বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর পরে দেশের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১১ কোটি ৮০ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। সংখ্যাটি এতই বিপুল যে, তা ২০২২ সালের ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটদাতার সংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচন কমিশন কি মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিক জায়গায় নথিভুক্ত ভোটারের নাম বাদ দিয়ে তালিকা পরিচ্ছন্ন করেছে, না কি প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক ভোটাধিকার হারিয়েছেন?

ভারতের সর্বশেষ প্রকাশিত জনগণনার তথ্য ২০১১ সালের। গত দেড় দশকে জনসংখ্যা, অভিবাসন ও নগরায়ণের যে বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে, তার নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক হিসাব নেই। ফলে বর্তমান ভোটারের সংখ্যার সঙ্গে দেশের প্রকৃত প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা মেলানো কঠিন।

এসআইআর-এর পরে বড় শহর এবং দ্রুত নগরায়িত জেলাগুলিতে তুলনামূলক ভাবে বেশি নাম বাদ পড়েছে। দিল্লির খসড়া তালিকাতেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল, কাজের সন্ধানে শহরে আসা বহু মানুষ নিজেদের জন্মস্থান এবং কর্মস্থল—দুই জায়গাতেই ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিলেন। এসআইআর তাঁদের একটি কেন্দ্র বেছে নিতে বাধ্য করেছে। অনেকেই শহরের বদলে গ্রামের পুরনো নিবন্ধনটি বজায় রেখেছেন। সে ক্ষেত্রে শহরের তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ গেলেও তাঁরা ভোটাধিকার হারাননি; কেবল দ্বৈত নিবন্ধন দূর হয়েছে।

এই ব্যাখ্যার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানগত ইঙ্গিত রয়েছে। ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যে জেলাগুলিতে ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছিল, এসআইআর-এর সময়ে সেই জেলাগুলির অনেকগুলিতেই নাম বাদ পড়ার হার বেশি। অর্থাৎ অতীতে অভিবাসনের কারণে যেসব এলাকায় ভোটার অস্বাভাবিক দ্রুত বেড়েছিল, সংশোধনের সময় সেখানেই তুলনামূলক বড় কাটছাঁট হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে এই সম্পর্ক অপেক্ষাকৃত দুর্বল।

তবে এই যুক্তি দিয়ে সব নাম বাদ পড়াকে বৈধ বলা যায় না। তালিকায় মৃত ব্যক্তি, স্থায়ী ভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া মানুষ অথবা একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন থাকা অস্বাভাবিক নয়। আবার বাড়ি-বাড়ি যাচাইয়ের ঘাটতি, নথির অসঙ্গতি, স্বল্প সময়সীমা কিংবা প্রশাসনিক অবহেলায় প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কাও যথেষ্ট। দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক, ভাড়াবাড়ির বাসিন্দা, মহিলা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই ঝুঁকিতে তুলনামূলক বেশি থাকেন।

এখানে একটি উল্টো প্রশ্নও উঠছে। সত্যিই যদি ১১ কোটি ৮০ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম অন্যায় ভাবে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে দেশজুড়ে আরও ব্যাপক প্রতিবাদ, দাবি ও আপত্তি দেখা যাওয়ার কথা ছিল। সেই মাত্রার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া এখনও দেখা যায়নি। এটি দ্বৈত নাম এবং অচল নিবন্ধন বাদ পড়ার তত্ত্বকে কিছুটা শক্তিশালী করে। তবে প্রতিবাদ কম হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভুল হয়নি। অনেকে নিজের নাম বাদ যাওয়ার কথা ভোটের আগে পর্যন্ত জানতেই পারেন না; আবার আপত্তি জানানোর পদ্ধতিও সকলের নাগালে থাকে না।

আরও বড় ধাঁধা রয়েছে জনসংখ্যার প্রক্ষেপণে। ভোটার তালিকা পরিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সাধারণত বলা হয়, মৃত ও স্থানান্তরিত মানুষের নাম থেকে যাওয়ায় তালিকা ফুলে উঠেছে। তা হলে এসআইআর-এর আগের ভোটারসংখ্যা সম্ভাব্য প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার চেয়ে বেশি হওয়ার কথা। অথচ যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য তুলনাযোগ্য প্রক্ষেপণ পাওয়া যাচ্ছে, সব ক’টিতেই এসআইআর-পূর্ব ভোটারের সংখ্যা আনুমানিক প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার চেয়ে কম। সংশোধনের পরে ব্যবধান স্বাভাবিক ভাবেই আরও বেড়েছে।

অন্য দিকে, পুরনো জনগণনা ও কাছাকাছি সময়ের ভোটার তালিকা তুলনা করলে দেখা যায়, অতীতে নথিভুক্ত ভোটারের সংখ্যা প্রায়ই জনগণনায় পাওয়া ভোটদানের উপযুক্ত মানুষের চেয়ে বেশি ছিল। ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের নিবিড় সংশোধনের পরে ২০০৯ সালের নির্বাচনে এই ব্যবধান কমেছিল। বর্তমান এসআইআরও হয়তো একই ধরনের শুদ্ধিকরণ ঘটিয়েছে। আবার এটাও সম্ভব, পুরনো জনসংখ্যা-বৃদ্ধির হারের ভিত্তিতে তৈরি বর্তমান প্রক্ষেপণ ভারতের প্রকৃত প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যাকে বেশি দেখাচ্ছে।

অতএব, এসআইআরকে সম্পূর্ণ ভোটার-বঞ্চনার অভিযান বলা যেমন পরিসংখ্যানসম্মত নয়, তেমনই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে বলে নির্বিচারে ‘তালিকা শুদ্ধ হয়েছে’ দাবি করাও অনুচিত। মৃত, স্থানান্তরিত ও দ্বৈত ভোটারের পাশাপাশি প্রকৃত ভোটারও বাদ পড়ে থাকতে পারেন। কোন শ্রেণির ভাগ কত, তা জানতে প্রয়োজন নাম সংযোজন-বিয়োজনের সহজে বিশ্লেষণযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছ কারণ-তালিকা, কার্যকর আপত্তি প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন নিরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত ২০২৭ সালের জনগণনাই এই রহস্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে পারে। তত দিন ভোটার তালিকার পরিচ্ছন্নতার দাবি এবং ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ—দুই-ই সম্ভাবনা, কোনওটিই প্রমাণিত চূড়ান্ত সত্য নয়।