিহ্নই নেই। আগুন লাগলে দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং পরিকাঠামোরও অভাব রয়েছে বলে দফতরের দাবি।
সপ্তম তলেও অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে পরিদর্শকেরা জানিয়েছেন। সেখানে নির্দিষ্ট জরুরি নির্গমনপথ নেই এবং আগুনের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করার ব্যবস্থা বা অগ্নিসঙ্কেত যন্ত্রেও সমস্যা রয়েছে। বহুতলে আগুন লাগলে ভূগর্ভস্থ অংশ থেকে ধোঁয়া ও আগুন দ্রুত উপরের তলগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই কারণে ভূগর্ভস্থ অংশে অগ্নিনিরাপত্তার অভাবকে বিশেষ গুরুতর বলেই দেখছে দফতর।
পরিদর্শনের পরে ভবনটির মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানাতে ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। পরে শুনানিতেও মালিকপক্ষকে হাজির হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনও সন্তোষজনক জবাব মেলেনি এবং মালিকপক্ষ শুনানিতেও উপস্থিত হয়নি বলে অগ্নিনির্বাপণ দফতরের দাবি। তার পরেই খালি করার চূড়ান্ত নির্দেশ জারি হয়।
তবে ষষ্ঠ ও সপ্তম তলের দখলদার অর্থাৎ অভিষেকের অফিসের প্রতিনিধিরা শুনানিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা ভবনটির ইজারার নথি জমা দিয়ে নিজেদের বক্তব্যও জানান। সেই নথি এবং তাঁদের বক্তব্য পরীক্ষা করে দফতরের আধিকারিকেরা জানান, ভবনের প্রয়োজনীয় অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন, সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং অগ্নিসুরক্ষা শংসাপত্র সংগ্রহের দায়িত্ব সম্পত্তির মালিকের।
পশ্চিমবঙ্গ অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবা আইন, ১৯৫০-এর ১১সি ধারা অনুযায়ীও সুপারিশ করা সমস্ত অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করে শংসাপত্র সংগ্রহ করার দায় মালিকের উপরেই বর্তায় বলে সরকারি নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভাড়াটে হিসাবে অফিস ব্যবহারকারীরা শুনানিতে হাজির হলেও মালিকের অনুপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হয়েছে।
দুটি ভূগর্ভস্থ তল, একতলা এবং তার উপরে সাতটি তলবিশিষ্ট ওই বাণিজ্যিক ভবনের অগ্নিসুরক্ষা শংসাপত্র ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট দেওয়া হয়েছিল। তিন বছরের জন্য বৈধ সেই শংসাপত্রের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেটি নবীকরণ করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ তা করেনি বলে অভিযোগ।
দফতরের নির্দেশে বলা হয়েছে, অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অপ্রতুলতার কারণে সংশ্লিষ্ট অংশগুলি অগ্নিকাণ্ড ও জীবনরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ নয়। ফলে ষষ্ঠ ও সপ্তম তল এবং ভূগর্ভস্থ অংশগুলি দেরি না করে খালি করতে হবে। সব ত্রুটি সংশোধন এবং নবীকৃত অগ্নিসুরক্ষা শংসাপত্র পাওয়ার পরেই সেখানে আবার কাজ শুরু করা যাবে।
নির্দেশ কার্যকর করার জন্য তার প্রতিলিপি কলকাতা পুরসভা, শেক্সপীয়র সরণি থানা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসি-র কাছেও পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অংশে বিদ্যুৎ সংযোগ বা ব্যবহারের অনুমতি নিয়েও পদক্ষেপ করা হতে পারে।
ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্যও যথেষ্ট। কয়েক দিন আগে ওই ভবন থেকে তৃণমূলের একটি বিজ্ঞাপনফলক সরানোকে কেন্দ্র করে পুরকর্মী ও পুলিশের সঙ্গে অভিষেকের নিরাপত্তারক্ষী এবং দলীয় কর্মীদের বচসা ও ধস্তাধস্তি হয়েছিল। পরে সেখানে নতুন দলীয় ফলক লাগানো হয়। তার পরেই অফিসে ভাঙচুর ও দলীয় কর্মীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে। তৃণমূল ওই ঘটনার জন্য বিজেপি-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীদের দায়ী করলেও বিজেপি অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পুলিশ ছ’জনকে গ্রেফতারও করেছে।
এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহের মধ্যেই অগ্নিনির্বাপণ দফতরের নির্দেশ নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তবে দফতরের দাবি, সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে পরিদর্শনে পাওয়া অগ্নিসুরক্ষার ঘাটতি, মেয়াদোত্তীর্ণ শংসাপত্র এবং মালিকপক্ষের নোটিসে সাড়া না দেওয়ার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। জননিরাপত্তার প্রশ্নে ভবনটির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনি ও প্রযুক্তিগত ত্রুটিই পদক্ষেপের কারণ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



