মহানায়ককে সামনে রেখে টলিউডে বিজেপির সাংস্কৃতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার অভিযান

যা জানা জরুরি
- মৃত্যুর ছেচল্লিশ বছর পরেও বাঙালির প্রিয়তম চলচ্চিত্র-তারকার আসনটি উত্তম কুমারেরই।
- তাঁকে নিয়ে প্রজন্মান্তরে আবেগের কোনও ঘাটতি নেই, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও বিরল সামাজিক ঐকমত্য।
- তাই জন্মশতবর্ষে মহানায়ককে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের বিপুল আয়োজন নিছক স্মরণানুষ্ঠান নয়; এর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে টলিউডের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি এবং বাংলার…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মৃত্যুর ছেচল্লিশ বছর পরেও বাঙালির প্রিয়তম চলচ্চিত্র-তারকার আসনটি উত্তম কুমারেরই। তাঁকে নিয়ে প্রজন্মান্তরে আবেগের কোনও ঘাটতি নেই, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও বিরল সামাজিক ঐকমত্য। তাই জন্মশতবর্ষে মহানায়ককে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের বিপুল আয়োজন নিছক স্মরণানুষ্ঠান নয়; এর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে টলিউডের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি এবং বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রয়াস।
৩ সেপ্টেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উত্তম কুমারকে স্মরণ করে বিশেষ বার্তা দেন। এর আগে ‘মন কি বাত’-এও তিনি মহানায়কের বহুমুখী প্রতিভা, প্রথম জীবনের ব্যর্থতা জয় করে শীর্ষে ওঠা এবং প্রজন্ম অতিক্রমকারী জনপ্রিয়তার কথা বলেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য মোদীর হাতে উত্তম কুমারের প্রতিকৃতিও তুলে দিয়েছিলেন। ঘটনাগুলি বুঝিয়ে দেয়, মহানায়ককে ঘিরে বিজেপির আগ্রহ আকস্মিক নয়; বাংলার সাংস্কৃতিক আবেগের সঙ্গে দলের সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পিত প্রচেষ্টারই অংশ।
টালিগঞ্জে মহানায়ক উত্তমকুমার মেট্রো স্টেশনের কাছে অভিনেতার মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে রঞ্জিত মল্লিক উপস্থিত থাকায় মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে আগে শ্রদ্ধা জানাতে অনুরোধ করেন এবং পরে তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন। অনুষ্ঠানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেব, জিৎ, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী-সহ চলচ্চিত্রজগতের বহু পরিচিত মুখের উপস্থিতি রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নন্দন থেকে গগনেন্দ্র প্রদর্শশালা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার পদযাত্রায় শুভেন্দুর পাশে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক এবং পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তীও। অর্থাৎ, একদা তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ অথবা সরাসরি সেই দলের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদেরও একই মঞ্চে হাজির করে সরকার বোঝাতে চেয়েছে—টলিউডে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও তারকারা ব্রাত্য হবেন না।
চার দিনের জন্মশতবর্ষ উৎসবে রয়েছে উত্তম কুমারের চলচ্চিত্র প্রদর্শন, তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী ও দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্রের প্রদর্শনী, স্মৃতিবিজড়িত স্থান ঘুরে দেখার ব্যবস্থা এবং আলোচনা। নিউ টাউনে অত্যাধুনিক উত্তম কুমার চলচ্চিত্র কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং রবীন্দ্র সদনের চেয়েও বড় প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের কথাও ঘোষণা করেছে সরকার। ডাক বিভাগ বিশেষ স্মারক খাম ও ডাকটিকিট প্রকাশ করবে। চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ দিয়ে।
শুভেন্দু বলেছেন, সরকার চলচ্চিত্রশিল্পের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না, প্রতিভার বিকাশে স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করবে এবং প্রয়োজন হলে বিধানসভায় আইনও আনবে। তাঁর অভিযোগ, একসময় দেশের চলচ্চিত্রশিল্পে নেতৃত্ব দেওয়া বাংলা এখন দক্ষিণ ভারতের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। টলিউডকে আবার দেশের এক নম্বর আসনে ফেরানোর প্রতিশ্রুতির মধ্যেও তাই শিল্পনীতি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে রাজনৈতিক বার্তা।
তৃণমূল নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারের পরে এই বার্তাটি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। গত এক দশকে টলিউডে কারা কাজ পাবেন, কারা অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বেন—সেই সিদ্ধান্তে তাঁর প্রবল প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ। বিজেপি এখন সেই পুরনো নিয়ন্ত্রণ ভেঙে ‘রাজনীতিমুক্ত’ চলচ্চিত্রশিল্পের কথা বলছে। কিন্তু তারকাদের নিয়ে সরকারি পদযাত্রা এবং সাংস্কৃতিক মঞ্চে ক্ষমতাসীন দলের সর্বব্যাপী উপস্থিতি দেখে প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাজনীতিকে সত্যিই দূরে সরানো হচ্ছে, না কি নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রটিই কেবল বদলাচ্ছে?
এই কৌশল অবশ্য বিজেপির আবিষ্কার নয়। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তম কুমারের নামে ‘মহানায়ক সম্মান’ চালু করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, বামফ্রন্ট সরকার মহানায়ককে প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি। পরে দেব, শতাব্দী রায়, মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান, চিরঞ্জিৎ, কাঞ্চন মল্লিকের মতো অসংখ্য তারকাকে তৃণমূল নির্বাচনী রাজনীতিতে নিয়ে আসে। ফলে টলিউড ক্রমে শিল্পক্ষেত্রের পাশাপাশি ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অলিন্দে পরিণত হয়।
বিজেপি সেই প্রতিষ্ঠিত পথটিকেই এখন আরও ব্যাপক সাংস্কৃতিক আয়োজনের সাহায্যে নিজেদের মতো করে সাজাচ্ছে। উত্তম কুমার এখানে শুধু অতীতের মহান অভিনেতা নন; তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং আবেগে পৌঁছনোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সেতু। তাঁকে সামনে রেখে বিজেপি একসঙ্গে দুটি লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে—টলিউডকে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের পাশে নিয়ে আসা এবং প্রমাণ করা যে বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারেও তার সমান অধিকার রয়েছে। মহানায়কের জন্মশতবর্ষ তাই স্মৃতির উৎসবের পাশাপাশি বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষমতা পুনর্বণ্টনেরও এক জমকালো মঞ্চ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



