বিনোদন বিড়ম্বনা

২৮৬ দিনের সমুদ্রযাত্রার পরে পাটায়ায় ৫,০০০ মার্কিন নাবিক, চাঙ্গা হওয়ার আশায় নিশিনগরী

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • যুদ্ধক্লান্ত প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন নাবিক ও মেরিন সেনার আগমনে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে থাইল্যান্ডের পাটায়ায়।
  • দীর্ঘ ২৮৬ দিনের সামরিক অভিযানের পরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন বুধবার লেম চাবাং বন্দরে পৌঁছেছে।
  • তার আগে টানা আড়াইশোরও বেশি দিন রণতরিটির কর্মীরা কোনও বন্দরে নামার সুযোগ পাননি।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

যুদ্ধক্লান্ত প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন নাবিক ও মেরিন সেনার আগমনে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে থাইল্যান্ডের পাটায়ায়। দীর্ঘ ২৮৬ দিনের সামরিক অভিযানের পরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন বুধবার লেম চাবাং বন্দরে পৌঁছেছে। তার আগে টানা আড়াইশোরও বেশি দিন রণতরিটির কর্মীরা কোনও বন্দরে নামার সুযোগ পাননি। ফলে তাঁদের পাঁচ দিনের এই অবকাশকে ঘিরে যেমন সমাজমাধ্যমে রসিকতার বন্যা বইছে, তেমনই পর্যটক-খরায় ভোগা পাটায়ার ব্যবসায়ীরা দেখছেন অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের বিরাট সুযোগ।

আব্রাহাম লিঙ্কন ২০২৫ সালের নভেম্বরে সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রাথমিকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে রণতরিটিকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানো হয়। মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেয় সেটি। মে মাসেই দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় একাধিক বার তার মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

দীর্ঘদিন বন্দরে না ভেড়ার কারণে জাহাজের কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যসামগ্রীর ঘাটতি এবং শৌচাগার বিকল হয়ে যাওয়ার খবরও সামনে এসেছিল। নাবিকদের পরিবার এবং কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করে, এত দীর্ঘ মোতায়েন সেনাকর্মী ও তাঁদের পরিবারের উপর প্রবল মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। তবে রণতরির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি অভিযোগকে তারা অতিরঞ্জিত বলেও দাবি করে।

সমুদ্রের বন্দিদশা কাটিয়ে নাবিকেরা এখন পাটায়ার হোটেল, রেস্তরাঁ, বিপণি ও বিনোদনকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ছেন। তাঁদের যাতায়াতের জন্য লেম চাবাং বন্দর ও পাটায়ার মধ্যে প্রায় ৪০টি বাস চালানো হচ্ছে। রাতে শহরে থাকতে আগ্রহীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে দু’টি হোটেল। থাইল্যান্ড উপসাগরের তীরে অবস্থিত পাটায়া রাজধানী ব্যাঙ্কক থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও স্থানীয় মানুষের খরচ কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলিতে পাটায়ার ব্যবসা মন্থর হয়েছিল। আলোয় ঝলমল করা বিখ্যাত ওয়াকিং স্ট্রিটে পানশালা ও নাচের আসরগুলি খোলা থাকলেও ভিড় ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় কম। তাই একসঙ্গে কয়েক হাজার বেতনভুক মার্কিন সেনাকর্মীর আগমন ব্যবসায়ীদের কাছে কার্যত আশীর্বাদ।

ওয়াকিং স্ট্রিটের কাছের এক রত্নব্যবসায়ী মার্কিন নাবিক ও মেরিনদের জন্য বিশেষ ছাড়ের বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। তাঁর কথায়, এই সফরই তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় আশা। নাবিকেরা পানশালা বা বিনোদনকেন্দ্রেই শুধু নয়—হোটেল, খাবারের দোকান, যানবাহন, পর্যটনকেন্দ্র, পোশাক ও স্মারকের বিপণিতেও অর্থ খরচ করবেন। অল্প সময়ের জন্য হলেও সেই অর্থ স্থানীয় অর্থনীতির বহু স্তরে ছড়িয়ে পড়বে।

পাটায়ার সঙ্গে মার্কিন সেনাবাহিনীর সম্পর্ক নতুন নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের আগে এটি ছিল মূলত একটি শান্ত মৎস্যজীবী জনপদ। ষাট ও সত্তরের দশকে থাইল্যান্ডে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে আনুমানিক সাত লক্ষ মার্কিন সেনাকর্মী বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য পাটায়ায় এসেছিলেন। তাঁদের চাহিদা মেটাতে গড়ে ওঠে হোটেল, রেস্তরাঁ, পানশালা ও নানা বিনোদনকেন্দ্র। মার্কিন সেনা চলে গেলেও সেই পরিকাঠামোই পরবর্তী সময়ে পাটায়াকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করে।

তবে পাঁচ হাজার নাবিকের আগমন ঘিরে সমাজমাধ্যমে ‘উন্মত্ত’ কিংবা ‘কামাতুর’ নাবিকদের নিয়ে যে ধরনের বিদ্রূপ চলছে, প্রশাসন তার বাইরেও নিরাপত্তা ও শোষণ প্রতিরোধে সতর্ক। কয়েকশো থাই পুলিশকে বিনোদন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে, বিদেশি অতিথিদের কাছ থেকে যেন অতিরিক্ত দাম নেওয়া না হয়।

মার্কিন সেনাকর্মীদের পাটায়ার কয়েকটি এলাকায় যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে যৌনকর্মীদের প্রকাশ্য উপস্থিতির জন্য পরিচিত সোই ৬। তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, থাইল্যান্ডে দেহব্যবসা বেআইনি। গাঁজার দোকানেও প্রবেশ নিষিদ্ধ। দুর্ঘটনা এড়াতে জেট-স্কি, বাঞ্জি লাফ, জলক্রীড়া, কুস্তি ও মুষ্টিযুদ্ধের মতো কার্যকলাপ থেকেও তাঁদের দূরে থাকতে বলা হয়েছে।

অতএব, পাটায়ার সামনে এখন দ্বৈত পরীক্ষা—নাবিকদের নিরাপদ অবকাশ নিশ্চিত করা এবং শহরের ভাবমূর্তিকে কেবল যৌনপর্যটনের পরিচয়ে আটকে না রেখে এই সাময়িক জনস্রোতকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক লাভে পরিণত করা। সমাজমাধ্যমের কৌতুক ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু পাঁচ হাজার মানুষের থাকা, খাওয়া, যাতায়াত ও কেনাকাটার অর্থ পাটায়ার মন্দাগ্রস্ত বাজারে বাস্তব এবং বহুল প্রতীক্ষিত স্বস্তি এনে দিতে পারে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles